পারমাণবিক থেকে হরমুজ:
বদলে যাচ্ছে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দীর্ঘদিন ধরে ইরানের শক্তির প্রতীক ছিল তার পারমাণবিক কর্মসূচি। পশ্চিমাদের চাপ, নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক টানাপড়েন সবকিছুর কেন্দ্রেই ছিল তেহরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ একটি নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে— ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি কি আসলেই পরমাণু, নাকি তার ভৌগোলিক অবস্থান।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে ইরানের নতুন চিন্তাভাবনা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথগুলোর একটি হরমুজ প্রণালি। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এই পথের নিরাপত্তা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের বিষয় নয়; এটি ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকাসহ পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে বলে এসেছে, তাদের ওপর চরম চাপ তৈরি হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। একসময় অনেকে বিষয়টিকে রাজনৈতিক বক্তব্য বা চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনা দেখিয়েছে, এই সামুদ্রিক পথ নিজেই একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে।
এমনকি এটি ইরানের দীর্ঘদিনের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির বিকল্প কৌশল হিসেবেও আলোচনায় আসছে।
বছরের পর বছর ধরে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির পেছনে বিপুল অর্থ, প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় করেছে। একই সঙ্গে এই কর্মসূচির কারণে দেশটি কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও পারমাণবিক ইস্যু বড় বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সংস্কারপন্থী ও কট্টরপন্থীদের মধ্যে অন্যতম বড় বিতর্ক ছিল, এই কর্মসূচির মূল্য আসলে কতটা যুক্তিযুক্ত।
অনেকে মনে করতেন, পারমাণবিক সক্ষমতা ইরানের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এটি দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। পারমাণবিক স্থাপনা হামলার ঝুঁকিতে থাকতে পারে, কিন্তু ইরানের ভূগোলকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়। এই জায়গাতেই সামনে এসেছে হরমুজ প্রণালি।
ইরানের কিছু নীতিনির্ধারক ও বিশ্লেষক এখন মনে করছেন, প্রতিরোধ ক্ষমতার আসল উৎস হতে পারে সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। কারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে।
অর্থাৎ, যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে হরমুজ ইরানকে তুলনামূলক কম খরচে বৈশ্বিক প্রভাব তৈরির সুযোগ দিতে পারে।
এই পরিবর্তন শুধু সামরিক কৌশল নয়, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও বদলে দিতে পারে।
গত দুই দশকে পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইরানের নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাজনীতি আরও শক্তিশালী হয়েছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশে সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বেড়েছে।
যদি ইরানের কৌশলের কেন্দ্র পরমাণু থেকে সরে ভূগোল, বাণিজ্য ও সমুদ্রপথে যায়, তাহলে কূটনীতিক, অর্থনীতিবিদ ও প্রযুক্তিবিদদের গুরুত্ব বাড়তে পারে।
দেশটির দক্ষিণাঞ্চল, বন্দর, জাহাজ চলাচল, জ্বালানি পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তখন নতুন গুরুত্ব পাবে। এর প্রভাব পড়তে পারে আঞ্চলিক সম্পর্কেও।
পারস্য উপসাগরের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু হরমুজকেন্দ্রিক কৌশল হলে সামরিক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সমুদ্র নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও আলোচনার প্রয়োজনীয়তা বাড়তে পারে।
এতে আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নতুন পথে এগোনোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। ইসরায়েলের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। পারমাণবিক কর্মসূচিকে ইসরায়েল সরাসরি অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে দেখে। কিন্তু হরমুজ প্রণালি মূলত অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার, যা ভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা বাস্তবতা তৈরি করে। তবে এর অর্থ এই নয় যে হরমুজকেন্দ্রিক কৌশল ঝুঁকিমুক্ত।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পথ বন্ধ করা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে, বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং বড় সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবু বর্তমান বিতর্ক একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইরান হয়তো এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে দেশটির ভবিষ্যৎ শক্তির ধারণা বদলে যেতে পারে— পরমাণু স্থাপনার গোপন কক্ষ থেকে সরে গিয়ে সমুদ্রপথ, বাণিজ্য ও ভূগোলের বাস্তবতায়।
প্রশ্ন এখন একটাই— ইরান কি পুরনো পারমাণবিক দ্বন্দ্বের পথেই থাকবে, নাকি হরমুজকে কেন্দ্র করে নতুন এক কৌশলগত অধ্যায় শুরু করবে? এই সিদ্ধান্ত শুধু ইরানের ভবিষ্যৎ নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলে দিতে পারে।
লেখক: লন্ডনভিত্তিক ইরান ও গণমাধ্যমবিষয়ক গবেষক










