ব্যক্তি নয় প্রতিষ্ঠান নয় প্রভু একটি ব্যবস্থা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রভুর ইচ্ছা নানাভাবে কাজ করে। কখনো সরাসরি, কখনো গোপনে। প্রভু কোনো ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান নয়, প্রভু একটি ব্যবস্থার নাম। যার মধ্য দিয়ে আধিপত্যের সংস্কৃতিই গড়ে ওঠে। প্রভুভক্তরা তো বটেই; যারা বিদ্রোহ করে, তাদের অনেকের পক্ষেও এই বৃত্তটা ভেঙে বের হওয়া সম্ভব হয় না। যদি না খুব বড় কিছু ঘটে, কিংবা ঘটানো সম্ভব হয়। আর পরিবর্তনের পরও প্রায়ই টের পাওয়া যায় যে, প্রভু বদল হয়েছে বটে, প্রভুত্বের বদল হয়নি। কিন্তু তবু মানুষ প্রভুত্বের সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করে না, এ সংস্কৃতি বদলাতে চায় এবং বদলানোর আশা রাখে।
প্রভুব্যবস্থা বিশ্ব জুড়ে ব্যাপ্ত। আর এই ব্যবস্থার নাম পুঁজিবাদ। এটি যেমন একটি অর্থনৈতিক বিধিব্যবস্থা, তেমনি একটি আদর্শও। এই অর্থনৈতিক ও আদর্শিক আয়োজন দাসত্বের সৃষ্টি করে; শুধু দরিদ্রদের জন্য নয়, ধনীদের জন্যও। ধনী-দরিদ্র সবাই বন্দি হয় মুনাফার লোভ, ভোগবাদী লালসা এবং আত্মকেন্দ্রিকতার ও বিচ্ছিন্নতার কাছে।
পুঁজিবাদ স্বভাবতই সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যুক্ত। সাম্রাজ্যবাদ একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা, যা পুঁজিবাদকে একাধারে রক্ষা করে ও বিস্তার ঘটায়। বিশ্ব এখন পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অধীন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে তৈরি দেশগুলোয়ও এখন পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য চলছে। গণচীনও রওনা দিয়েছে বাজারদাসত্বের অভিমুখে।
এই যে বিশ্বব্যবস্থা, এর আসল নিয়ন্ত্রক বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। এর অধীনে বড় রাষ্ট্রও স্বাধীন নয়। আর আমাদের মতো দুর্বল রাষ্ট্রের পক্ষে স্বাধীন অবস্থান নেওয়া তো একেবারেই অসম্ভব। আমাদের দেশে রাষ্ট্রের শাসকরা দলাদলি, কলহ, সংঘর্ষ সবই করে, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদারিতে সবাই ঐক্যবদ্ধ। তাদের ক্ষমতায় থাকা না-থাকার ব্যাপারের অনেকটাই নির্ভর করে সাম্রাজ্যবাদের তুষ্টির ওপর। ওদিকে আদর্শগতভাবে এই শাসকদের সবাই পুঁজিবাদী। মুনাফালোভী ও ভোগবাদিতা তাদের চালিকাশক্তি।
প্রভুত্বের অধীনস্থতা আমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যেমন তৎপর, তেমনি মনোজগতেও। এমনকি যারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, তারাও দুর্বল হয়ে পড়েন স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতার মোহে। বিভ্রান্ত হন বিকৃত তথ্য ও তত্ত্বের পীড়নে এবং নিজেদের সামন্তবাদী পিছুটানে
প্রভুত্বের অধীনস্থতা আমাদের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যেমন তৎপর, তেমনি মনোজগতেও। এমনকি যারা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, তারাও দুর্বল হয়ে পড়েন স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতার মোহে। বিভ্রান্ত হন বিকৃত তথ্য ও তত্ত্বের পীড়নে এবং নিজেদের সামন্তবাদী পিছুটানে। কঠিন হয়ে পড়ে শিরদাঁড়া সোজা রাখা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। মুক্তির সংগ্রাম চলে, কিন্তু মুক্তি আসে না; রাষ্ট্র বদলায়, ক্ষমতা বদলায়, কিন্তু সমাজ বদলায় না।
ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকরা শাসন-শোষণ, প্রশাসন, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অনুগত শ্রেণি তৈরি করে ভারতবর্ষকে কৃত্রিমভাবে এক করতে চেয়েছিল। উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করতে গিয়ে ভারতবর্ষীয়দেরও ওই ঐক্য মেনে নিতে হয়েছে, কেননা ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তৃত ছিল ভারতবর্ষ জুড়েই। দখলদারদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ব্যাপারে ভারতবর্ষীয়দের জন্য প্রয়োজন ছিল জাতীয়তাবাদের; কিন্তু ওই জাতীয়তাবাদই আবার বিপদ ডেকে আনল তাদের জন্য। জাতীয়তাবাদের প্রধান উপাদান ধর্ম নয়, ভাষা। আর ভারতবর্ষ নানা ভাষার দেশ, ব্রিটিশ শাসকরা ইংরেজি ভাষা চাপিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই চাপিয়ে দেওয়াটা ছিল জাতীয়তাবাদী চেতনার ওপর নিপীড়ন, অন্যপক্ষে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের পক্ষে সম্ভব ছিল না কোনো একটি ভাষার সাহায্যে ভারতবর্ষের সব মানুষকে এক করা। তা ছাড়া জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে অগ্রসর অংশ যেহেতু ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তাই তারা নিজেদের ধর্মের সাহায্যে ভারতবর্ষকে এক করার আপাত সহজ ও কার্যকর পথ ধরেই এগোলেন। ফলটা হলো বিপজ্জনক— সাম্প্রদায়িকতা সুযোগ পেল ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে বিভাজন সৃষ্টির। ঐক্যের জায়গায় দেখা দিল দাঙ্গা-হাঙ্গামা, যার পরিণামে অনিবার্য হয়ে পড়ল ভারত-বিভাগ। ফলে ১৯৪৭-এ উদ্ভব ভারত ও পাকিস্তানের। ১৯৭১ সালে জন্ম নিল আরেকটি নতুন রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। এই তিন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনজন রাষ্ট্রনায়ক খুব বড় ভূমিকা পালন করেন; তারা হলেন গান্ধী, জিন্নাহ ও শেখ মুজিব। তাদের পটভূমি, অবস্থান ও সময়ের ভেতর পার্থক্য ছিল, কিন্তু তিনজনের ভেতর ঐক্য ছিল এক জায়গায়— তারা সবাই পুঁজিবাদে আস্থাবান ছিলেন। তাদের ওই আস্থা রাষ্ট্র তিনটির চরিত্রের ভেতরও প্রতিফলিত হয়েছে বৈকি। তবে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার ক্ষেত্রে অনড় ছিলেন দুজন ব্যক্তিত্ব। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও লীলা নাগ। এ দুজনের কেউই কিন্তু পুঁজিবাদী ছিলেন না, তারা সমাজতন্ত্রের পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু পুরোপুরি সমাজতন্ত্রী হওয়া তাদের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। দুর্লঙ্ঘ্য একটি পরিখা ছিল সামনে দাঁড়িয়ে, যেটি শ্রেণি ও সংস্কৃতির।
রাষ্ট্রের উত্থান ঘটেছে, পতনও ঘটেছে; মুক্তির জন্য মানুষ সংগ্রাম করেছে, কিন্তু মুক্তি আসেনি। বরং উল্টো বিড়ম্বনা জুটেছে মানুষের ভাগ্যে। মুক্তি না আসার প্রধান কারণ সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদ বিরোধিতাকে ধারাবাহিক ও ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কাজটি করার কথা ছিল বামপন্থীদেরই। তারা যে চেষ্টা করেননি, তা নয়। কিন্তু সফলতা আসেনি। ব্যর্থতার একটি কারণ হলো এই যে, নিজের পায়ে ভর দিয়ে এবং মেরুদণ্ড শক্ত করে তারা দাঁড়াতে পারেননি। আরেকটি কারণ হলো— তাদের পক্ষে সাধারণ মানুষের কাছে সেভাবে যাওয়া সম্ভব হয়নি, যেভাবে জাতীয়তাবাদীরা গেছেন। মূল প্রশ্নটি কিন্তু প্রভু নয়, প্রভুর প্রতি আনুগত্যও নয়, সেটি হলো আনুগত্য ছিন্ন করার চেষ্টা। আধিপত্যবাদী ও কর্তৃত্বকামী প্রভুর নানা ইচ্ছা ওই চেষ্টাকে জরুরি করে তুলেছে। কেননা, এর সঙ্গে আমাদের সমষ্টিগত ভবিষ্যৎ অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত।
সাম্প্রতিককালে ভয়ের সংস্কৃতি ছিন্নে দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আসলে কী ঘটেছে, সেটির বিবেচনা খুবই জরুরি। কেউ বলছেন আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলাম। কারও কারও ধারণা আরও অগ্রসর, তারা বলছেন দেশে একটা বিপ্লবই ঘটে গেছে। বাস্তবে কিন্তু দুটির কোনোটিই ঘটেনি। যেটি ঘটেছে, তা হলো নৃশংস একটি সরকারের পতন। এ দেশে মানুষ অনেক ধরনের সরকার দেখেছে; ব্রিটিশ সরকার আলাদা— সেটি ছিল বিদেশি, পাকিস্তানি শাসকরাও বিদেশিই ছিল; কিন্তু পতিত সরকারটির মতো স্বদেশি সরকার আগে কেউ কখনো দেখেনি। আমাদের দুর্ভাগ্য, কোনো সরকারই জনগণের পক্ষে ছিল না, সব সরকারই ছিল জনবিরোধী। শাসকরা নানাভাবে শোষণ করেছে, যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। কিন্তু যে সরকারকে জনগণ এবার বিতাড়িত করল, সেই সরকারের মতো নিষ্ঠুর ও বধির সরকার আর দেখা যায়নি। এ সরকার কোনো আইনকানুন মানেনি, নিষ্পেষণের জন্য নতুন নতুন আইন ও বিধি জারি করেছে, গুম করেছে, হামলা ও মামলা দিয়ে হয়রানির একশেষ ঘটিয়েছে এবং কতটা যে নির্মম হতে পারে, এর প্রমাণ দিয়েছে পতনের আগের কয়েকটি দিনে। ধারণা করা হয়, নিহতের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। আর আহত মানুষের সংখ্যা তো বেশুমার। নিহত ও আহতদেরও অধিকাংশই তরুণ। ইহুদিবাদী ইসরায়েলিরা গাজাকে শৈশবশূন্য করেছে, হাসিনা সরকারও মনে করেছিল বাংলাদেশ থেকে তারুণ্য মুছে ফেলবে। কিন্তু সেটি হয়নি। যদিও মানুষ মারার কোনো কায়দাই বাদ রাখা হয়নি। তবু পরিণতি দাঁড়াল চূড়ান্ত রকমের ফ্যাসিবাদী ওই সরকারের পতন।
সরকার পরিবর্তনটা শান্তিপূর্ণভাবেই ঘটতে পারত, যদি স্বাভাবিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হতো। কিন্তু সরকার তাতে সম্মত ছিল না। নির্বাচনের নামে একের পর এক প্রহসন ঘটিয়ে টিকে থাকার আয়োজন করেছে। ফলে পতন শেষ পর্যন্ত ঘটলই, তবে সহিংস উপায়ে। তাতে বহু মানুষ হতাহত হলেন, সম্পদ ও স্থাপনা নষ্ট হলো। পুলিশ আগেই জনবিচ্ছিন্ন ছিল, গণঅভ্যুত্থানের সময় তাদের যে ভূমিকায় নামানো হলো, তাতে তাদের ভাবমূর্তি দাঁড়াল জনশত্রুর। থানা আক্রান্ত হয়েছে, পুলিশ সদস্যরাও হতাহত হয়েছেন, পুলিশ বাহিনীর পক্ষে জনসমক্ষে হাজির হওয়া রীতিমতো বিপজ্জনক হয়ে পড়েছিল। স্বীকার করতে হবে— সবটাই ঘটেছে ওই প্রভুর ইচ্ছায়। আর ওই প্রভুত্ব তৈরি হয়েছিল সমাজে ছড়িয়ে থাকা প্রভুব্যবস্থার মধ্যে।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়




