আধুনিক ও টেকসই ঢাকার রূপরেখা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রাচীন বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে শতাব্দী জুড়ে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক ঢাকা আজ নিজের চিরচেনা পরিচয় ও বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। ঢাকা শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল বা বাংলাদেশের রাজধানী নয়, এটি দেশের সার্বভৌম রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, মূল প্রশাসনিক কাঠামো, অর্থনৈতিক স্পন্দন এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রীয় স্নায়ুবিন্দু। জাতীয় অর্থনীতির সিংহভাগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই মেগা সিটির কর্মতৎপরতার ওপর নির্ভরশীল। তবে সুদূরপ্রসারী ধারণার অভাব, নিয়ন্ত্রণহীন জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত বাণিজ্যিক ও শিল্প অবকাঠামো, অতিরিক্ত সড়ককেন্দ্রিক পরিবহননীতি, কৃত্রিম জলাদ্ধতা, খাল-বিল দখল এবং দুর্বল সরবরাহ শৃঙ্খলের কারণে আজ গোটা নগরজীবন বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখোমুখি। ঢাকার এই বহুমাত্রিক সংকটকে শুধু কয়েকটি মোড়ে যানজটের চিত্র হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার সংকট। মানুষের আবাসন কোথায় হবে, কর্মসংস্থানের বিকেন্দ্রীকরণ কীভাবে নিশ্চিত করা যাবে, মানুষ ও পণ্য কীভাবে নির্বিঘ্নে চলাচল করবে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ঐতিহ্য রক্ষা পাবে কীভাবে— এ সার্বিক প্রশ্নগুলোর সমাধানের ওপরই নির্ভর করছে ভবিষ্যতের বাসযোগ্য ঢাকার মূল ভিত্তি।
ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং ভৌগোলিক প্রসারণের গতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানী ঘিরে মূল প্রশাসনিক সীমানা এখন সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের মতো পাশের অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে। এই বিশাল অঞ্চলের জন্য বিচ্ছিন্ন বা এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা এখন আর কোনো ফলপ্রসূ সমাধান আনতে পারবে না। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে গোটা মহানগরকে একটি বৃহৎ সমন্বিত আঞ্চলিক ফ্রেমওয়ার্কের আওতায় পরিকল্পনা করতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ভূমি ব্যবহারের নীতিমালাগুলোর সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর প্রয়োগ জরুরি। শিল্প, আবাসিক, বাণিজ্য, বিনোদন এবং সংরক্ষিত সবুজ এলাকার স্পষ্ট সীমানা নির্ধারণ করে তা দীর্ঘমেয়াদে অপরিবর্তিত রাখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
যানজট কমানোর নামে বছরের পর বছর শুধু নতুন রাস্তা, উড়ালসড়ক, ওভারপাস বা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ কোনো স্থায়ী স্বস্তি এনে দিতে পারেনি; কারণ প্রতিটি নতুন নির্মিত পথ দ্রুত নতুন যানবাহনের চাপে স্থবির হয়ে পড়ে। তাই সমাধান নিহিত রয়েছে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের ওপর যৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ এনে সর্বজনীন গণপরিবহনকেন্দ্রিক অবকাঠামো গড়ে তোলার মধ্যে। মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট, কমিউটার ট্রেন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথকে একটি আধুনিক ও গতিশীল ব্যবস্থার অধীনে সংহত করা প্রয়োজন, যেখানে এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে স্থানান্তরের জন্য মানসম্মত ট্রানজিট হাব থাকবে। পাশাপাশি দূরপাল্লার ভারী ও আন্তঃজেলা ট্রাকগুলোকে মূল শহরের ভেতর ঢুকতে না দিয়ে শহরের বাইরে বাইপাস, কার্যকর রিংরোড ও নির্দিষ্ট লজিস্টিকস করিডরের মধ্য দিয়ে চলাচলের সুনির্দিষ্ট অবকাঠামো থাকতে হবে।
ঢাকার সংকটকে শুধু যানজটের চিত্র হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যাবে না। এটি মূলত একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার সংকট
ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা নদী দীর্ঘদিন ধরে দখল, দূষণ ও অবহেলার শিকার হলেও এগুলো ঢাকার জন্য সম্ভাব্য দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ পরিবহন ব্যবস্থা হতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে নদীপথ ছিল এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার প্রধান স্তম্ভ। নদী ও খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খননকাজের মাধ্যমে নিয়মিত আধুনিক ওয়াটার বাস, পণ্যবাহী বার্জ ও দ্রুতগতির ওয়াটার ট্যাক্সি চালুর পাশাপাশি শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহনে জলপথ ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্প অবকাঠামোর অযাচিত কেন্দ্রীভবন শহরের দৈনন্দিন জীবনকে স্থবির করে দিচ্ছে। কাঁচামাল ও হাজার হাজার শ্রমিকের প্রাত্যহিক যাতায়াত ঢাকাকে সার্বক্ষণিক ভারাক্রান্ত করে রাখছে। এ চাপ কমাতে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোয় পরিকল্পিত শিল্পনগরী গড়ে তোলার প্রয়াস আরও শক্তিশালী করতে হবে। সেখানে শুধু জমি বরাদ্দ না দিয়ে আধুনিক বিদ্যুৎ, গ্যাস, ড্রেনেজ, ডিজিটাল অবকাঠামো, আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি, সেন্ট্রাল ওয়্যারহাউজ এবং শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
লজিস্টিকস খাতে পরিবর্তন এনে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি করা সম্ভব। সড়ক, রেল ও নদীপথের সংযোগস্থলে সমন্বিত মাল্টিমডাল লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলা সময়ের দাবি। চট্টগ্রাম ও পায়রা বন্দর থেকে আসা কনটেইনার ও ভারী পণ্য শহরের বাইপাস এলাকার লজিস্টিকস হাবে নেমে সেখান থেকে পরিমিত উপায়ে সরবরাহ করা হলে ঢাকার ভেতরের সড়কগুলো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।
একই সঙ্গে দ্রুত হ্রাস পাওয়া সবুজ অঞ্চল সংরক্ষণ করতে হবে। তীব্র বায়ুদূষণ ও মারাত্মক তাপ-ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে ছায়াযুক্ত পথ, পার্ক, ছাদবাগান, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভবন নির্মাণে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা অত্যন্ত জরুরি। গৃহস্থালি পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, সর্বাধুনিক পুনর্ব্যবহার ও কম্পোস্টিং নিশ্চিত না করলে মাতুয়াইল বা আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের স্থান দ্রুত সংকুচিত হয়ে সার্বিক পরিবেশ বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।
প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান বা স্মার্ট নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, স্বয়ংক্রিয় জলনিষ্কাশন নজরদারি, ভবন নির্মাণের অনুমোদন পর্যবেক্ষণ ও অনিয়ম রোধ করা সম্ভব। তবে এর জন্য একক এবং সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন মহানগর সমন্বয় কর্তৃপক্ষ থাকা অত্যন্ত আবশ্যক, যেন কোনো একটি সেবা সংস্থার কাজের দরুন অন্য কোনো সংস্থার কাজ বাধাগ্রস্ত না হয়। বহুবিধ প্রকল্প বা কোটি টাকার মেগা প্রকল্প একা ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে দিতে পারবে না। সময় এসেছে সব অবকাঠামোগত, পরিবেশগত ও প্রশাসনিক উদ্যোগগুলোকে একটিমাত্র মহাপরিকল্পনার ছাতাতলে নিয়ে আসার। আজকের দৃঢ়, সময়োপযোগী ও সমন্বিত পদক্ষেপই ২০৪১ সালের ঢাকাকে একটি সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময়, প্রাণবন্ত ও উন্নত মেগা সিটিতে রূপান্তর করার সর্বশ্রেষ্ঠ সুযোগ।
লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাবি
সাবেক গবেষক, হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান



