সম্পাদকীয়
আপনি আচরি ধর্ম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিরোধী দল মানেই সরকারের বিরোধিতা করা নয়; বিরোধী দল মানে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া, অনিয়মের প্রতিবাদ করা এবং জনগণের স্বার্থে বিকল্প রাজনৈতিক দর্শন ও কর্মসূচি তুলে ধরা। কিন্তু যে দল নিজেই অনিয়ম, বিতর্ক ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে জড়িয়ে পড়ে, সেই দলের মুখে দুর্নীতি ও সুশাসনের কথা ক্রমেই হাস্যকর হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীও এখন এমন এক কঠিন বাস্তবতা ও পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
গতকাল বুধবার ‘জামায়াত এমপি মাসুদ সাঈদীর পাঁচ তারকা হোটেলের নির্মাণকাজ বন্ধ করেছে প্রশাসন’ খবরটি সংবাদ মাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। এমপি মাসুদ সাঈদী জামায়াতের সাবেক নেতা প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র। প্রকাশিত সংবাদে যে তথ্য এসেছে, তা নিছক একটি ভবন নির্মাণ বন্ধের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় জামায়াতের টিকিটে নির্বাচিত এমপি মাসুদ সাঈদীর নির্মাণাধীন পাঁচ তারকামানের ‘ইস্তানবুল’ হোটেলের নির্মাণকাজ স্থানীয় প্রশাসন বন্ধ করেছে— অভিযোগ, নির্মাণ কার্যক্রম যথাযথ নিয়ম ও প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না। একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এমন একটি স্থাপনার নির্মাণকাজ প্রশাসনকে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। এটি গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এখানেই জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শিক্ষা হলো, যে দল বিরোধী অবস্থানে থেকে সরকারের জবাবদিহি দাবি করবে, সেই দলের জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডও জনগণের কাছে স্বচ্ছ ও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকা প্রয়োজন। বিরোধী দলের একজন এমপির ব্যক্তিগত ব্যবসা, সম্পদ, নির্মাণকাজ কিংবা অন্য কোনো কর্মকাণ্ডে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে না; তা তার রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। জামায়াতে ইসলামী ধর্মীয় মূল্যবোধ, স্বচ্ছ, ইমান-আকিদা ও সততার রাজনীতি করে বলে দলটির নেতারা জোরালো দাবি করেন।
দুঃখজনকভাবে সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতকে নানা ধরনের বিতর্কের মুখোমুখি হতে দেখা যাচ্ছে। নারী-সংক্রান্ত অভিযোগ থেকে শুরু করে দখলদারি কিংবা বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ— কোনোটিই একটি রাজনৈতিক দলের জন্য সুখকর নয়। পিরোজপুরে দেশের সেরা সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার ও দাফন নিয়ে যে ভূমিকা জামায়াত রেখেছে, তা ইতিহাসে আরেকটি কালো রেখা হয়ে থাকবে। নারীঘটিত কেলেঙ্কারির জন্য দলের এক এমপি সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন সংসদ থেকে। ওই সংসদ সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে জটিলতা ও বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। এমন আরও বেশ কিছু ন্যক্কারজনক অভিযোগ উঠেছে দলটির কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। মোটকথা, বর্তমান সরকারের আমলে শুরুর দিকে জামায়াত যেভাবে ঝলসে উঠেছিল, এখন ঠিক বিপরীত গতিতে ম্রিয়মাণ। এগুলোকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত, আইনানুগ ব্যবস্থা এবং জনগণের সামনে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা থাকা দরকার।
রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি হলো— নিজের দলের অনিয়মকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ আর অন্য দলের অনিয়মকে ‘দুর্নীতির মহোৎসব’ বলা। একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের বিরোধিতা করবে— এমন নয়। ভালো কাজের প্রশংসা করবে, খারাপ কাজের সমালোচনা করবে।
কুয়াকাটায় হোটেল নির্মাণের ঘটনাটিও সে কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণকাজ যদি বিধিবিধান অনুসরণে না হয়ে থাকে, প্রশাসনের বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত যথাযথ। আবার যদি অভিযোগের ভিত্তি না থাকে, সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। কোনো জনপ্রতিনিধি বলে আইন তার জন্য আলাদা হবে না।
জামায়াতের সামনে তাই এখন দুটি পথ। একদিকে তারা ধর্মীয় আবরণ, রাজনৈতিক স্লোগান ও প্রতিপক্ষের সমালোচনাকে ঢাল বানিয়ে নিজেদের বিতর্কগুলোকে চাপা দিতে পারে। অন্যদিকে তারা সত্যিকার অর্থে একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হওয়ার চেষ্টা করতে পারে। দ্বিতীয় পথটিই তাদের জন্য অধিক সম্মানের।



