ইনু-মেননকে বাদ দিয়ে জাসদ ওয়ার্কার্স পার্টি!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে প্রান্তে— মাত্র এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির দুই পরিচিত দল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির অবস্থানে এসেছে নাটকীয় পরিবর্তন। যে দল দুটি দেড় দশক আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব করেছে, সংসদে উপস্থিতি ধরে রেখেছে— তারাই এখন অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে নতুন সাংগঠনিক কৌশল খুঁজছে।
দল দুটির সামনে সবচেয়ে বড় সংকট শুধু শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি বা আত্মগোপনে থাকা নয়; বরং দীর্ঘদিনের ব্যক্তিনির্ভর নেতৃত্বের পর হঠাৎ করে একটি কার্যকর বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু নেতৃত্বের সংকট নয়, বরং জোটনির্ভর রাজনীতি থেকে সাংগঠনিক রাজনীতিতে ফিরে যাওয়ার কঠিন এক পরীক্ষা।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত হয়েছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন একাধিক হত্যা মামলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলার মুখোমুখি। দুই দলের সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা ও শিরীন আখতার রয়েছেন আত্মগোপনে। ফলে নেতৃত্বের কেন্দ্র কার্যত অকার্যকরই বলা চলে।
এমন বাস্তবতায় দল দুটি এখন দ্বিতীয় ও তৃতীয় সারির নেতাদের সামনে এনে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব, সাংগঠনিক সফর, নিষ্ক্রিয় ইউনিট পুনর্গঠন এবং দলীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রস্তুতিও শুরু করেছে।
ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতির সীমাবদ্ধতা
দীর্ঘদিন জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি মূলত হাসানুল হক ইনু এবং রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বকেন্দ্রিক দল হিসেবে পরিচিত। যদিও আদর্শগতভাবে উভয় দলই যৌথ নেতৃত্বের কথা বলে; বাস্তবে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, জোট-রাজনীতি কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক কৌশল নির্ধারণে শীর্ষ নেতাদের ভূমিকাই ছিল প্রধান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এ বাস্তবতাই এখন দল দুটির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ায় শীর্ষ নেতৃত্ব অনুপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাংগঠনিক স্থবিরতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দুই দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারাও বিষয়টি অস্বীকার করছেন না। তাদের ভাষ্য, বর্তমান বাস্তবতায় শীর্ষ নেতারা দ্রুত রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন— এমন সম্ভাবনা কম। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের পরিবর্তে সাংগঠনিক কাঠামোকে সক্রিয় রাখাই এখন মূল লক্ষ্য।
জোট রাজনীতি থেকে সাংগঠনিক সংকট
২০০৪ সালে ১৪-দলীয় জোট গঠনের পর থেকেই জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনীতির বড় অংশ আবর্তিত হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটকে কেন্দ্র করে। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের অংশ হিসেবে তারা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছে। সরকারেও অংশ নিয়েছে।
সমালোচকদের মতে, এই দীর্ঘ জোট-রাজনীতির ফলে দল দুটির নিজস্ব সাংগঠনিক বিস্তার ও স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতাও প্রকাশ্যে আসে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মাঠপর্যায়ে বহু ইউনিট নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, অনেক নেতাকর্মী আড়ালে চলে যান এবং সাংগঠনিক যোগাযোগেও ভাটা পড়ে।
ভাঙনের ইতিহাস, ঐক্যের নতুন পরীক্ষা: জাসদের ইতিহাস মূলত একের পর এক বিভক্তির ইতিহাস। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলটি নানা আদর্শিক ও সাংগঠনিক দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। বাসদ, আ স ম আবদুর রবের জাসদ, শাজাহান সিরাজের গ্রুপ, ঐক্য জাসদ— প্রায় প্রতিটি দশকেই দলটি নতুন বিভক্তির মুখ দেখেছে।
ওয়ার্কার্স পার্টির ইতিহাসও খুব ভিন্ন নয়। স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা থেকে গড়ে ওঠা দলটি একাধিকবার ভাঙনের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থানে এসেছে।
ফলে বর্তমান সংকট শুধু নেতৃত্বের নয়; বরং দলীয় ঐক্য ধরে রাখারও পরীক্ষা। দলীয় নেতাদের আশঙ্কা, শীর্ষ নেতৃত্ব দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে নতুন করে বিভক্তির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
জাসদের এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলের ভেতরে ও বাইরে কয়েকটি পক্ষ আবারও বিভক্তি তৈরির চেষ্টা করেছে। এমনকি দলীয় কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। তবে সংগঠনের নেতাকর্মীরা তা প্রতিহত করেছেন।
তৃণমূলের ওপর ভরসা
দুই দলের নেতারাই এখন তৃণমূল সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন। জাসদের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেছেন, দল কোনো একক নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়। অতীতেও সংকটের সময়ে তৃণমূলের নেতারাই সংগঠন সচল রেখেছেন। এবারও সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগানো হবে।
ওয়ার্কার্স পার্টির মিডিয়া বিভাগের আহ্বায়ক মোস্তফা আলমগীর রতন বলেছেন, দল এরই মধ্যে ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্ব নির্বাচন করেছে। দেশের ৬৪ জেলায় সাংগঠনিক সফর বাড়ানো হয়েছে এবং সংগঠন পুনর্গঠনের কাজ চলছে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুর আহমেদ বকুল জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরে পার্টি কংগ্রেস আয়োজনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানেই নতুন নেতৃত্ব নির্ধারণ হবে।
সামনে কোন পথ?
জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির বর্তমান সংকট শুধু দুই দলের সাংগঠনিক সংকট নয়; এটি বাংলাদেশের বাম রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। একদিকে দীর্ঘদিনের পরিচিত নেতৃত্ব আইনি ও রাজনৈতিক সংকটে আটকে আছে, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এখনো জাতীয় পর্যায়ে তেমন পরিচিত নয়। ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে রূপান্তরের যে দাবি দুই দল এখন তুলছে, সেটি বাস্তবে কতটা সফল হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন এবং পরবর্তী কয়েক দশকেও ১৪ দলভুক্ত বাম ও প্রগতিশীল দলগুলোর উল্লেখযোগ্য বুদ্ধিবৃত্তিক এবং রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল। তবে বিশেষ করে, এরশাদ-পরবর্তী সময় থেকে তাদের জনভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই দলগুলো কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে বলে যে জনধারণা তৈরি হয়েছে, তার ফলে তারা প্রায় পুরোপুরি জনসমর্থন হারিয়েছে।
ড. কাজী মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, বাস্তবে এসব দলের এখন উল্লেখযোগ্য জনসম্পৃক্ততা নেই। তাদের সাংগঠনিক উপস্থিতিও সীমিত। শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই আইনি জটিলতায় থাকায়, দীর্ঘদিন নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত নেতাকর্মীরা দল পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন। তবে জনভিত্তির সংকট কাটিয়ে রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থান ঘটানো তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে।
বর্তমান সংকট শুধু সাময়িক নেতৃত্বশূন্যতার নয়; বরং এটি নির্ধারণ করবে জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টি ভবিষ্যতেও ব্যক্তিনির্ভর দল হিসেবেই টিকে থাকবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করে প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনে রূপ নিতে পারবে।
দু-দলই বলছে, এ সংকটকে তারা নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে দেখতে চায়। তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সংগঠন পুনর্গঠনের এই পরীক্ষাই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির এ দুই ঐতিহ্যবাহী দলের আগামী দিনের পথচলা।






