স্মরণে আহসান হাবীব
স্বতস্ফূর্ত কবিতার মহান কবি

কবি আহসান হাবীব (২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৭ - ১০ জুলাই ১৯৮৫)
আজ থেকে একত্রিশ বছর আগে, ১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই, বাংলা কবিতার আকাশ থেকে নীরবে এক নক্ষত্র খসে পড়েছিল—কবি আহসান হাবীব, যিনি কোনো অতিকায় উজ্জ্বল বিস্ফোরণে নয়, বরং এক গাঢ় নৈঃশব্দ্যের ভেতর দিয়ে পৃথিবীর আলো-বাতাস থেকে বিদায় নিয়েছিলেন, কিন্তু রেখে গিয়েছিলেন নিজের কবিতায় গড়া এমন এক পৃথিবী যেখানে মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের ক্লান্তি, স্বপ্নভঙ্গের তীব্রতা এবং জীবনের অতি ছোটো ছোটো অথচ অমূল্য আনন্দগুলো এক আশ্চর্য দীপনে ভাস্বর হয়ে আছে।
যেদিন তিনি চলে গেলেন, সেদিন হয়তো তাঁর প্রিয় কোনো ‘ছায়াহরিণ’ মিলিয়ে গিয়েছিল কোনো গভীর অরণ্যে, কিংবা ‘মেঘ বলে চৈত্রে যাব’ বলে কোনো এক অসম্ভব যাত্রার আয়োজন করেছিল; কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া কবিতার প্রতিটি চরণ আজও আমাদের হৃদয়ে, আমাদের প্রতিদিনের সংগ্রামে, আমাদের নিভৃত অবসাদে এবং আমাদের ছোটো ছোটো আনন্দের মুহূর্তগুলোতে দ্রবীভূত হয়ে মিশে যায়। কেননা আহসান হাবীব কেবল একজন কবি নন, তিনি বাংলা আধুনিক কাব্যের এক স্থিতধী, যিনি জীবনের জটিলতা থেকে পলায়ন না করে তাকেই কাব্যে উত্তীর্ণ করেছিলেন এক অনন্য মমত্ববোধ ও নান্দনিক শুদ্ধতায়।
পিরোজপুর জেলার শংকরপাশা গ্রাম—বাংলার চিরায়ত এক সবুজ, নদীবিধৌত জনপদ—যে গ্রামের ধুলোবালি, মাঠের পর মাঠ বিস্তৃত ফসলের জমিন আর মানুষের সহজ-সরল জীবনের চিত্রই ছিল তাঁর চেতনার প্রথম বীজ। ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি এই গ্রামে জন্ম নেওয়া একটি বালকের চোখ যে দৃশ্যগুলো প্রথম দেখেছিল, তা আজীবন তাঁর কবিতায় ফিরে ফিরে এসেছে এক ‘স্বদেশ’-এর প্রতিমা হয়ে। কিন্তু জীবন তো কেবল নিসর্গের নির্মলতা নয়, জীবন এক কঠিন সংগ্রামও, যে সংগ্রামের মুখোমুখি তিনি হলেন খুব অল্প বয়সেই।
১৯৩৫ সালে পিরোজপুর থেকে প্রবেশিকা পাস করার পর বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হলেন, কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার নিষ্ঠুর বাস্তবতা তাঁর পড়াশোনার পথ রুদ্ধ করে দিল। এ যেন সেই চিরায়ত বাঙালি মেধাবী সন্তানের ট্র্যাজেডি, যার স্বপ্ন থাকে আকাশছোঁয়া, কিন্তু পকেট থাকে শূন্য; কিন্তু এই ট্র্যাজেডিকেই তিনি পরবর্তী জীবনে তাঁর কাব্যের সম্পদে পরিণত করেছিলেন, কারণ যে ‘মধ্যবিত্তের সংকট ও জীবনযন্ত্রণা’ পরে তাঁর কবিতার মূল বিষয় হয়ে উঠল, তা তিনি নিজের রক্ত-মাংসে, নিজের কৈশোরে জেনেছিলেন বলেই তা এত অব্যর্থ সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে।
জীবিকার তাগিদে তিনি পাড়ি দিলেন কলকাতায়, যে শহর তখন ছিল বাংলার সংস্কৃতি ও সাহিত্যের কেন্দ্র, আর সেখানে গিয়ে যুক্ত হলেন সাংবাদিকতা পেশায়। ‘তকবীর’, ‘বুলবুল’, ‘সওগাত’—এই পত্রিকাগুলোতে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি শুধু জীবিকার সংস্থানই করেননি, বরং কলকাতার সাহিত্য-আন্দোলনের কেন্দ্রে থেকে, চল্লিশের দশকের কাব্যজগতের বিবর্তন খুব কাছ থেকে দেখার এবং নিজেকে তৈরি করে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
১৯৪৭-এ দেশভাগের যে বিভীষিকা বাঙালির জীবনে নেমে এসেছিল, তা আহসান হাবীবকেও ভিটেছাড়া করেছিল, কিন্তু পেশাদার সাংবাদিক ও কবি হিসেবে তিনি স্থিত হয়েছিলেন পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায়, যে নগরী ধীরে ধীরে হয়ে উঠছিল নবগঠিত রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
ঢাকায় এসে তিনি ‘আজাদ’, ‘মোহাম্মদী’, ‘কৃষক’, ‘ইত্তেহাদ’, ‘পূর্বদেশ’-এর মতো পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন এবং পরবর্তী সময়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘দৈনিক বাংলা’র সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন—এই দীর্ঘ সাংবাদিকতা-জীবন তাঁকে দিয়েছিল সমাজের গভীরে প্রবেশ করার এক বিরল সুযোগ, যে সমাজকে তিনি পরে কবিতায় এঁকেছিলেন এক অনন্য নির্মোহতায়।
ঠিক এই সময়েই, ১৯৪৭ সালে, প্রকাশিত হলো তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’, যে বইয়ের নামই যেন এক যুগের সমাপ্তি ও নতুন কিছুর সূচনার ইঙ্গিত দিচ্ছিল; আর তারপর একে একে এল ‘ছায়াহরিণ’, ‘সারা দুপুর’, ‘আশায় বসতি’, ‘মেঘ বলে চৈত্রে যাব’, ‘দু’হাতে দুই আদিম পাথর’, ‘বিদীর্ণ দর্পণে মুখ’—প্রতিটি গ্রন্থই যেন মধ্যবিত্তের সংকট, নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতাবোধ এবং তারই ফাঁকে প্রকৃতি আর প্রেমের যে চিরন্তন আলো লুকিয়ে থাকে, তারই হীরক ব্যঞ্জনায় উজ্জ্বল।
আহসান হাবীবের কাব্যভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে এক স্বতন্ত্র নাগরিক মননের ছাপ সুস্পষ্ট, অথচ কী আশ্চর্য, এই নাগরিক মনন কখনোই কৃত্রিম তীক্ষ্ণতা বা দুর্বোধ্যতার পথে হাঁটেনি; বরং তা বয়ে নিয়ে এসেছে জীবনের প্রতি এক গভীর আন্তরিকতা, যে আন্তরিকতা তাঁর লেখায় এমন এক বিশ্বাসযোগ্য সরলতার জন্ম দিয়েছে যা পাঠকের হৃদয়কে নিমেষে ছুঁয়ে যায়। তিনি কখনো চিৎকার করে প্রতিবাদ করেননি, বরং এক নরম অথচ তীক্ষ্ণ বিষাদের কুয়াশায় নাগরিক জীবনের সব একাকিত্ব আর অবসাদকে মুড়ে দিয়েছেন।
তাঁর কবিতায় যে মধ্যবিত্তের সংকট ধরা পড়ে, তা কোনো রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো নয়, তা এক জীবন্ত মানুষের প্রতিদিনের যাপনের ছবি—সেখানে আছে অর্থাভাব, আছে ঘর-সংসারের টানাপোড়েন, আছে ভালোবাসার অভাব, কিন্তু সেইসব ফাটলের ভেতর দিয়েই তিনি আলো দেখতে পেয়েছেন, যে আলো কখনো ফুলের বুকে টলমল শিশির, কখনো বা মায়ের হাতের সানকি ভরা ফুলের মতো ভাত।
শিশুসাহিত্যে তাঁর অবদান এক অনন্য সম্পদ, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে বড়োদের জন্য জীবন যত কঠিনই হোক, শিশুমনের জন্য কল্পনার যে স্বর্গ, তা কখনো হারিয়ে যায় না। ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’, ‘জ্যোৎস্না রাতের গল্প’, ‘ছুটির দিনদুপুরে’—এসব গ্রন্থে তিনি যে ছন্দের জাদু ও কল্পনার জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, তা বাংলা শিশুসাহিত্যের অমূল্য রত্ন। তবে তাঁর শিশুতোষ কবিতার দার্শনিক গভীরতা সবচেয়ে ভালোভাবে ধরা পড়ে সেই সব কবিতায়, যেগুলো বড়োরাও সমান আগ্রহে পড়তে পারে, কারণ সেখানে জীবনের সবচেয়ে গভীর প্রশ্নগুলো সরলতম রূপে ধরা দেয়।
তাঁর ‘আনন্দ’ কবিতাটি পড়লেই বোঝা যায় তিনি কী অনায়াসে শিশুর কৌতূহলী মন ও একজন প্রাপ্তবয়স্কের অস্তিত্ববাদী জিজ্ঞাসাকে একাকার করে দিতে পারেন। কবিতার শুরুতে তিনি প্রশ্ন করছেন: ‘আনন্দরে আনন্দ, তুই কোথায় থাকিস বল। / তুই কি ভোরে ফুলের বুকে শিশির টলমল?’—এ যেন প্রতিটি মানুষের সেই আদি-অন্তহীন খোঁজ, আনন্দ নামক যে অনুভূতিটির জন্য আমরা এত কিছু করি, সে আসলে কোথায় থাকে? কবি তখন একে একে সম্ভাব্য উত্তরগুলোকে এগিয়ে দিচ্ছেন, যেমন ‘সারা দুপুর জুড়ে খাঁ খাঁ রোদের খেলা’, ‘সবুজ ঘাসের বুকে প্রজাপতির মেলা’, ‘বিকেল বেলা পাখির ওড়াউড়ি’, ‘আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে গোত্তা খাওয়া ঘুড়ি’ কিংবা ‘গাঁয়ের খেলার মাঠে লাফিয়ে চলা বল’—প্রকৃতি আর গ্রামীণ জীবনের এই সহজ উপাদানগুলোই যে আনন্দের আধার, তা তিনি বলছেন।
কিন্তু এরপরেই তিনি যে উত্তরণ ঘটিয়েছেন, তা-ই কবি হিসেবে তাঁর মাহাত্ম্যকে প্রকাশ করে; তিনি লিখলেন: ‘আনন্দ রে আনন্দ, বল কোথায় রে তোর বাসা, / তুই কি আমার মা, নাকি তুই মায়ের ভালবাসা?’ এ পর্যন্ত আসার পর আমরা বুঝি যে আনন্দ বাহ্যিক কিছু নয়, তা একান্তই সম্পর্কের, আত্মিক নৈকট্যের, যা মায়ের ভালোবাসার চেয়ে বড়ো হতে পারে না। আবার তিনি এখানেই থামেননি, তিনি কবিতাটিকে নিয়ে গেছেন আরও বাস্তবের গভীরে: ‘বাবার হাতে তুই কি উথাল মাটিতে ধান বোনা? / মায়ের হাতে কুলোয় ভরা ধানের মতো সোনা?’—এখানে আনন্দ হয়ে ওঠে শ্রমের, পরিশ্রমের ফসলের, যা মধ্যবিত্তের জীবনেরই চিরন্তন ছবি।
আর শেষে এসে তিনি যখন বলেন, ‘তুই কি আমার ঘরের চালে ফুরিয়ে যাওয়া রাত? / তুই কি আমার সানকি ভরা ফুলের মতো ভাত?’—তখন মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে মৌলিক, সবচেয়ে আর্ত চাহিদাগুলো পূরণ হওয়ার মধ্যেই যে এক গভীর আনন্দ লুকিয়ে থাকে, তা-ই যেন ধরা পড়ল এক মহাকাব্যিক সরলতায়। এই যে আনন্দের চিরন্তন সংজ্ঞায়নের প্রয়াস, তা কেবল একজন বড়ো কবিই করতে পারেন, যিনি জানেন যে কবিতা কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়, বরং তা জীবনের জৈবিক ও মানসিক সত্যেরই শৈল্পিক প্রকাশ।
তাঁর ‘রূপকথা’ কবিতাটিও একইসঙ্গে শিশু ও বড়ো উভয়ের জন্যই এক মানসলোক নির্মাণ করে, যেখানে কল্পনার স্বাধীনতা ও সৃষ্টির আনন্দের কথা বলা হয়েছে। ‘খেলাঘর পাতা আছে এই এখানে, / স্বপ্নের ঝিকিমিকি আঁকা যেখানে। / এখানে রাতের ছায়া ঘুমের নগর, / চোখের পাতায় ঘুম ঝরে ঝরঝর।’—এই প্রথম চারটি চরণেই তিনি আমাদের নিয়ে যাচ্ছেন এক পরাবাস্তব অথচ আরামদায়ক জগতে, যে জগৎ বাস্তবের সব কঠিনতা থেকে মুক্ত, যেখানে ‘ঘুমের নগর’ যেন এক চিরায়ত আশ্রয়। ‘পরীদের ডানা দিয়ে তৈরি দেয়াল, / প্রজাপতি রং মাখা জানালার জাল’—এখানে শব্দের যে বুনট, তা এতই দৃশ্যময় যে আমরা যেন রঙিন এক কল্পনার বাড়ি চোখের সামনে দেখতে পাই। ‘সাতভাই চম্পার কেটে যায় রাত’—এ পংক্তিটি আমাদের সম্মিলিত বাঙালি অবচেতনের রূপকথার ভাণ্ডার থেকে তুলে এনে কবি এমন এক আরামের আবহ তৈরি করেন, যা আমাদের শৈশবের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে উচ্চারণটি, তা হলো: ‘এইখানে আমাদের মানা কিছু নাই, / নিজেদের খুশি মত কাহিনী বানাই।’ এই দুটি চরণ কেবল শিশুর কল্পনার স্বাধীনতার কথাই বলে না, বরং তা একজন কবিরও মৌলিক ঘোষণা—সৃষ্টির স্বাধীনতাই তো কবিতার প্রাণ, আর আহসান হাবীব সেই স্বাধীনতাকে জীবনের অত্যন্ত কঠিন বাস্তবতার পাশে রেখেও কখনো আপস করতে দেননি, বরং তাকে সবচেয়ে বড়ো আরাম হিসেবে কবিতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
আর তারপরেই আসে সেই কবিতা, যে কবিতায় আহসান হাবীব তাঁর শিল্পী-সত্তার সবচেয়ে আন্তরিক ও গভীরতম পরিচয়টি দিয়ে গেছেন—‘স্বদেশ’। এ কবিতাটি কোনো রাজনৈতিক দেশপ্রেমের কবিতা নয়, বরং তা যেন মায়ের মুখের মতো চেনা এক দৃশ্যপটের প্রতি এক প্রাণের টান, যা এতটাই অন্তরঙ্গ যে তা পড়তে পড়তে মনে হয় যেন আমরা নিজেদেরই গ্রামের নদীটির কথা, মাঠের কথা, মানুষের কথা বলছি। কবিতার শুরু: ‘এই যে নদী / নদীর জোয়ার / নৌকা সারে সারে, / একলা বসে আপন মনে / বসে নদীর ধারে / এই ছবিটি চেনা।’ এ এক এমন ‘চেনা’ ছবি, যার মধ্যে প্রতিটি বাঙালির গ্রাম-বাংলার স্মৃতি লুকিয়ে আছে; কিন্তু ‘কড়িতে নয় কেনা’ বলে তিনি যে গভীর অর্থনৈতিক ও নৈতিক বক্তব্যটি দিয়ে দিলেন, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দৃশ্যগুলো বাজার-মূল্যের ঊর্ধ্বে। ‘মাঠের পরে মাঠ চলেছে / নেই যেন এর শেষ / নানা কাজের মানুষগুলো / আছে নানান বেশ’—এখানে যে শ্রমজীবী মানুষের ছবি, যে বৈচিত্র্যের উৎসব, তা তাঁর চোখের গভীর দৃষ্টিরই ফসল। আর যখন তিনি লেখেন, ‘মাঠের মানুষ যায় মাঠে আর / হাটের মানুষ হাটে, / দেখে দেখে একটি ছেলের / সারাটাদিন কাটে।’—তখন যে দৃশ্যকল্প রচিত হয়, তা যেন নিসর্গের পটে একটি স্থিরচিত্র, যেখানে পর্যবেক্ষক শিল্পী নিশ্চল বসে আছেন, আর তাঁর সামনে দিয়ে জীবনের নদী বয়ে চলেছে। এই যে ‘একটি ছেলে’, সে-ই তো স্বয়ং কবি, যে কিনা ‘সারাদেশের সব ছেলেদের / মুখেতে টুকটুক’ হয়ে ওঠার দাবি রাখে, অর্থাৎ একটি দেশের সম্মিলিত প্রাণশক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। আর তারপরেই আসে সেই আত্মপরিচয়ের মোহন মুহূর্ত: ‘কে তুমি ভাই, / প্রশ্ন করি যখন, / ভালবাসার শিল্পী আমি, / বলবে হেসে তখন।’
এ যেন কবির নিজের আত্মজিজ্ঞাসা ও তার একান্ত উত্তর—শুধু একজন ভূগোল-নির্দিষ্ট দেশের বাসিন্দা নন তিনি, বরং তিনি যে দেশের শিল্পী, সে দেশ ‘ভালবাসার’, আর সে দেশের কোনো মানচিত্র নেই, আছে শুধু মনের মধ্যে গেঁথে থাকা অমোচনীয় ছবি। কবিতার শেষ স্তবকে এসে তিনি যেন পুরো ভাবনাটিকে এক অনন্য ঘোষণায় রূপ দিলেন: ‘এই যে ছবি এমনি আঁকা / ছবির মত দেশ, / দেশের মাটি দেশের মানুষ / নানান রকম বেশ, / বাড়ি বাগান পাখ-পাখালি / সব মিলে এক ছবি, / নেই তুলি নেই রং তবুও / আঁকতে পারি সবই।’ এই শেষের স্বীকারোক্তিতে যে সৃষ্টির আনন্দ, যে আত্মবিশ্বাস, তা সত্যিকারের শিল্পীর—যিনি জানেন, বাস্তবের তুলি-রঙ ফুরিয়ে গেলেও, মনের রং কখনো ফুরোয় না। এই একটি কবিতায় আহসান হাবীব তাঁর সমস্ত জীবনদর্শন, তাঁর নন্দনতত্ত্ব এবং তাঁর গভীরতম মানবিক আর্তি ও স্বপ্নকে একসূত্রে গেঁথে দিয়েছেন, যে কারণে এ কবিতা কালোত্তীর্ণ।
কবি হিসেবে আহসান হাবীবের মূল্যায়ণ করতে গিয়ে আমরা দেখি যে, তিনি বাংলা কবিতায় এক পরিশীলিত নাগরিক কণ্ঠস্বর সঞ্চার করেছিলেন, কিন্তু তা কখনোই রিক্ত শুষ্কতায় পর্যবসিত হয়নি, বরং তাতে মিশে ছিল রোমান্টিকতার এক গাঢ় আর্দ্রতা এবং প্রকৃতির প্রতি এক অটুট টান, যে টান ‘রণসঙ’ নামে কোনো কাল্পনিক ভূখণ্ড নয়, বরং ‘স্বদেশ’ নামে বাস্তবের প্রতিটি মাঠ, নদী ও মানুষের মুখে ধরা দিয়েছে।
তিনি তাঁর সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ইউনেসকো সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক ও একুশে পদকে ভূষিত হয়েছিলেন, কিন্তু এই পুরস্কারগুলো তাঁর কাছে হয়তো ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যতটা ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ কবিতার একটি সার্থক ছন্দ, কিংবা ‘ছায়াহরিণ’-এর একটি নিখুঁত ইমেজ—কারণ তিনি জানতেন, পুরস্কার মানুষের দেওয়া, আর কবিতা ঈশ্বরের।
তাঁর উপন্যাস ‘অরণ্য নীলিমা’ ও ‘রাণীখালের সাঁকো’ তাঁর গদ্যশক্তিরও প্রমাণ, কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচয় কবিতাতেই, যে কবিতায় তিনি মধ্যবিত্তের যন্ত্রণাকে চিত্রিত করেও কখনো আশাহীন হননি, বরং অন্ধকারের ভেতরেই এক চিলতে রোদের সন্ধান করেছেন, যে রোদ কখনো ফুলের বুকে শিশির হয়ে টলমল করেছে, কখনো বা খেলাঘরের স্বপ্নের ঝিকিমিকি হয়ে জেগে থেকেছে, আবার কখনো ভালবাসার শিল্পীর অমোঘ হাসি হয়ে সব কষ্টকে মুছে দিয়েছে।
আজ আহসান হাবীবের প্রয়াণদিন। আমরা যখন তাঁর কবিতায় ফিরে যাই, তখন এটা স্পষ্ট হয় যে, শারীরিক মৃত্যু কখনো কবিকে শেষ করতে পারে না, কারণ কবিতা হলো সেই অক্ষয় সম্পদ যা সময়ের সীমানা পেরিয়ে অনন্তকালের সঙ্গে মানুষের আত্মার যে কথোপকথন চালিয়ে যায়, তারই নাম।
‘স্বদেশ’ কবিতার সেই ছেলেটি আজও নদীর ধারে একলা বসে আছে, আর দেখছে মাঠের পর মাঠ চলে গেছে, দেখছে নানা বেশের নানা কাজের মানুষ, আর মনে মনে বলছে, ‘ভালবাসার শিল্পী আমি’; সেই ভালোবাসা দিয়েই তিনি আঁকতে পেরেছিলেন তাঁর ছবির মতো দেশ, আর সেই আঁকা ছবিগুলোর কাছেই আমরা বারবার ফিরে যাই, যতদিন বাংলা ভাষায় কবিতা লেখা হবে, যতদিন কেউ শিশিরের সৌন্দর্য বুঝবে, যতদিন কেউ মায়ের ভালোবাসায় আনন্দ খুঁজে পাবে। কবি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর কবিতা আমাদের ‘ঘরের চালে ফুরিয়ে যাওয়া রাত’-এর মতোই চিরন্তন, আমাদের ‘সানকি ভরা ফুলের মতো ভাত’-এর মতোই জীবনের অপরিহার্য অন্ন।
লেখক: সাহিত্য সম্পাদক এবং হেড অব ক্রিয়েটিভ, রিসার্চ এন্ড ইভেন্টস, আগামীর সময়







