বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস
ইসলাম যে সাক্ষরতার শিক্ষা দিয়েছে

প্রতীকী ছবি
প্রতি বছর ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। নিরক্ষরতা দূর করা, সবার জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সাক্ষরতার গুরুত্ব তুলে ধরাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৬৭ সাল থেকে ইউনেসকোর উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। একসময় সাক্ষরতার অর্থ ছিল মূলত পড়তে ও লিখতে পারার সক্ষমতা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে, বদলেছে সাক্ষরতার সংজ্ঞাও। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্ময়কর বিস্তারের এই যুগে একটি নতুন প্রশ্ন সামনে আসে যে, শুধু পড়তে ও লিখতে পারলেই কি মানুষ সত্যিকার অর্থে জ্ঞানী হয়ে ওঠে?
আমাদের হাতে এখন বইয়ের পাশাপাশি স্মার্টফোন। একটি ক্লিকেই খুলে যাচ্ছে পৃথিবীর অগণিত তথ্যের দরজা। মুহূর্তের মধ্যে জানা যাচ্ছে দেশ-বিদেশের খবর, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ধর্ম কিংবা রাজনীতির নানা তথ্য। কিন্তু তথ্যের এই বিপুল সমুদ্রে ডুব দিলেই কি জ্ঞান অর্জিত হয়? বাস্তবতা কিন্তু তা বলেনা। কারণ তথ্য জানা আর সত্য জানা এক বিষয় নয়।
বরং তথ্যের প্রাচুর্যের এই যুগে মানুষের সামনে তৈরি হয়েছে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার মতো নতুন এক সংকট। কেননা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়তে কয়েক সেকেন্ড সময়ই যথেষ্ট। পুরোনো কোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, সম্পাদিত ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, মনগড়া বক্তব্য ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে হাজারো মানুষের কাছে। আর সাধারণ দর্শক শ্রোতাগণ অনেক সময় উৎস যাচাই না করেই এসব খবর বিশ্বাস করছি, শেয়ার করছি। এভাবে আমরা অনেকেই নিজে মিথ্যা না বলেও মিথ্যা ছড়ানোর অংশ হয়ে যাচ্ছি।
ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সতর্কতামূলক নির্দেশনা দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! কোনো ফাসিক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করে দেখো, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বসো এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)
কোরআনের এই নির্দেশনা আজকের ডিজিটাল যুগে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। খবরের উৎস কী, তথ্যটি কতটা নির্ভরযোগ্য, এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে একই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না; এসব প্রশ্ন করার অভ্যাসও এখন স্বাক্ষরতার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫)। অর্থাৎ কানে আসা প্রতিটি কথা মুখে তুলে দেওয়া জ্ঞানীর কাজ নয়। বরং জ্ঞানীর পরিচয় হলো, সে শোনে, চিন্তা করে, যাচাই করে, তারপর কথা বলে।
ইসলামের জ্ঞানদর্শনের গভীরতাও এখানেই। কোরআনের নাজিল হওয়া আয়াতের সূচনাই হয়েছে ‘ইকরা’ বা পড়ো শব্দ দিয়ে। বলা হয়েছে- ‘পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক, আয়া : ১)। এখানে শুধু পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি; বলা হয়েছে, ‘তোমার প্রতিপালকের নামে’ পড়তে। অর্থাৎ ইসলামের শিক্ষা শুধু তথ্য সংগ্রহের শিক্ষা নয়; বরং জ্ঞানকে সত্য, নৈতিকতা ও স্রষ্টার প্রতি দায়বদ্ধতার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
তাই আজকের দিনে সাক্ষরতার অর্থও আমাদের একটু বিস্তৃত করে ভাবতে হবে। অক্ষর চেনা জরুরি, বই পড়া জরুরি, প্রযুক্তি ব্যবহার জানা জরুরি। কিন্তু তার সঙ্গে জরুরি সত্য-মিথ্যা যাচাই করার ক্ষমতা, যুক্তি দিয়ে ভাবার অভ্যাস, দায়িত্বশীলভাবে তথ্য ব্যবহার এবং নিজের জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানোর মানসিকতাও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তাই বিশ্ব সাক্ষরতা দিবসে শুধু নিরক্ষরতার অন্ধকার দূর করার প্রত্যয় নয়, আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, তথ্যের এই আলোকিত পৃথিবীতেও আমরা যেনো বিভ্রান্ত না হই। কারণ বর্তামান বিশ্বে অজ্ঞতার চেহারা বদলে গেছে। অজ্ঞতা মানেই এখন অক্ষর না-চেনা নয়; কখনো কখনো অসংখ্য তথ্যের ভিড়ে সত্যকে চিনতে না পারাও অজ্ঞতা।
আমাদের পড়তে শেখার পাশাপাশি সত্য পড়তে শেখাটাও দরকার। তথ্য জানার পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে শেখাও দরকার। মনে রাখতে হবে যে, প্রকৃত সাক্ষর সেই মানুষ, যে অক্ষর পড়তে পারার সাথে সাথে সত্যও চিনতে পারে। নিজ জ্ঞান দিয়ে অন্ধকার না বাড়িয়ে আলো ছড়াতে পাশে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক





