এক বার্তায় নিঃস্ব খামারি

সংগৃহীত ছবি
ভোর সাড়ে ৫টা। মাগুরার এক পোলট্রি খামারির ফোন স্ক্রিনে ভেসে ওঠে মাত্র আট শব্দের একটি খুদে বার্তা— ‘আজকের ব্রয়লার ১২২ টাকা, ডিম ৯ টাকা ৫০।’
কোনো দরকষাকষি নেই, নেই কোনো হিসাবনিকাশের সুযোগ। ৪৫ দিন ধরে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে, চড়া দামে ফিড ও ওষুধ কিনে যে খামারি রক্ত পানি করে মুরগি বড় করলেন— সেই পণ্যের গায়ে নিজের তৈরি খরচের ট্যাগ বসানোর ন্যূনতম অধিকারটুকুও তার নেই। কে পাঠাল এ বার্তা? কোন অদৃশ্য সমীকরণে রাতারাতি ভেঙে দেওয়া হলো শত শত খামারির মনোবল? খামারি তার কিছুই জানেন না। অথচ গুটিকয়েক মধ্যস্বত্বভোগী, পাইকারি আড়তদার আর করপোরেট সিন্ডিকেটের পাঠানো এই একটিমাত্র ‘মোবাইল মেসেজ’ই চূড়ান্ত করে দিচ্ছে প্রান্তিক পোলট্রি খামারির টিকে থাকা কিংবা নিঃস্ব হয়ে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার নির্মম নিয়তি।
শিল্পকারখানার মালিক বা যেকোনো স্বাধীন ব্যবসায়ী নিজ পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে মুনাফা যোগ করে বিক্রয়মূল্য ঠিক করেন। কিন্তু পোলট্রি খামারি সেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিয়ম থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। পোলট্রি ফিডের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্প্রতি বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ১০০ টাকা, অর্থাৎ কেজিপ্রতি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ২ টাকা। খামারের মোট খরচের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই চলে যায় এই খাদ্য কিনতে। বর্তমানে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে প্রান্তিক খামারির পকেট থেকে খসছে ১৫০-১৬০ টাকা। অথচ পাইকার বা আড়তদার খামারে এসে এক কথায় সাফ জানিয়ে দেন, ‘আজকের রেট ১২২ টাকা।’ মুরগি প্রতিদিন দানাদার খাদ্য খায়, আর নির্দিষ্ট বয়সের পর খামারে আটকে রাখলে প্রতিদিন লোকসানের পাল্লা ভারী হয়। খামারির এই অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পাইকারি সিন্ডিকেট তাকে দরকষাকষির কোনো সুযোগই দেয় না।
মাগুরা সদরের বেরইল পলিতার প্রান্তিক পোলট্রি খামারি গাজী মাসুমবিল্লাহর গল্পটা দেশের লাখ লাখ খামারির চরম বাস্তবতারই প্রতিফলন। এক দশক ধরে নিজ উদ্যোগে সাড়ে তিন হাজার ব্রয়লার মুরগি লালন-পালন করে আসা মাসুম এখন সম্পূর্ণ দেউলিয়া হওয়ার পথে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি জানালেন, এক কেজি ব্রয়লার তুলতে তার খরচ হয়েছে ১৫৮ টাকা। খাদ্য, ওষুধ, বিদ্যুৎ— সব নগদ টাকায় কিনে মুরগি বিক্রির দিন ভোরে পাইকারের ফোন পান তিনি। ফোনের ওপাশ থেকে জানানো হয়, মেসেজে আজকের রেট এসেছে ১২২ টাকা। কেজিপ্রতি ৩৬ টাকা লোকসানে বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় পাইকার সরাসরি জানিয়ে দেন, মুরগি খামারেই রেখে দিতে, কারণ পরদিন দাম আরও কমতে পারে। এক দিন অতিরিক্ত মুরগি রাখা মানে বাড়তি খাদ্যের খরচ। বাধ্য হয়ে পৌনে ২ লাখ টাকা লোকসান গুনেই সেদিন চালানের মুরগি তুলে দিতে হয়েছিল পাইকারের ট্রাকে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশের পোলট্রি ও ডিমের বাজারে প্রতিদিন ভোরে মোবাইল মেসেজ বা হোয়াটসঅ্যাপে এই একতরফা দর নির্ধারণের পেছনে কাজ করে কয়েকটি শক্তিশালী অদৃশ্য চক্র। রাজধানীর তেজগাঁও আড়তকেন্দ্রিক ‘তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি’র কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও আড়তদার গভীর রাতে বা ভোরে ডিমের একটি কৃত্রিম দর ঠিক করেন, যা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। একইভাবে ঢাকার কাপ্তানবাজার, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও বগুড়াভিত্তিক কিছু পাইকারি পোলট্রি ব্যবসায়ী সমিতি ব্রয়লার এবং সোনালি মুরগির দাম বেঁধে মেসেজ পাঠায়। পাশাপাশি কাজী ফার্মস, সিপি কিংবা প্যারাগনের মতো শীর্ষ করপোরেট কোম্পানিগুলো প্রতিদিন সকালে তাদের নিজস্ব ডিম ও মুরগির যে ‘বেজ প্রাইস’ ঘোষণা করে, আড়তদাররা সেটিকে ভিত্তি ধরেই সারা দেশের রেট তৈরি করে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্থানীয় ফড়িয়ারা কেন্দ্র থেকে পাওয়া এই এসএমএসকে ‘সরকারি অফিশিয়াল দর’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে খামারিদের কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করেন।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, এই একতরফা সিন্ডিকেট ও ধারাবাহিক লোকসানের কারণে গত এক দশকে দেশে সক্রিয় দেড় লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার কমে এখন মাত্র ৬০-৭০ হাজারে ঠেকেছে। শুধু গত ছয় মাসেই লোকসান সামলাতে না পেরে ১০ হাজারের বেশি প্রান্তিক খামার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।
উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের এই নির্মম জাঁতাকলে পড়ে একদিকে যেমন খামারিরা নিঃস্ব হচ্ছেন, অন্যদিকে পুরো পোলট্রি খাত ধীরে ধীরে অল্প কিছু করপোরেট কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক চাষ বা ‘কন্ট্রাক্ট ফার্মিং’য়ের দখলে চলে যাচ্ছে।
বাজার পুরোপুরি করপোরেট ও পাইকারি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যখন-তখন ডিম ও মুরগির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হবে। ফলে স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষের আমিষের প্রধান উৎসটি নাগালের বাইরে চলে যাবে। পোলট্রি খাদ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ এসএমএস সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নিলে এই খাতের বিপর্যয় ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন প্রান্তিক খামারিরা।



