সম্পাদকীয়
ঝুঁকিতে ভবন শঙ্কায় শিশুজীবন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্কুলে শিশুরা যায় নিজেকে গড়তে, স্বপ্ন দেখতে, বিশ্বটাকে পড়তে। কিন্তু সেই স্কুলই যদি হয়ে ওঠে আতঙ্কের জায়গা, তাহলে শিক্ষার পরিবেশের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় নিরাপত্তার প্রশ্ন। বাগেরহাটের রামপালে ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ, আতঙ্কে ১ হাজার ৭৭০ শিশু— এ প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য শুধু একটি অবকাঠামোগত দুর্বলতার খবরই নয়; এটি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্বহীনতার একটি গুরুতর চিত্র।
এই ১৯টি বিদ্যালয়ে পড়ছে প্রায় ১ হাজার ৭৭০ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৭৭০টি শিশু এমন ভবনে প্রবেশ করছে, যেগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। তাদের সঙ্গে স্কুলে পাঠানো হচ্ছে হাজারো পরিবারের উদ্বেগ। প্রত্যেক মা-বাবা সন্তানকে বিদ্যালয়ের গেটে পৌঁছে দিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরবেন— এটিই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
কিন্তু ভবন যদি ঝুঁকিপূর্ণ হয়, তাহলে সন্তান স্কুলে যাওয়ার পর অভিভাবকের মনে দুিশ্চন্তা ঘুরপাক খাওয়াই স্বাভাবিক। তার সন্তান নিরাপদে বাড়িতে ফিরবে তো?
বিদ্যালয়ের দেয়ালে ফাটল ধরলে, ছাদ দুর্বল হলে, পলেস্তারা খুলে পড়লে, ভবনের বিভিন্ন অংশ ব্যবহারের অনুপযোগী হলে— সেটি রাতারাতি ঘটে না। দীর্ঘদিনের অবহেলা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার না করার ফলেই সাধারণত একটি সরকারি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমস্যা যখন এতদূর গড়িয়েছে, তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অজানা থাকার কথা নয়।
স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাজ কি শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষকদের তদারকি, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা বিদ্যালয়ে উপস্থিতির হিসাব রাখা? বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একইভাবে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রকৌশল-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো, সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা।
উদ্বেগের বিষয় হলো, দুর্ঘটনা ঘটার আগে আমরা সাধারণত সতর্ক হই না। ভবন ধসে পড়বে, কেউ আহত হবে বা প্রাণহানি ঘটবে, তারপর তদন্ত কমিটি হবে, পরিদর্শন হবে, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হবে— এই চেনা সংস্কৃতি থেকে আমরা কবে নিষ্কৃতি পাব, সেটি এক বড় প্রশ্ন।
মনে রাখা দরকার, একটা দুর্ঘটনার পর দায়ী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করলেই হারানো জীবন ফিরিয়ে আনা যায় না। একটি শিশুর প্রাণের মূল্য কোনো ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে নিরূপণ করাও সম্ভব নয়। একজন অভিভাবক তার সন্তানকে স্কুলে পাঠান রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রেখে। রাষ্ট্র সেই আস্থার জায়গাটি যদি নিরাপদ রাখতে না পারে, তাহলে শিক্ষার অধিকারও এক অর্থে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে।
রামপালের ১৯টি বিদ্যালয়ের ঘটনায় অভিভাবকদের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। সারা দেশে এমন বিদ্যালয় নেই, তা হলফ করে বলা যায় না। েসসব ভগ্নপ্রায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সন্তানকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠাতে অভিভাবকদের বাধ্য করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই সেসব সংস্কার জরুরি।
বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণ করা হলে ওই সময়টুকু শিক্ষার্থীরা কোথায়, কোন পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করবে, সে পরিকল্পনাও থাকতে হবে। তাদের পাঠক্রম কোনোভাবে যেন ব্যাহত
না হয়।
রামপালের ১৯টি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয় সারা দেশের জন্য সতর্কবার্তা। এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায় শুধু ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।



