সম্পাদকীয়
চামড়াশিল্পের গলা টিপে ধরবেন না

বাংলাদেশের চলমান অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা এর একশিল্প নির্ভরতা। শুধু পোশাকশিল্পই আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যদি কোনো কারণে এ খাতে বিপর্যয় দেখা দেয়, তাহলে সমূহ সর্বনাশের আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই আমাদের অর্থনীতিবিদরা পরামর্শ দিচ্ছেন বিকল্প শিল্প খাত সমৃদ্ধ করার। এরকম একটি বিকল্প খাত চামড়ািশল্প।
চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প পণ্যের বিকাশে প্রায় প্রতিটি সরকারেরই থাকে বিশেষ দৃষ্টি ও প্রণোদনা। পরিতাপের বিষয় হলো— সরকারের এ সদিচ্ছা বাস্তবায়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু কাণ্ডজ্ঞানহীন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অসহযোগিতা। তাদের অনিচ্ছায় চামড়া খাতে ঋণপ্রবাহ মন্থর হয়ে গেছে। এর ফলে চামড়া খাত দেশের অর্থনীতিতে আরও অবদান রাখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। চামড়াশিল্পে সম্ভাবনা থাকলেও কেন তারা ঋণ দিতে অনাগ্রহী, সে এক বড় প্রশ্ন।
পবিত্র ঈদুল আজহা প্রায় সমাগত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঈদুল আজহা এখন শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবই নয়, বরং একটি বৃহৎ অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক যজ্ঞও। কোরবানির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পৃক্ত খাতগুলোর একটি হচ্ছে চামড়াশিল্প। বছরের মোট কাঁচা চামড়ার বড় অংশ আসে ঈদুল আজহার সময়। প্রতি বছর কোরবানি ঘিরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হয় বলে ধারণা করা হয়। এ বিশাল অর্থপ্রবাহ বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত। সব মিলিয়ে এটি দেশের অন্যতম প্রধান অার্থিক মৌসুম।
কিন্তু শিল্প খাতে খেলাপি ঋণের দোহাই দিয়ে নতুন ঋণ দিতে অনীহা দেখিয়ে আসছে ব্যাংকগুলো। গত বছরের লক্ষ্য ৬৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকার মধ্যে বিতরণ করেছিল ৬৫ কোটি টাকা বা ১ শতাংশ। তারা ঢালাওভাবে খেলাপির অভিযোগ তুলে ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। কিন্তু এ খাতে খেলাপি ঋণ এখন পর্যন্ত দেড় হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি এবং খেলাপির হার সামগ্রিক হারের তুলনায় অনেক নিচে। বাংলাদেশ ব্যাংক হুকুম দিয়েই বসে থাকে। ঋণ না দিলে নীরব থাকে। অথচ অনেক রুগ্ণ শিল্পের নামে ব্যাংকগুলো দেদার সহায়তা দিচ্ছে।
কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং বিশ্ববাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে এ খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। যখন একটি খাতের বিশ্বজয়ের কথা, তখন মূলধনের অভাবে সেটি খুঁড়িয়ে চললে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য তা হবে আত্মঘাতী। চামড়া খাতের উদ্যোক্তারা যখন বিশ্ববাজারের নতুন নতুন অর্ডার ধরার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছেন, ঠিক তখনই তারা পড়েছেন তীব্র তারল্য সংকটে। ব্যাংকগুলোর ঋণ দিতে এই অনীহা কোনো সাধারণ সংকট নয়, বরং একটি উদীয়মান খাতকে গলা টিপে ধরার শামিল।
তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যাংকগুলো সেখানে যেভাবে দুহাত উজাড় করে ঋণ ও প্রণোদনা দেয়, চামড়া খাতের বেলায় তার এক শতাংশও দেখা যায় না। অথচ চামড়া সম্পূর্ণ দেশজ কাঁচামালনির্ভর একটি খাত। ব্যাংকগুলোর এ খামখেয়ালি এবং বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে অনেক পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত ট্যানারি মালিকও এখন ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
চামড়া খাতের এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংকগুলোকে তাদের চিরাচরিত ‘ঝুঁকি এড়ানোর’ মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। পোশাকশিল্পের পাশাপাশি চামড়া খাতও যদি দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে। ব্যাংক মালিকদের বুঝতে হবে, ঋণ বন্ধ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়; বরং সঠিক তদারকির মাধ্যমে উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন করাই প্রকৃত ব্যাংকিং।






