ক্ষমা চাওয়ার কথা এখন চিন্তায় নেই জামায়াতের
- রাজ্জাকের বই প্রকাশে পুরনো বিতর্ক নতুন করে সামনে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া, আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের বিষয়গুলো বহু পুরনো। দলটির সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা নতুন বই প্রকাশের পর সেই পুরনো বিতর্কই নতুন করে সামনে এসেছে। তবে জামায়াতের নেতারা বলছেন, এসব এখন অপ্রাসঙ্গিক। তাদের ভাষায়, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য এখন ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্যে ১৯৭১ সালের প্রশ্নে সরাসরি ক্ষমা চাওয়ার চেয়ে বর্তমান দলকে অতীতের দল থেকে আলাদা করে দেখানোর প্রবণতাই বেশি স্পষ্ট।
দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, স্বাধীনতার আগের জামায়াতে ইসলামী আর এখনকার জামায়াত এক নয়। তার ভাষ্য, স্বাধীনতার পর দলটির গঠনতন্ত্র, নীতি ও পদ্ধতিতে একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। বর্তমান জামায়াত মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করে বলেও তিনি দাবি করেছেন।
গোলাম পরওয়ার বলেছেন, ‘পাকিস্তান আমলের সেই সময়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তখনকার যেসব রাজনৈতিক দল ছিল, তাদের রাজনৈতিক পলিসি ও ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার পর অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। বহুবার জামায়াতের গঠনতন্ত্র, নীতি ও পদ্ধতি বদল হয়েছে।’
তিনি আরও বলেছেন, জামায়াতের গঠনতন্ত্রে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই ও সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ রয়েছে এবং সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রেও দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির বিষয়টি রয়েছে।
জামায়াত নেতারা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে বলেছেন, বর্তমান প্রজন্মের নেতৃত্বকে ১৯৭১ সালের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। তাদের দাবি, দলটি এখন সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং জনগণের ভোটের মাধ্যমেই তাদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত হয়েছে।
৭১-এর ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এ টি এম আজহারুল ইসলাম বলেছেন, ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য এখন ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক। তার বক্তব্য, জামায়াত বিভিন্ন সময়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং জনগণ যদি দলটিকে ক্ষমা না করত, তাহলে সাম্প্রতিক নির্বাচনে তারা এত বড় জনসমর্থন পেত না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. স ম আলী রেজা এ বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্য এবং ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক দুটি আলাদা বিষয়। রাজনৈতিক সাফল্য অর্জন করলেও কোনো দল সহজে তার ঐতিহাসিক বিতর্ক থেকে মুক্ত হতে পারে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের সঙ্গে ১৯৭১ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই দেশের যেকোনো রাজনৈতিক দলের ১৯৭১ সালের ভূমিকা ভবিষ্যতেও আলোচনায় আসবে।
এদিকে ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক বইয়ে জামায়াতের অভ্যন্তরে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া, আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের দীর্ঘ প্রচেষ্টার নানা তথ্য উঠে এসেছে। বইটির শেষাংশে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়েও বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন আবদুর রাজ্জাক। তার মতে, রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকতে হলে জামায়াতকে অতীতের মুখোমুখি হতে হবে, নেতৃত্বের আধুনিকায়ন করতে হবে এবং নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেদের রাজনীতির সমন্বয় ঘটাতে হবে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ২০১৬ সালে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুরোধে আবদুর রাজ্জাক ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করেছিলেন। তার ভাষ্য, ওই বিবৃতিতে জামায়াত স্বাক্ষর করলে দলটিকে ঘিরে অনেক প্রশ্নের সমাধান হতে পারত।
আইনমন্ত্রীর এমন মন্তব্যের পর কয়েক দশক ধরে জামায়াতের ভেতরে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে আত্মসমালোচনা ও অবস্থান পরিবর্তনের যে আলোচনা ছিল, সেটিই আবার সামনে এসেছে।
স্বাধীনতার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হওয়ায় জামায়াত রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে বহুদলীয় রাজনীতির সুযোগ ফিরে এলে দলটি আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়। বিএনপির সঙ্গে জোট করে ২০০১ সালে সরকারেও অংশ নেয়।
২০১০ সালের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের একাধিক শীর্ষ নেতার বিচার ও দণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে বিষয়টি আবারও জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে। একই সময়ে দলটি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে নানা চাপের মুখে পড়ে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে জামায়াতের জন্যও নতুন পরিসর তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্য এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনে জামায়াতের বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্য দলটির রাজনৈতিক উত্থানকে নতুন মাত্রা দেয়। রাজনৈতিক উত্থান, নেতৃত্বে প্রজন্ম পরিবর্তন এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনী সাফল্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচন থেকে জাতীয় সংসদ— বিভিন্ন পর্যায়ে দলটির রাজনৈতিক প্রভাবও আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু এত পরিবর্তনের পরও ১৯৭১ সালের ভূমিকার প্রশ্নটি রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে যায়নি।
আবদুর রাজ্জাক তার বইয়ে লিখেছেন, ১৯৭১ সালের ছায়া এখনো জামায়াতের ওপর গভীরভাবে রয়েছে। স্বাধীনতার আন্দোলনের প্রতি দলটির তৎকালীন বিরোধিতাই অনেক মানুষের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের অন্যতম কারণ। ফলে শুধু রাজনৈতিক সাফল্য দিয়ে এই ইতিহাসকে পাশ কাটানো সম্ভব নয়।
আবদুর রাজ্জাক মনে করছেন, জামায়াতের টেকসই রাজনৈতিক পুনরুত্থানের জন্য নিজেদের ইতিহাসের সঙ্গে সৎভাবে সম্পৃক্ত হওয়া জরুরি। অতীতের ভুল নিয়ে আত্মসমালোচনা এবং দায় স্বীকারের প্রক্রিয়া এড়িয়ে গেলে দলটির প্রতি অবিশ্বাস থেকেই যাবে।
বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়ার অভ্যন্তরীণ প্রচেষ্টার বিবরণ। আবদুর রাজ্জাক দেখিয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে দলের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত তা আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়নি।
২০১৬ সালে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অনুরোধে তিনি একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে জাতির সামনে একটি অবস্থান তুলে ধরা। বইয়ে আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, ওই খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য একাধিক বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি দলের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পরিণত হয়নি।
তবে ২০১৬ সালের সেই খসড়া নিয়ে জামায়াতের পক্ষ থেকে ভিন্ন ব্যাখ্যাও এসেছে। দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, আবদুর রাজ্জাকের বইয়ে উল্লেখ করা খসড়াটি জামায়াতের অনুমোদিত কোনো স্টেটমেন্ট ছিল না। তার দাবি, দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামগুলোতে অনুমোদন না হওয়া কোনো খসড়াকে দলীয় বিবৃতি বলা যায় না।
জামায়াত নেতারা বলছেন, বর্তমান জামায়াত তার গঠনতন্ত্র ও রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন এনেছে এবং এই দলকে ১৯৭১ সালের জামায়াতের সঙ্গে এক করে দেখা ঠিক নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন, গঠনতন্ত্র সংশোধন কিংবা নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করলেই জামায়াতকে নিয়ে ১৯৭১-এর বিতর্ক শেষ হবে না। তাদের মতে, দলটির ঐতিহাসিক অবস্থান নিয়ে একটি স্পষ্ট ও ধারাবাহিক ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান আগামীর সময়কে বলেছেন, নতুন প্রজন্ম নেতৃত্বে এলেও জামায়াতের নাম, পরিচয় ও ঐতিহাসিক অবস্থানের কারণে ১৯৭১-এর প্রশ্ন বারবার সামনে আসবে। শুধু প্রজন্ম পরিবর্তন নয়, দলটির রাজনৈতিক দর্শন, নীতি ও রাজনীতির ধরনেও পরিবর্তন আনতে হবে।



