বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস
কন্যাশিশুর নিরাপদ শৈশব গড়তে ইসলামের শিক্ষা

প্রতীকী ছবি
আজ বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস। বিশ্ব জুড়ে জাতিসংঘ রাষ্ট্রসমূহ কন্যাশিশুর অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার নিয়ে প্রতি বছর ১১ অক্টোবর দিবসটি পালন করে। মূলত শৈশব তো মানুষের জীবনের এমন এক ঋতু, যার কোমল আলোয় গড়ে ওঠে ভবিষ্যতের ব্যক্তিত্ব। এ সময়ে শিশুর প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, স্নেহময় পরিবেশ, শিক্ষার সুযোগ এবং নির্ভয়ে বেড়ে ওঠার নিশ্চয়তা। অথচ পৃথিবীর বহু কন্যাশিশুর কাছে শৈশব মানেই নানা শঙ্কা, বৈষম্য ও বঞ্চনার অভিজ্ঞতা। কখনো ঘরের ভেতর, কখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কখনো পথেঘাটে, আবার কখনো ভার্চুয়াল জগতে তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই বিশ্ব কন্যাশিশু দিবসে শুধু কন্যাসন্তানের প্রতি ভালোবাসার কথা বলাই যথেষ্ট নয়; তার নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বও নতুন করে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ইসলাম কন্যাশিশুর জন্মকে লজ্জা কিংবা দুর্ভাগ্যের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে না। ইসলাম কন্যাসন্তানকে আল্লাহর দান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে,
لِلّٰهِ مُلۡكُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ؕ یَخۡلُقُ مَا یَشَآءُ ؕیَهَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ اِنَاثًا وَّ یَهَبُ لِمَنۡ یَّشَآءُ الذُّكُوۡرَ
‘আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন।’ (সুরা শুরা, আয়াত : ৪৯)
আয়াতটি কন্যা ও পুত্র উভয়কেই আল্লাহর দান হিসেবে উপস্থাপন করে। অথচ আজও সমাজের কোথাও কোথাও কন্যাসন্তানের জন্মে হতাশা, ছেলেসন্তানের প্রতি অতিরিক্ত পক্ষপাত এবং মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবমূল্যায়নের প্রবণতা দেখা যায়। কোরআন এমন মানসিকতার শিকড় অনুসন্ধান করেছে প্রাক-ইসলামি আরবের জাহেলি সংস্কৃতিতে। কন্যাসন্তানের জন্মসংবাদে মুখ কালো করে ফেলা এবং তাকে লজ্জার কারণ মনে করার নিন্দা করা হয়েছে সুরা নাহলের ৫৮-৫৯ আয়াতে। এই শিক্ষা মনে করিয়ে দেয়, কন্যাশিশুর নিরাপদ শৈশবের প্রথম শর্ত হলো পরিবারে তার মর্যাদা স্বীকার করা।
শিশুর নিরাপত্তা বলতে শুধু তাকে শারীরিক বিপদ থেকে রক্ষা করাকে বোঝায় না। তার মানসিক প্রশান্তি, আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা, শিক্ষা এবং বিকাশের অধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত। ইসলাম মানুষের জীবন, সম্মান ও অধিকার রক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো শিশুকে অপমান করা, ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা, তার প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করা কিংবা তার অসহায়ত্বের সুযোগ নেওয়া ইসলামের ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। নবীজি (সা.) বলেছেন,
مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيرَنَا، وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيرِنَا فَلَيْسَ مِنَّا
‘যে আমাদের ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের অধিকার স্বীকার করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩; তিরমিজি, হাদিস : ১৯২০)।
হাদিসটি শিশুদের প্রতি দয়া ও দায়িত্বশীল আচরণের গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
কন্যাশিশুর নিরাপত্তার সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো যৌন হয়রানি ও নির্যাতন থেকে সুরক্ষা। শিশুর প্রতি যেকোনো ধরনের যৌন নির্যাতন তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে শিশুর সুরক্ষা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পারিবারিক সম্মান কিংবা সামাজিক লজ্জার অজুহাতে নির্যাতনের ঘটনা গোপন করা, শিশুকে নীরব থাকতে বাধ্য করা বা ভুক্তভোগীকেই দায়ী করা অন্যায়কে আরও গভীর করে। তাই অভিভাবকদের এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিশু নির্ভয়ে নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে পারে এবং তার কথা গুরুত্বের সঙ্গে শোনা হয়। শিশুকে বয়সোপযোগীভাবে ব্যক্তিগত সীমানা, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ এবং বিপদের পরিস্থিতিতে বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্কের সাহায্য নেওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।
ইসলামি নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো জুলুম পরিহার এবং মানুষের অধিকার রক্ষা। সুতরাং কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে শুধু উপদেশ নয়, কার্যকর ব্যবস্থাও প্রয়োজন। পরিবারে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, নিরাপদ যাতায়াত এবং নির্যাতনের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত থাকা দরকার। কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় যেন অপরাধ আড়াল করার ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়। শিশুর প্রতি দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা তখনই বাস্তব রূপ পাবে, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল অবস্থান নেওয়া হবে।
কন্যাশিশুর নিরাপদ শৈশবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ। দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, গৃহস্থালি শ্রমের অতিরিক্ত চাপ কিংবা ছেলেমেয়ের মধ্যে বৈষম্যের কারণে অনেক মেয়ে শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়ে। অথচ শিক্ষা শিশুকে শুধু জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে না; তাকে নিজের অধিকার চিনতে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন হতে সাহায্য করে। ইসলাম জ্ঞানচর্চার আহ্বানে নারী-পুরুষ উভয়কেই সম গুরুত্ব দিয়েছে। কন্যাশিশুর শিক্ষা বন্ধ করে দেওয়া কিংবা তার সম্ভাবনাকে লিঙ্গপরিচয়ের কারণে সীমিত করে রাখা কিছুতেই ন্যায়সংগত নয়। একইভাবে অল্প বয়সে বিয়ের চাপ দিয়ে তার শারীরিক, মানসিক ও শিক্ষাগত বিকাশ ব্যাহত করাও গুরুতর অপরাধ। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা ও কল্যাণকে সামনে রেখেই তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বর্তমান সময়ে কন্যাশিশুর নিরাপত্তার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ডিজিটাল জগৎ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার, সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে প্রতারণার ঝুঁকি শিশুদের মানসিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে পারে। পবিত্র কোরআনে মুমিন নারী ও পুরুষ উভয়কে দৃষ্টি সংযত রাখা এবং শালীনতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সুরা নুর, আয়াত : ৩০-৩১)।
এই নৈতিক শিক্ষা ডিজিটাল যোগাযোগেও প্রাসঙ্গিক। কারও ব্যক্তিগত ছবি অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে দেওয়া, অপমানজনক মন্তব্য করা কিংবা অনলাইনে কাউকে হুমকি দেওয়া শালীনতা ও মানবিক মর্যাদার পরিপন্থী। তাই মেয়েদের সতর্ক থাকার শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ছেলেদেরও সম্মানজনক আচরণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং অনলাইন নৈতিকতা শেখাতে হবে। নিরাপত্তার সব দায় কন্যাশিশুর ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না; দায়িত্ব নিতে হবে ডিজিটাল ক্ষেত্র ব্যবহারকারী, অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও।
কন্যাশিশুর প্রতি দায়িত্ব শুধূ পরিবারের নয়, রাষ্ট্র ও সমাজেরও। শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন, অবহেলা ও অধিকারহরণ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, মানসম্মত শিক্ষা, সহজলভ্য সহায়তা এবং ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় আলোচনায় কন্যাশিশুর অধিকার, অভিভাবকের দায়িত্ব এবং নির্যাতন প্রতিরোধের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা ধরতে হবে।
কন্যাশিশুর নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করা কোনো এক দিনের অঙ্গীকার নয়; এটি প্রতিদিনের দায়িত্ব। যে পরিবার কন্যাকে ভালোবাসে, তার কথা শোনে, শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ দেয় এবং বিপদের সময় পাশে দাঁড়ায়, সেই পরিবারই ইসলামের দয়ার শিক্ষাকে যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারে। যে সমাজ নির্যাতন গোপন না করে প্রতিরোধ করে, বৈষম্যকে প্রশ্রয় না দিয়ে সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে, সেই সমাজই মানবিক ভবিষ্যত নির্মাণ করতে পারে।
তাই আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসে আমাদের সামাজিক অঙ্গিকার হোক- কন্যাশিশু যেন ভয়ে নয়, আত্মবিশ্বাসে বেড়ে ওঠে; অবহেলায় নয়, মর্যাদায় নিজের পরিচয় খুঁজে পায়। আর বঞ্চনার পরিবর্তে সম্ভাবনার আলোয় ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



