অতি-উদার গণতন্ত্র হতে পারে স্বৈরাচারের সূতিকাগার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গণতন্ত্রের জন্মভূমি বলে পরিচিত এথেন্সেই খ্রিস্টপূর্ব ৪০৪ সালে ‘ত্রিশ স্বৈরাচারের’ (Thirty Tyrants) আবির্ভাব হয়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এই ৩০ জন স্বৈরতান্ত্রিক নেতা লালিত হয়েছিলেন তৎকালীন এথেন্সীয় গণতন্ত্রেরই গর্ভে। পেরিক্লিস (৪৯৫-৪২৯ খ্রিস্টপূর্ব) এথেন্সের গণতন্ত্রকে তার অসাধারণ নেতৃত্বের যোগ্যতা দ্বারা চমৎকারভাবে বিকশিত করেছিলেন। কিন্তু তার জীবদ্দশাতেই গ্রিসে যে গণতন্ত্র চর্চা হতো, তার মধ্যে এমন কতগুলো বৈশিষ্ট্য ছিল, যা খোদ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেই স্বৈরাচারের সূচনা করতে সহায়তা করে। পেরিক্লিসের মৃত্যুর ২৫ বছরের মধ্যেই এথেন্সের নাগরিকরা সেই স্বৈরাচারী শাসনের শিকার হন। যেসব কারণে একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকেও এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হতে হয়, তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি কারণ হলো: অতি জনতুষ্টিমূলক রাজনীতির চর্চা, চাটুকারদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ভুল মানুষ পছন্দ করা, অতি-উদারতা ও শিথিলতার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি হালকা করে ফেলা, আইনের শাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া ইত্যাদি।
যেকোনো যুগেই অতি-জনতুষ্টিমূলক রাজনীতির চর্চা গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হতে পারে। গণতান্ত্রিক নেতৃত্বকে জনগণের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হয়, জনগণই সরকারের শক্তি। কিন্তু সমস্যাটি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক রেটরিকের অসতর্ক ব্যবহারের জন্য কোনো নেতা জনসাধারণকে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি, এমন কিছু ব্যাপারে স্বীকৃতি দিয়ে বসেন, যার সব তিনি বা তার সরকার পূরণ করতে পারবে না; অথবা এমন কিছু আছে, যা পূরণ করা বা স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন কোনো দায়িত্বশীল নেতা যদি প্রতিশ্রুতি দেন আমরা আর কখনোই জ্বালানি তেলের দাম বাড়াব না, তাহলে বিবৃতির মুহূর্তে জনগণ প্রচণ্ড পরিমাণে তুষ্টি বোধ করবে; কিন্তু বিশেষজ্ঞ মহল জানে জ্বালানি তেলের মূল্য শুধু দেশীয় বাস্তবতার ওপর নয়, মূলত বিশ্ব-বাস্তবতার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। তাই এক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারার ঝুঁকি ব্যাপক। এরকম আরও অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার করা যেকোনো দায়িত্বশীল সরকারি দলের নেতার পক্ষে বিপজ্জনক। শুধু জনতুষ্টি অর্জনের জন্য এ ঝুঁকি কোনো গণতান্ত্রিক সরকারি দলের নেতার নেওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এর সঙ্গে স্বৈরাচারের জন্ম হওয়ার সম্পর্ক কী? সম্পর্ক এখানে যে, এতে করে তাদের যখন ওই চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে না, তখন এই জনগণ এমনভাবে ক্ষিপ্ত হতে পারে যে, তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারকে স্বৈরাচারী আচরণ করতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার বিষয়টি যদি কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অতিকথনের ফলে তৈরি হয়, তাহলে এটিকে ওই গণতন্ত্র চর্চার ত্রুটি হিসেবেই দেখা যেতে পারে।
জনতুষ্টির বিপরীতে ক্ষমতাতুষ্টি বলতেও আরেকটি বিষয় আছে। এটি জনতুষ্টির বিপরীত বর্গীয় বিষয়। এক্ষেত্রে জনগণের মধ্য থেকে কোনো ব্যক্তি বা শ্রেণি সরকারকে তুষ্ট করার চেষ্টা করে। সরকার যদি তাদের প্রশংসা অথবা অযৌক্তিক গুণকীর্তন শুনেই খুশি হয়ে যায় এবং ওইসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে বিভিন্ন রকম সুযোগ-সুবিধা দিতে থাকে, সেক্ষেত্রে সরকারব্যবস্থায় চাটুকার ও অসৎ লোকের ব্যাপক পরিমাণে প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়ে যায়, যেটা শুধু গণতন্ত্র নয়, যেকোনো কল্যাণকামী রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর।
যখন রাজনৈতিক রেটরিকের অসতর্ক ব্যবহারের জন্য কোনো নেতা জনসাধারণকে এমন কিছু প্রতিশ্রুতি এমন কিছু ব্যাপারে স্বীকৃতি দিয়ে বসেন, যার সব তিনি বা তার সরকার পূরণ করতে পারবে না
গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক বিরোধিতার সুযোগ এবং ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করার অধিকার দেওয়া হয়। এগুলো গণতন্ত্রের খুবই কাঙ্ক্ষিত অধিকার। কিন্তু এ অধিকারের অপব্যবহার যথেচ্ছাচারের সুযোগ যাতে তৈরি না করে সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হয়। কেউ যদি প্রতিবাদের নামে মব করা, কিংবা তার বাকস্বাধীনতার নামে যা মুখে আসে তাই বলে বেড়ায়, সিনিয়র সিটিজেন, সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মানুষ, এমনকি সরকারে থাকা ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে অসত্য, অশালীন, এমনকি ভীষণ কুরুচিপূর্ণ কথা বলার ধৃষ্টতা পেতে থাকে, তাহলে এই তথাকথিত অতি-উদার ব্যবস্থা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ও সামাজিক সংহতি রক্ষার পথে ভীষণভাবে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই জনসমাজের কাঙ্ক্ষিত সহনশীলতা এবং শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করা পর্যন্ত স্বাধীনতাকে সীমিত করা প্রয়োজন। এটা না করতে পারলে প্রত্যেক কুরুচিপূর্ণ ব্যক্তি অথবা দুরভিসন্ধিমূলক ব্যক্তিদের প্রত্যেকেই এক-একজন স্বৈরাচার হিসেবে আবির্ভূত হতে থাকবে। পরিণতিতে একসময় রাষ্ট্রের একটি বৃহত্তর অংশের নাগরিক নিজেরাই স্বৈরাচারী হয়ে উঠবে। কেননা, এতদিনে এদের মধ্যে এমন কিছু সাহস সঞ্চারিত হয়, যা রাষ্ট্রের শৃঙ্খলাকে অযাচিতভাবে চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে। সরকার যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে সত্যিকারের কল্যাণ কাজ করতে চায়, তাহলে যেকোনো দুষ্কৃতকারীদের দমন করা তার পবিত্র দায়িত্ব।
পরিশেষে আবার প্রাচীন এথেন্সের কথায় ফিরে যাওয়া যাক। যদিও ৩০ স্বৈরাচারের আগমনের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে পেলোপনেশীয় যুদ্ধে স্পার্টার কাছে এথেন্সের পরাজয় এবং এলিট শ্রেণির ব্যবসায়ীদের ষড়যন্ত্রকে চিহ্নিত করা হয়। তথাপি, একটু দূরবর্তী কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, এথেন্সের অতি-উদার গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিই ভেতর থেকে রাষ্ট্রটিকে দুর্বল করে ফেলেছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রকৃত জ্ঞানীদের বা বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব না দিয়ে নিছক জনতুষ্টিবাদিতা এবং অবারিত ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্রমান্বয়ে এক দায়িত্বহীন স্বৈরাচারী মানসিকতারই জন্ম দিয়েছিল, সৃষ্টি হয়েছিল এক ধরনের বিশৃঙ্খলা। আর এসবের ফল হিসেবেই রাষ্ট্র হয়েছে দুর্বল, এথেন্সের তৎকালীন স্বৈরাচারী শক্তি এ সুযোগই কাজে লাগিয়েছে। ইতিহাসের এ শিক্ষা প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সর্বকালেই কমবেশি আমলে নেওয়ার মতো।
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়






