সম্পাদকীয়
সমন্বয়হীনতায় ডুবছেন চাকরিপ্রার্থী তরুণরা

দেশে সার্বিক অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষিত তরুণ সমাজের আশানুরূপ কর্মসংস্থান কেন হবে না, সেই প্রশ্নটা এখন জাতির সামনে উপস্থিত। প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে প্রায় ২০ লাখ নতুন তরুণ-তরুণী চাকরির জন্য যুক্ত হলেও সে তুলনায় বাড়ছে না কর্মসংস্থান। এমন তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে রাজধানীতে এক সেমিনারে। সোমবার পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বিশ্বব্যাংকের যৌথ আয়োজনে ব্যবসায়িক পরিবেশ বিষয়ে সেমিনারে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সেমিনারে এমন পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হয়েছে ব্যবসার পরিবেশ না থাকা এবং টেকসই বাণিজ্যনীতির অভাবকে। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে সাধারণত তারুণ্যের স্বপ্ন থাকে শিক্ষাজীবন শেষে তিনি পরিবার-সমাজ, দেশ-জাতির সেবায় হবেন অংশীজন; হবেন জাতির সম্পদ। ক্ষেত্রবিশেষে দেবেন নেতৃত্ব। যদি আশানুরূপ কর্মসংস্থান না হয়, জাতির সম্পদ না হয়ে কাঁধে বোঝা হয়ে যায়, তবে তা হবে সবার জন্য বেদনাদায়ক।
দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যা তরুণ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থা এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মুখোমুখি— একদিকে লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ বেকারত্বের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন, অন্যদিকে দেশীয় করপোরেট ও শিল্প খাতগুলো দক্ষ কর্মীর অভাবে ভুগছে।
চাকরির বাজারের এই যে চাহিদা ও জোগানের অমিল, এর অন্যতম কারণ দক্ষতার অভাব। সহজ কথায়, দেশের শিল্প ও সেবা খাত একজন প্রার্থীর মধ্যে যে ধরনের যোগ্যতা বা দক্ষতা খুঁজছে, আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় উচ্চ ডিগ্রিধারীদের মধ্যে তা পাচ্ছে না। ফলে ডিগ্রি থাকার পরও তরুণরা চাকরি পাচ্ছেন না, আবার প্রতিষ্ঠানগুলোও শূন্যপদ পূরণের জন্য যোগ্য কর্মী পাচ্ছে না। চাকরির বাজারের এ বিশাল শূন্যতা রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা। প্রধানত মান্ধাতা আমলের শিক্ষাক্রম।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোর কারিকুলাম সময়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। বিশ্ববাজার বা দেশীয় শিল্প খাত এখন ফোরথ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন বা চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে, অথচ আমাদের পাঠ্যবইয়ে এখনো কয়েক দশক পুরনো তত্ত্ব পড়ানো হয়। ব্যবহারিক শিক্ষার চেয়ে মুখস্থবিদ্যার প্রতি যেন সবার আগ্রহ বেশি।
উন্নত বিশ্বে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কী পড়াবে, তা ঠিক হয় বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প খাতের মধ্যে কোনো কার্যকর যোগাযোগ দেখা যায় না। শিল্পমালিক বা উদ্যোক্তারা কী চান, তা শিক্ষাবিদরা জানেন না; আবার শিক্ষাবিদরা যা তৈরি করছেন, তা শিল্পের কাজে লাগছে না। এ বিপরীতমুখী চিন্তা ও সমন্বয়হীনতার চোরাবালিতে পড়ছে আমাদের তরুণ শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ।
বৃহৎ তরুণ সমাজের কোনো অংশকে বাইরে রেখে উন্নয়নের সোপানে পা রাখলে সেখানে সাফল্য আশা করা যায় না। পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের উন্নয়ন মডেলে কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে নেই। যা আছে, সেগুলো আবার স্বল্পমূল্যের। বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি খাতকে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার জন্য অন্য খাত বিকশিত হতে পারেনি। এখানেই রয়েছে বড় একটা ফাঁক। এখন সময় এসেছে ফাঁক পূরণের। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে রাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোয় আমূল সংস্কার দরকার। অন্যথায় প্রবৃদ্ধি হয়তো বাড়বে, চাহিদা অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না। সরকারিভাবে নীতি কাঠামোয় সংস্কার করা জরুরি প্রয়োজন।




