সম্পাদকীয়
ডুবছে খাদ্যনিরাপত্তা

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে একদিকে পানিতে ডুবে মরছে মানুষ। যারা বেঁচে গেছেন তারা ছুটছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। মানুষ যেখানে বেঁচে থাকতে লড়াই করছেন, সেখানে ফসলি জমির কী পরিস্থিতি তা অনুমেয়।
বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি ধান, আর ধান উৎপাদনে আমন ও আউশ মৌসুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট উৎপাদিত ধানের ৪৫ শতাংশ আসে এ দুই মৌসুমে। তাই এ দুর্যোগ নিঃসন্দেহে আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় আঘাত।
পার্বত্য অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। তলিয়ে যাওয়া ওই জমিগুলোতে রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পাট, গ্রীষ্মকালীন সবজি, মরিচ, আদা, হলুদসহ আরও বেশ কিছু ফসল। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ১২ জেলায় ২৮ হাজার ৬১০ হেক্টরের ফসল আক্রান্ত হয়েছে। আরও প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর জমির ফসল রয়েছে জলমগ্ন অবস্থায়।
ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। প্রতি বছরই দেশের কৃষকরা এমন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। দুর্যোগের পরে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে বীজ, সার এবং আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে থাকে। তবে দীর্ঘসূত্রতা, তালিকায় অনিয়মের ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরিবর্তে সুবিধাভোগীরা তালিকায় ঢুকে পড়েন। এবার আক্রান্ত অঞ্চলের কৃষকরা যেন এমন রূঢ় পরিস্থিতিতে না পড়েন, সে বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃঢ় ভূমিকা আমাদের প্রত্যাশা। এ ছাড়া কৃষি খাতের বিষয়ে আরও মনোযোগী হতে হবে। কারণ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মতো ভয়ংকর ও জটিল পরিস্থিতি আমাদের সামনে রয়েছে। সোমবার দৈনিক আগামীর সময় পত্রিকায় ‘তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় দেশের দেড় কোটি মানুষ’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশনের (আইপিসি) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের দেড় কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সময় তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা বেড়ে হতে পারে ১ কোটি ৮১ লাখ। এর মধ্যে জরুরি অবস্থার মধ্যে পড়বেন ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ। সংকটের কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব হাওর এলাকায় গত এপ্রিলের বন্যায় আগাম ফসল কাটতে হয়েছে। এতে বোরো ধানের ১১ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি ক্রমবর্ধমান চাপ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে ত্বরান্বিত করেছে।
এই ভয়াবহ পূর্বাভাসকে কোনোভাবেই হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। যদিও সারা বিশ্বেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় সৃষ্ট অর্থনৈতিক টানাপড়েন খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাজার অস্থিরতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের বড় অংশের মানুষ পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়েন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা প্রতি বছরই ফসলের মারাত্মক ক্ষতি করছে। এই সংকট মোকাবিলায় খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং তা দ্রুত মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। বছরের যে সময়ে প্রাকৃিতক দুর্যোগ কম থাকে সে সময়, পুরনো চাষপদ্ধতির বাইরে গিয়ে ড্রিপ ইরিগেশন, গ্রিনহাউজ প্রযুক্তি ব্যবস্থার দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে কম খরচে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। এ বিষয়ে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করাও যেতে পারে।
খাদ্য মানুষের মৌলিক অধিকার। সংকট সমাধানে এখনই তৎপর হতে হবে। নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে, টেকসই খাদ্যনিরাপত্তাই দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি।




