হালাল উপার্জন কম হলেও কেন তা উত্তম

প্রতীকী ছবি
জীবনের প্রয়োজন মেটাতে অর্থের প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, সবকিছুর সঙ্গেই অর্থের সম্পর্ক রয়েছে। তাই মানুষ বেশি উপার্জন করতে চায়, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে উপার্জনের পরিমাণই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। অর্থ কত বেশি এলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থটি কোন পথে এলো এবং তাতে কতটা বরকত রয়েছে। হারাম পথে অর্জিত বিপুল সম্পদের চেয়ে হালাল পথে অর্জিত অল্প সম্পদও একজন মুমিনের জন্য উত্তম।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র রয়েছে, তা থেকে আহার করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৬৮) এখানে শুধু খাদ্য নয়, মানুষের জীবনযাপনের উপকরণ অর্জনের ক্ষেত্রেও হালাল ও পবিত্রতার নীতি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে তাই প্রশ্ন শুধু ‘কত টাকা পেলাম’ নয়; বরং ‘কীভাবে পেলাম’।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া কিছু গ্রহণ করেন না।’ এরপর তিনি এমন ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করে, এলোমেলো চুল ও ধূলিমলিন অবস্থায় দুই হাত তুলে দোয়া করে; কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা লালিত। নবীজি (সা.) প্রশ্ন করেন, ‘তাহলে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে?’ (মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হারাম উপার্জন মানুষের আত্মিক জীবনকে মরাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। হারাম অর্থে জীবনযাপন বাহ্যিকভাবে স্বচ্ছলতা এনে দিতে পারলেও, তা হৃদয়ের প্রশান্তি ও ইবাদতে বরকত নষ্ট করে দেয়। বিপরীতে হালাল উপার্জন অল্প হলেও তাতে থাকে আত্মমর্যাদা, মানসিক প্রশান্তি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা।
হালাল উপার্জনের মর্যাদা এত বেশি যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের হাতের উপার্জনকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার কখনো খায়নি। আল্লাহর নবী দাউদ (আ.) নিজের হাতের উপার্জন থেকে খেতেন।’ (বুখারি, হাদিস: ২০৭২)
অল্প হালাল আয় মানুষকে মিতব্যয় শিখতে বাধ্য করে। কিন্তু হারাম অর্থের আধিক্য মানুষকে এমন এক ভোগের দিকে ঠেলে নিয়ে যায়; যার কোনো শেষ নেই। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআন সতর্ক করে ঘোষণা করেছে, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮) অর্থাৎ সম্পদের পরিমাণ যতই হোক, অন্যায় পথে অর্জিত হলে তা কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।
হালাল উপার্জনের আরেকটি বড় সৌন্দর্য হলো, এতে পরিবারের খাবার ও জীবনযাপনও ইবাদতের অংশ হয়ে উঠতে পারে। একজন বাবা সামান্য আয় করেন, কিন্তু সততার সঙ্গে কাজ করেন, ঘুষ নেন না, প্রতারণা করেন না, মানুষের অধিকার নষ্ট করেন না। তার আয় হয়তো বিলাসিতা নিশ্চিত করতে পারে না, কিন্তু সেই উপার্জন দিয়ে সন্তানের মুখে যে খাবার তুলে দেওয়া হয়, তাতে থাকে হালালের স্বস্তি।
তাই জীবনের লক্ষ্য বেশি উপার্জন না হয়ে হওয়া উচিত হালাল ও পরিষ্কার উপার্জন। আয় কম হলে চেষ্টা করতে হবে তা বাড়ানোর, কিন্তু হারাম পথে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ রিজিকের মালিক আল্লাহ। কজেই আল্লাহর ওপরই ভরসা করেতে হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেন, যা সে ধারণাও করতে পারে না।’ (সুরা তালাক, আয়াত : ২-৩)
হালাল উপার্জন হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে হয়তো আপনাকে বিলাসী জীবন দিতে পারবো না, কিন্তু এটি আপনার বিবেককে শান্ত রাখবে, পরিবারকে পবিত্র খাদ্য দিতে সহায়ক হবে এবং আখিরাতের জবাবদিহি থেকে বাঁচার পথ তৈরি করে দিবে।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে হালাল উপপার্জন করে পবিত্র জীবনযাপন করার তাওফীক দান করুন।







