সম্পাদকীয়
অনাকাঙ্ক্ষিত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও সাংবিধানিক কাঠামো সম্পর্কে আন্তর্জাতিক কোনো সংস্থার কর্মকর্তার প্রকাশ্য মন্তব্য কতটা শোভন এবং ভারসাম্যপূর্ণ— সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নজরদারি প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি ওই বক্তব্যে। বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র নয়, কোনো ব্যর্থ রাষ্ট্রও নয়। বরং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অবদানকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। এমন একটি দেশের ক্ষেত্রে এ জাতীয় বক্তব্য অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ হিসেবে প্রতীয়মান হতে পারে।
সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নিজস্ব আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার দায়িত্ব একান্তই দেশের সরকারের। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে যদি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন ঘটে, তবে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে সেই বিষয়ে কথা বলা, প্রতিবেদন প্রকাশ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য চাপ দেওয়া কিংবা সুপারিশ করার নৈতিক ও আইনি এখতিয়ার জাতিসংঘের রয়েছে। সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা বা না করা চূড়ান্তভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বের বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, মানবাধিকার পরিস্থিতির বিচারে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি সংকটাপন্ন দেশ রয়েছে। মিয়ানমারে দীর্ঘদিন ধরে গৃহযুদ্ধ, বিমান হামলা, নির্বিচার হত্যা ও বাস্তুচ্যুতি চলছে। সুদানে ভয়াবহ সংঘাত লাখো মানুষকে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আফগানিস্তান, পাকিস্তানের বাস্তবতা; ইরানে রাজনৈতিক প্রতিবাদ দমনে মৃত্যুদণ্ড ও কঠোর দমননীতির অভিযোগ রয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সংকট, ইয়েমেন, সিরিয়া, কঙ্গোসহ বিভিন্ন সংঘাতপ্রবণ অঞ্চল এবং বিশ্বের বহু দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে যাচ্ছে।
অথচ বাংলাদেশকে নিয়ে এমনভাবে বক্তব্য দেওয়া হলো যেন এখানকার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যর্থ। এটা দায়িত্বশীল জায়গা থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় মানবাধিকার কমিশন রয়েছে, যা একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজন থাকতে পারে, কিন্তু সেই আলোচনা হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার ভিত্তিতে, কোনো দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে নয়।
ফলকার টুর্কের বক্তব্যে তুলনামূলক ভারসাম্যের অভাব রয়েছে। তিনি বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর মানবাধিকার লঙ্ঘন, যুদ্ধ, দখলদারিত্ব, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু কিংবা শরণার্থী সংকটের প্রশ্নে যেমন উচ্চকণ্ঠ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তেমন মন্তব্য করেছেন। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও আছে। দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক উন্নয়ন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং গণপ্রশাসনিক সংস্কারের নানা উদাহরণ রয়েছে। শুধু ত্রুটি তুলে ধরে একটি দেশের সামগ্রিক চিত্র বিচার করা ন্যায়সংগত নয়।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কোনো অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু সেই দায় বাংলাদেশের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা ও জনগণের কাছেই সবার আগে ন্যস্ত। গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি হলো জনগণের কাছে জবাবদিহি; আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে নয়। সরকারের উচিত এ অনভিপ্রেত বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করা।
সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা ও মানবাধিকার— এ তিনটি একে অপরের প্রতিপক্ষ নয়। স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেই মানবাধিকার সুরক্ষার পথ খুঁজে নিতে হয়। ফলকার টুর্কের বক্তব্য সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে পেরেছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।





