স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই
- চেতনা বিক্রির পরিণতি ভবিষ্যতে দেখা যাবে
- ‘আ. লীগের দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে’
- জানালেন পর্দার অন্তরালের কথা

সালাহউদ্দিন আহমদ
জুলাই বিপ্লবের চেতনা নিয়ে যারা রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে, চেতনা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি ভবিষ্যতে জাতি দেখবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। আজ শনিবার জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, ‘যারা এই অনুষ্ঠানের আয়োজক তাদের প্রতি অনুরোধ— এই জুলাইয়ের চেতনা নিয়ে যেন আমরা কেউ ব্যবসা না করি। যারা বিভিন্নভাবে রাজনৈতিক সংগঠন করে ফায়দা নেয়ার জন্য চেতনা বিক্রি করছে, তাদের পরিণতি কিন্তু ভবিষ্যতে দেখা যাবে। ইতিহাস কিন্তু তাই।’
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পরিণতির কথা উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিক্রি করত, তারা চেতনা বিক্রি করতে করতে আজকে দিল্লি গিয়ে বসে আছে। বাংলাদেশের মানুষ তাদের উৎখাত করেছে। সুতরাং চেতনা বিক্রির ব্যবসা ভালো নয়, রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার উদ্দেশ্য ভালো না।’
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও নিজের নির্বাসিত জীবনের স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি। ‘কিছু পর্দার আড়ালের কথা আজ অবমুক্ত করতে চাই। আমি ও আমার নেতা দুজনেই নির্বাসিত ছিলাম। আল্লাহর কি মহিমা— যদি আমরা নির্বাসিত না থাকতাম হয়ত এই জুলাইয়ের মত একটা অভ্যুত্থান সফলভাবে সমাপ্ত করা সম্ভব হত না। এটাই হচ্ছে পর্দার অন্তরালের কথা।’
‘কোনোদিন আমরা ঘুমাইনি। ২৪ ঘণ্টা কো-অর্ডিনেশন করে নেতাকর্মীদের বিভিন্নভাবে অর্গানাইজ করে এই জুলাই যোদ্ধাদের সম্মুখে রেখে অরাজনৈতিক পরিচয়ে আন্দোলন একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে এসেছি।’
‘যেদিন আমরা ১৬ জুলাই পর্যন্ত পৌঁছালাম সেদিন আমার নেতা বলেছেন, দফা এক দাবি এক। স্বৈরাচারের পদত্যাগ। অন্য কোনোভাবে সমস্যার সমাধান হবে না’, যোগ করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য।
‘আজ যারা জুলাই যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দাবি করেন তাদের অনেকেই সেদিন বলেছিল, আমাদের কোনো রাজনৈতিক দাবি নেই। কোটা বৈষম্য দূর করতে হবে সেটাই ছিল তাদের বক্তব্য। আমরা জানি, স্বৈরাচারকে গদিতে রেখে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। তাদের আমরা বোঝাতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু তাদের সেই সাহস ছিল না।’
তিনি বলছিলেন, ‘আমরা অরাজনৈতিকভাবে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এই জায়গায় এসেছি। এই বাংলাদেশ রক্তে রঞ্জিত হয়েছে, শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বিজয় অর্জন করেছি। সেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ে যদি বিভাজন করি তাহলে সর্ববৃহৎ অংশটি থাকবে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের, যুবদলের, বিএনপির অঙ্গ সংগঠনে।’
তিনি মন্তব্য করেন, ‘জাতিসংঘের রিপোর্টে ১৪শ নিহতের কথা বলা আছে। কিন্তু বিভিন্ন পত্রিকায় এবং জরিপে ৭শ থেকে ৮শ’র মতো খতিয়ান পাওয়া যায়। বাকিগুলো গেল কোথায়? কারণ শহীদের খতিয়ান হসপিটাল রক্ষা করতে পারেনি, তাদের ডকুমেন্ট গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। দাফন করা হয়েছে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে। আজ স্বজনরা তাদের কবরের সন্ধান করে। আমরা দিতে পারি না। এরকম একটি নিশৃংস হত্যাকাণ্ডের পরে গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার কোনো অনুশোচনা নেই। তারা জুলাই যোদ্ধাদের অপরাধী তকমা দিচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানকে জঙ্গি তকমা দিচ্ছে। বাংলাদেশে নাকি জঙ্গিবাদের মধ্য দিয়ে তাদের রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে অনুশোচনা নেই। দোষ স্বীকারের অবস্থাও নেই। সেই ইতিহাসও তাদের নেই। উল্টো বিদেশে বসে গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকমের ষড়যন্ত্র করছে। ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে। দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনোদিন রাজনীতি করতে পারবে না।’
শিগগিরই রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের ৪৭ আর্টিকেল অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে আছে, আইসিটি অ্যাক্টে আছে রাজনৈতিক দলের বিচার করা যাবে। সুতরাং অপেক্ষা করুন।’
এ সময় শহীদ ওয়াসিম আকরামের কথা স্মরণ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। ‘শহীদ হওয়ার মাত্র দুইদিন আগে আমাকে শিলংয়ে দেখতে গিয়েছিল ছেলেটা (ওয়াসিম)। কেন বাবা এত টাকা খরচ করে, পাসপোর্ট-ভিসা করে আমাকে দেখতে এলে? বলেছিল, আপনাকে একনজর সামনে থেকে দেখব বড় আশা ছিল। ছবি তুলেছিল, ফেসবুকের প্রোফাইলে ছবিটা সে দিয়েছিল। দুই-তিন সপ্তাহ পরে দেশে এসে বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়ে দিল। বড় করুণ সেই ইতিহাস। তার বাবা তখন বিদেশে। তার মায়ের সাথে কথা বললাম। চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। সে আজ বলল, আমরা দেখতে চাই এই দেশের প্রত্যেকটা খুনের বিচার হয়েছে।’
বিচারের সর্বশেষ অবস্থা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছিলেন, ‘পাঁচটা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় হয়েছে ইতিমধ্যে। বিচারাধীন মামলা ২৭টা। ৭২টা মামলার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। শহীদ আবু সাঈদের মামলায় দুইজনের ফাঁসি হয়েছে। ভাইস চ্যান্সেলরসহ সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা হয়েছে।’
‘প্রথম মামলার রায় হয়েছে গণহত্যার। সবাই জানেন, শেখ হাসিনা, তার সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের ফাঁসির আদেশ হয়েছে। তৎকালীন আইজিপি মামুন রাজসাক্ষী হওয়ায় তার সাজা কম হয়েছে। আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানো হত্যা মামলার দুইজনের ফাঁসি হয়েছে। ওখানে সাবেক একজন এমপি আছে, ওসি আছে। ডিআইজিসহ অন্যান্যদের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে।’
তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘চাঁনখারপুলে হত্যা মামলায় ফাঁসি হয়েছে তৎকালীন স্বৈরাচারের দোসর পুলিশ কমিশনার হাবিব এবং জয়েন্ট কমিশনার সুদীপ্তের। অন্যান্যদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। রামপুরা টিভি সেন্টারের ওখানে একটা ছেলে লুকিয়েছিল। তাকে গুলি করা হয়েছিল। আমি শুনলাম সেই ছেলেটি কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছে। চিকিৎসার মাধ্যমে আল্লাহ তার জীবন বাড়িয়ে দিক। সেই ঘটনায় আরও দুই একজন শিশুসহ হত্যা করা হয়েছে। সেই মামলায় রায় হয়েছে।’
‘সর্বশেষ হাসানুল হক ইনু নামে স্বৈরাচারের একজন দোসর আছে, তার বিচারের রায় বেরিয়েছে। তাকে কেবল ১০ বছরের সাজা দেওয়ায় বাদীপক্ষ সন্তুষ্ট নয়, সেজন্য সেটা আপিল করা হবে শুনেছি। যাতে তার অন্তত সর্বোচ্চ সাজা হয়’, যোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি মো. আবু হোরায়রা, কওমি ছাত্র ফোরামের সভাপতি মাওলানা জামিল সিদ্দিকী, আয়োজক সংগঠন আমরা জুলাই যোদ্ধার সভাপতি আমিনুল ইসলাম ইমন, সাধারণ সম্পাদক আল মিরাজ, শহীদ-২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটির সভাপতি গোলাম রহমান, সাধারণ সম্পাদক রবিউল আওয়াল প্রমুখ।
জুলাই বিপ্লবে শহীদ সন্তানদের নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন শহীদ আবু সাইয়িদের ভাই আবু হোসেইন, শহীদ শাহরিয়ার হোসেন আলভীর বাবা আবুল হোসেন, শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা শফিউল আলম এবং যাত্রাবাড়ীতে শহীদ মিরাজ হোসেনের বাবা আবদুর রব মিয়া। জুলাই বিপ্লবে আহত শাহিন মালু, সুজন মোল্লা, মিল্লাত হোসেন, আল-আমীন, মেহেদি হাসান মিরাজ তাদের আর্তির কথা তুলে ধরেন।





