সম্পাদকীয়
উদ্বেগ-অস্বস্তির গল্প আর নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একজন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরবেন, ব্যবসায়ী নির্বিঘ্নে ব্যবসা করবেন, নারী-শিশুরা নিরাপদে চলাফেরা করবে, অপরাধের শিকার হলে থানায় গিয়ে ন্যায়বিচারের আশ্বাস পাবে— এটিই একটি সভ্য রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক চিত্র সে প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, পুলিশের ওপর হামলা এবং মব সন্ত্রাসের বিস্তার জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের হাতে, সেই পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে? তারাইবা কতটুকু নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারছে? তারা কর্মস্থল ও দায়িত্ব পালনকালে কতটুকু নিরাপদ?
গতকাল শুক্রবার আগামীর সময়ে ‘৯ মাসে ৬ অপরাধে ২২ হাজার ৩৩৯ মামলা অপরাধের সাতকাহনে অস্বস্তি-উদ্বেগ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনটি শুধু অপরাধের পরিসংখ্যান নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২২ হাজার ৩৩৯টি। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধ মিলিয়ে সারা দেশে মোট ৭৯ হাজার ৫৭০টি মামলা করা হয়েছে। এর বাইরে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে ৫৩৭টি। এসব ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২৫৬, আহত হয়েছেন ৫৭৫ জন।
এ পরিসংখ্যানকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রতিফলন বলা যায় না। বিশেষ করে ছয়টি অপরাধের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, নারী নির্যাতন, মব সন্ত্রাস ও পুলিশের ওপর হামলায় রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে বিপন্ন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারের ওপর জনআস্থার পারদ ওই সময়ে ওঠানামা করেছে।
মাসভিত্তিক হিসাবে সেপ্টেম্বরেই ২৯৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি হত্যা মামলার তথ্য, অভিযোগ বা মামলা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কসংকেত।
প্রথম ৯ মাসে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় ৪৪২টি মামলা করা হয়েছে। এটি আইন প্রয়োগের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকেও চ্যালেঞ্জ করে।
পুলিশের ওপর হামলার বিচার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি তাদের কোনো সদস্যের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি কিংবা নাগরিক হয়রানির অভিযোগ থাকলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিচার করতে হবে।
রাজনৈতিক বিরোধ গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ যখন সংঘর্ষ, হামলা, প্রাণহানি, দখলবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন তা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের নানা সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব সমস্যার কথা বলা হয়। কিন্তু এসব সমস্যা অনন্তকাল ধরে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অজুহাত হতে পারে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মব সন্ত্রাস, মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্রধারী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন; কিন্তু নির্দেশনা আর বাস্তব সাফল্য এক বিষয় নয়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে না পারলে এর প্রভাব খোদ সরকারের ওপর পড়বে। যত ইতিবাচক কর্মকাণ্ডই নেওয়া হোক না কেন, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।
অপরাধের সাতকাহন যেন আর নাগরিকের অস্বস্তি ও উদ্বেগের প্রতিদিনের গল্প না হয়ে ওঠে। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন— এই নীতির বাস্তব প্রয়োগই হোক আগামী দিনের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।



