আগামীর চোখ
গুরুকুল প্রথার প্রত্যাবর্তন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরাবর
মঞ্জুরি কমিশন সমীপেষু
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ভবঘুরে শিক্ষার্থীর বিনীত প্রণাম গ্রহণ করিবেন। আমরা যে যুগে বাস করিতেছি, তাহাকে বিজ্ঞানের যুগ বলা হইলেও আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা প্রতিদিন সানন্দে আদিম যুগের এক-পণ্ডিতি ‘টোলপ্রথা’র সার্থক মহড়া দিয়া চলিতেছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের গাছতলায় বসিয়া প্রকৃতির কোলে জ্ঞানচর্চার কথা বলিয়াছিলেন, আর আপনারা আমাদিগকে জহির রায়হান মিলনায়তন কিংবা বহুদূরবর্তী প্রাণিবিদ্যার ল্যাবে প্রব্রজ্যা করাইয়া সেই মুক্ত জ্ঞানচর্চার মহত্তম স্বাদ পাইবার দুর্লভ সুযোগ করিয়া দিয়াছেন।
আমাদের আইন ও বিচার বিভাগের নিজস্ব কোনো গৃহ নাই। সমাজবিজ্ঞান ভবনের বারান্দায় অথবা অন্য বিভাগের দয়া-দাক্ষিণ্য পাওয়া কক্ষে আমাদের বিদ্যাচর্চা চলে। অনেক সময় অন্যের গৃহে পাঠরত অবস্থায় হঠাৎ প্রকৃত গৃহকর্তা বা তাহাদের শিক্ষার্থীদের আগমন ঘটিলে আমাদিগকে মাঝপথেই পাঠ ত্যাগ করিয়া প্রস্থান করিতে হয়। রবিঠাকুরের আম্রকাননের খোঁজে আমরাও নিত্যকাল এক স্থান হইতে অন্য স্থানে জ্ঞানের খোঁজে দৌড়াইতেছি। উপরন্তু, প্রাচীন টোল ব্যবস্থার পণ্ডিত মশাইদের ন্যায় আমাদের অনুষদে অতিথি শিক্ষকগণের মহামূল্যবান আবির্ভাব ঘটে। ১২ জনের ৯ জন শিক্ষকই যখন দূরদেশে বিদ্যা অর্জনে ব্যস্ত, তখন সপ্তাহে এক দিন আসিয়া যিনি মুষলধারে তিন ঘণ্টা টানা জ্ঞানবর্ষণ করেন, তাহাকেই আমরা আধুনিক টোলের একমেবাদ্বিতীয়ম ‘গুরুজি’ মানিয়া ধন্য হই।
রবিঠাকুরের আম্রকাননের খোঁজে আমরাও নিত্যকাল এক স্থান হইতে অন্য স্থানে জ্ঞানের খোঁজে দৌড়াইতেছি
ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অবস্থা আরও প্রীতিপ্রদ। পরিত্যক্ত ভবনের ছাদ চুইয়ে যখন বর্ষার বারিধারা আমাদের মস্তকে নিপতিত হয়, তখন আমরা বুঝিতে পারি যে, শিক্ষা ঝরিয়া পড়ে আকাশ হইতে। সেমিনার কক্ষ, কমনরুম না থাকাটা আমাদের বৈরাগ্য সাধনে দারুণ সহায়তা করিতেছে। অন্যদিকে তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের সাতটি ব্যাচের ২৪৫ জন শিক্ষার্থীর জন্যে মাত্র দুইটি শ্রেণিকক্ষ বহাল রাখা হইয়াছে, যাহাতে আমরা মিলনের মহতী শিক্ষা লাভ করিতে পারি। এক ব্যাচ পরীক্ষা দিলে অন্য ব্যাচ যেন রোদে পুড়িয়া, বৃষ্টিতে ভিজিয়া প্রকৃতির সহনশীলতার পরম পাঠ আয়ত্ত করিতে পারে, আপনারা সেই সূক্ষ্ম বন্দোবস্তই করিয়াছেন।
হাজার কোটি টাকার বিশাল উন্নয়ন প্রকল্পের বিশালতায় ক্ষুদ্র বিভাগের জন্যে একটি ভবন বরাদ্দ না করিয়া আপনারা আমাদের বিনয়ী হইতে শিখাইয়াছেন। উপাচার্য মহোদয় প্রতিবারই নয়া আশ্বাস দিয়া আমাদের আশাবাদী থাকিতে শিক্ষা দিতেছেন। অতএব, অনুরোধ আমাদের এই ‘ধারকর্জের’ শিক্ষাপ্রথাকে জাতীয় শিক্ষানীতি হিসেবে ঘোষণা করা হউক, যাহাতে ভবন ও শিক্ষকের পেছনে অপচয় না করিয়া প্রার্থীরা সরাসরি প্রকৃতির কোলে বিদ্যালাভ করিতে পারে।
ইতি
অনুগত, ভবঘুরে এক শিক্ষার্থী





