সম্পাদকীয়
নিরাপদ হোক ইলিশের উপকূল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উৎসবের মৌসুমে ওপার বাংলায় ইলিশ পাঠানো ছিল আমাদের ঐতিহ্য। উপহার যেত, পদ্মার রুপালি ইলিশ সুবাস ছড়াত কলকাতার রান্নাঘরে। অথচ আজ চাকা পুরো ঘুরে গেছে। দেশের বাজার সামলাতে এখন আমাদেরই ইলিশ আনতে হচ্ছে ভারত থেকে। পেট্রাপোল পেরিয়ে হাজার হাজার টন গুজরাটি ইলিশ ঢুকছে দেশে। রুপালি ইলিশের সেই চেনা জৌলুশ নদী-উপকূল থেকে উধাও। সাগরের এই রাজা নাকি পাড়ি জমাচ্ছে গভীর থেকে গভীরে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী আন্তর্জাতিক জলসীমায়। উপকূলের চেনা মোহনা ছেড়ে ইলিশের এই রুট বদল এবং অজানা গন্তব্যে চলে যাওয়ার ঘটনা পুরো মৎস্য খাতকেই এক আশঙ্কাজনক সংকটে ফেলে দিয়েছে।
ইলিশ কিন্তু সাধ করে তার চিরচেনা রুট ছাড়েনি। তাকে আমরাই উপকূল থেকে তাড়িয়ে দূরে পাঠিয়েছি। যে সুনির্দিষ্ট পথ ধরে ইলিশ সাগর থেকে নদীতে আসত ডিম ছাড়তে, সেই পথগুলো আমরাই বন্ধ করে দিয়েছি। নদ-নদীতে হাজার হাজার ডুবোচর। নদী জুড়ে চলছে অবাধে বালু উত্তোলন আর পলিথিনের দাপট। নদীর নাব্য কমে তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য এসে নিয়মিত মিশছে পানিতে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততা দুটিই আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে ইলিশের মূল খাদ্য প্লাংকটন। উপকূলের পরিবেশ এখন এমন এক বিষাক্ত জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে যে, ইলিশ সেখানে থাকলে তার বংশপ্রদীপ নিভে যাবে। লবণাক্ততা বাড়লে ডিম ফার্টিলাইজ হবে না, পলি দূষণে বাচ্চা ফুটবে না। তাই প্রাণের তাগিদে ইলিশ উপকূল ছেড়ে সাগরের ভেতরের আন্তর্জাতিক সীমানার দিকে শিফট করছে, যেখানে পরিবেশটা অন্তত বাঁচার মতো। গবেষকরা যাকে বলছেন ‘পপুলেশন ডিনামিকস’, সোজা কথায় তা হলো আমাদের কপাল পোড়ার লক্ষণ।
তিন অর্থবছর ধরে দেশে ইলিশের উৎপাদন টানা নিম্নমুখী। নদীগুলো প্রায় শূন্য, উপকূলের জেলেরা খালি হাতে জাল গুটিয়ে বসে আছেন। কাঙ্ক্ষিত মাছ মিলছে না। অথচ এই তীব্র অভাবের মধ্যেও মানুষের সৃষ্ট অপকর্ম থমকে যায়নি, বরং ধ্বংসের গতি দিন দিন আরও বাড়ছে। সাগরে চলছে অবলীলায় অবৈধ ট্রলিং আর বিষাক্ত নান্দু জালের মহোৎসব। উচ্চ ক্ষমতার ইঞ্জিনের অনিয়ন্ত্রিত ট্রলিং বোটগুলো সাগরে নেমে গুঁড়ি মাছ, ছোট পোনা আর জাটকা ঝেঁটিয়ে একবারে সাফ করে দিচ্ছে। সাময়িক পকেটে কিছু টাকা তোলার লোভে একদল অসাধু ব্যবসায়ী সামুদ্রিক মাছের মূল প্রজননক্ষেত্রকেই ড্রেজিং করে ধ্বংস করে ফেলছে। সাধারণ জেলেদের জাল ছিঁড়ে দিচ্ছে, কিন্তু এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড রোখার যেন কেউ নেই। আইন আছে, ২২ দিনের প্রজননকালীন নিষেধাজ্ঞা প্রতি বছর আসে। কিন্তু কঠোর তদারকি ও তদারকিতে সততা না থাকলে সেই নিষেধাজ্ঞা শুধু কাগজ-কলমেই থেকে যাবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না।
বিশ্বের মোট ইলিশের সিংহভাগ আহরণ করে যে দেশ একসময় রপ্তানি আয়ে বুক ফোলাত, সেই দেশ আজ আরব সাগরের কম স্বাদের মাছ কিনে পেট ভরাচ্ছে। প্রকৃতি চিরকাল তার পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় আদায় করে নেয়। আমরা যদি নিজেদের লোভের হাতগুলো দ্রুত না বাঁধি, নদীকে যদি তার স্বাভাবিক গতিতে বাঁচতে না দিই, তবে অচিরেই আমাদের ইলিশ একবারে নিঃশেষ হয়ে যাবে। তখন ইলিশের রুট ফেরানো তো দূরে থাক, এই রুপালি মাছটি চিরতরে হারিয়ে গিয়ে শুধু আমাদের ইতিহাসের পাতাতেই রয়ে যাবে।



