ছুটির পাঠ
ছিনতাইপ্রবণ মোহাম্মদপুর পার হতে হতে দেখা বিমান ছিনতাই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মোহাম্মদপুর দিয়ে অফিসে আসার সময় আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হয়তো আকাশ।
ভাবনাটা অবশ্যই অযৌক্তিক। মোহাম্মদপুরের কোনো মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় যদি আপনি নিজের চারপাশের মানুষজন, মোটরসাইকেল, সিএনজি, বাস, রিকশা, হঠাৎ পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া গাড়ি কিংবা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মুখগুলোর দিকে তাকান, তখন নিরাপত্তা নামের বস্তুটির ওপর আপনার আস্থা খুব একটা থাকার কথা নয়। শহরে বিপদ দৃশ্যমান, কিন্তু তার উৎস অদৃশ্য। আপনি জানেন না কোন মুহূর্তে কোন দিক থেকে কী এসে আপনার দৈনন্দিনতার মধ্যে ঢুকে পড়বে।
হয়তো এই মাটির ভয় থেকেই আকাশের কথা মনে পড়ে।
অথবা এটাকে বলা যায় হাইপার-এসকেপিজম—যেখানে বাস্তবের আতঙ্ক থেকে পালাতে গিয়ে মানুষ তার বিপরীত বাস্তব কল্পনা করে। মাটিতে বিপদ বেশি বলে আকাশকে নিরাপদ মনে হয়। রাস্তায় ছিনতাইয়ের আশঙ্কা থাকলে মনে হয়, বিমানে উঠে অন্তত কয়েক ঘণ্টা সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা যাবে। নিচে শহর, তার যানজট, তার রাজনৈতিক উত্তেজনা, তার অপরাধ, তার গলি—সব ছোট হয়ে যাবে। আপনি উঠে যাবেন মেঘের ওপরে।
কিন্তু বিমান ছিনতাইয়ের ইতিহাস জানলে এই নিরাপত্তাবোধের মধ্যেও একটা অদ্ভুত বিদ্রূপ খুঁজে পাওয়া যায়।
কারণ বিমান একসময় ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদীর হাতে দাবি আদায়ের যন্ত্র। পরে সেটিই হয়ে উঠল নিজেই একটি অস্ত্র।
এই দুইয়ের মাঝখানে আছে ঢাকা।
১. বিমান যখন ছিল জিম্মিখানা
বিমান ছিনতাইয়ের প্রাথমিক রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত এমন এক সময়ের ইতিহাস, যখন সন্ত্রাসী কিংবা বিপ্লবী সংগঠনের কাছে মানুষের জীবন ছিল দর-কষাকষির পুঁজি।
বিমানকে বেছে নেওয়ার কারণ খুব সরল। এটি একটি চলমান, সীমাবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরের জায়গা। আপনি একবার একটি বিমান দখল করতে পারলে একই সঙ্গে কয়েক ডজন বা কয়েকশ মানুষকে জিম্মি করতে পারেন, একটি রাষ্ট্রকে বিব্রত করতে পারেন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে আপনার দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন এবং কোনো রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি, অর্থ, আশ্রয় কিংবা অন্য কোনো দাবি নিয়ে দর-কষাকষির টেবিলে বসতে পারেন।
অর্থাৎ বিমান ছিনতাইয়ের পুরোনো যুক্তিতে বিমানটি মূল অস্ত্র ছিল না; বিমান ছিল মঞ্চ।
সত্তরের দশকে এই মঞ্চে উঠে এসেছিল নানা ধরনের বামপন্থী বিপ্লবী, জাতীয়তাবাদী এবং সশস্ত্র সংগঠন। তাদের রাজনৈতিক ভাষা ছিল ভিন্ন, তাদের আদর্শিক অবস্থানও ভিন্ন; কিন্তু বিমান ছিনতাইয়ের কৌশলে একটি অভিন্নতা ছিল—রাষ্ট্রের শক্তির বিরুদ্ধে মানুষের জীবনকে leverage হিসেবে ব্যবহার করা।
এখানে অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দরকার। বাংলাদেশের সঙ্গে যে বিখ্যাত ১৯৭৭ সালের বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা জড়িয়ে আছে, সেটি ছিল Japanese Red Army (JRA)-এর অভিযান। ১৯৭৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মুম্বাই থেকে টোকিওগামী Japan Airlines Flight 472-কে পাঁচজন জাপানি রেড আর্মি সদস্য ছিনতাই করে ঢাকায় নামতে বাধ্য করে। বিমানে ১৫৬ জন মানুষ ছিল।
এবং সেই মুহূর্তে সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা হঠাৎ পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রে অন্যরকমভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
২. ঢাকার আকাশে পাঁচজন সশস্ত্র মানুষ
১৯৭৭-এর ঢাকা আজকের ঢাকা নয়।
আজকের বহুতল ভবন, মোবাইল ফোন, লাইভ ট্র্যাকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ২৪ ঘণ্টার নিউজ সাইকেল—কিছুই তখনকার পৃথিবীতে ছিল না। একটি বিমান ছিনতাই মানে ছিল আকাশ থেকে নেমে আসা এক অস্বাভাবিক নাটক, যার খবর পৌঁছাত রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে।
জাপানি রেড আর্মির দাবিগুলো ছিল অর্থ ও বন্দি মুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন সরকারি ও ঐতিহাসিক নথিতে মুক্তিপণ ও বন্দি মুক্তির দাবির অঙ্কে কিছু পার্থক্য পাওয়া যায়; মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নথিতে ৬ মিলিয়ন ডলার এবং জাপানি কারাগারে থাকা কয়েকজন রেড আর্মি সদস্যকে মুক্তির দাবি উল্লেখ আছে।
কিন্তু ঢাকার জন্য ঘটনাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল অন্যত্র। বিমানটি কেবল ছিনতাই হয়নি; ঢাকা বিমানবন্দর পরিণত হয়েছিল একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক থিয়েটারে।
বাংলাদেশের তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এ জি মাহমুদ আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। জাপানের সরকারি সূত্রও পরে তার ভূমিকার স্বীকৃতি দেয় এবং জানায়, তিনি জিম্মিদের জীবন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনায় এগিয়েছিলেন।
এখানে বিমান ছিনতাইয়ের পুরোনো দর্শনটি পরিষ্কার হয়ে যায়: ছিনতাইকারী চায় রাষ্ট্র তার সঙ্গে কথা বলুক। অর্থাৎ আলোচনা নিজেই ছিল বিচ্ছিন্নতাবাদীদের রাজনৈতিক বিজয়ের একটি অংশ।
তারা বিমানকে ধ্বংস করতে চায় না; তারা বিমানটিকে যতক্ষণ সম্ভব জীবিত রাখতে চায়। কারণ জীবিত বিমান মানেই জীবিত জিম্মি। আর জীবিত জিম্মি মানেই দাবি আদায়ের সম্ভাবনা।
ঢাকার সেই সংকট দীর্ঘ আলোচনার মধ্য দিয়ে রক্তপাত ছাড়াই শেষ হয়েছিল—যদিও ঘটনাটির সঙ্গে একই সময়ে ঢাকায় সামরিক বিদ্রোহ ও গোলযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। মার্কিন সরকারি নথিতে দেখা যায়, বিমানবন্দরের আলোচনার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সামরিক অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলেছিল।
অবশেষে যাত্রীদের একটি বড় অংশ মুক্ত হয়, ছিনতাইকারীরা বিমান নিয়ে ঢাকা ত্যাগ করে এবং আলজেরিয়ায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে।
এই পুরো ঘটনার দিকে আজ ফিরে তাকালে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে একটি বিষয়: তখনও পৃথিবী বিশ্বাস করত, বিমান ছিনতাইয়ের শেষ গন্তব্য হলো আলোচনার টেবিল।
৩. আকাশমুখী হয়ে উঠেছিল ভূমির লড়াই
বিমান ছিনতাইয়ের রাজনৈতিক ইতিহাসকে শুধু অপরাধের ইতিহাস হিসেবে দেখলে একটা বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। সত্তরের দশকের বিপ্লবী রাজনীতিতে পৃথিবীজুড়ে একটি ধারণা সক্রিয় ছিল—রাষ্ট্রের প্রচলিত ভূখণ্ডের বাইরে গিয়ে কীভাবে রাষ্ট্রকে আঘাত করা যায়?
ভূমির লড়াই যখন রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী, পুলিশ, সীমান্ত, গোয়েন্দা সংস্থা এবং শহুরে নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে আটকে যায়, তখন সংগ্রামীরা নতুন ভূগোল খুঁজতে থাকে। বিমান সেই নতুন ভূগোল। এখানে সীমান্ত কয়েক মিনিটে অতিক্রম করা যায়। একটি ছোট্ট বিমানের ভেতর বসে আপনি একই সঙ্গে কয়েকটি রাষ্ট্রকে আলোচনায় টেনে আনতে পারেন। এক দেশের নাগরিক, আরেক দেশের বিমান, তৃতীয় দেশের বিমানবন্দর, চতুর্থ দেশের রাজনৈতিক বন্দি—সবকিছু একসঙ্গে একটি সংকটে এসে দাঁড়ায়।
অর্থাৎ মাটির রাজনীতি আকাশে উঠে যায়। কিন্তু এই আকাশ তখনও মূলত যোগাযোগের আকাশ। বিচ্ছিন্নতাবাদী বিমান দখল করে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক কথা বলতে চাইছে।
তারপর আসে ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। আর সেদিন বিমানের অর্থ বদলে যায়।
৪. ৯/১১: বিমান আর মঞ্চ নয়, অস্ত্র
৯/১১-এর আগে বিমান ছিনতাইয়ের প্রচলিত নিরাপত্তা-যুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল—ছিনতাইকারীরা সাধারণত বিমানটিকে নিরাপদে কোথাও নামাতে চাইবে। তারা দাবি করবে, জিম্মি নেবে, আলোচনায় বসবে।
৯/১১ কমিশনের ভাষায়, বিমান নিরাপত্তার প্রচলিত ‘Common Strategy’ ছিল সহযোগিতা ও সংঘাত এড়িয়ে চলা; ধারণাটি ছিল ছিনতাইকারীদের দাবিগুলো মেনে নিয়ে বিমানকে নিরাপদে অবতরণ করানো, তারপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি সামলাবে। সেই কৌশলের গভীরে ছিল একটি পুরোনো অনুমান—ছিনতাইকারী আত্মঘাতী নয়।
৯/১১ এই অনুমানটিকে হত্যা করে।
উনিশজন আল-কায়েদা সদস্য চারটি বাণিজ্যিক বিমান ছিনতাই করে। দুটি বিমান আঘাত করে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে, একটি পেন্টাগনে; চতুর্থ বিমানটির যাত্রীরা প্রতিরোধ করায় সেটি পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। মোট ২,৯৭৭ মানুষ নিহত হন।
এখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ছিল কৌশলে নয়, বিমানের ontological status-এ—বিমানটি কী?
১৯৭৭-এ বিমান ছিল জিম্মিখানা। ২০০১-এ বিমান নিজেই হয়ে গেল ক্ষেপণাস্ত্র।
এই পার্থক্যটি সামান্য নয়। বরং আধুনিক বিমান নিরাপত্তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মানসিক পরিবর্তন এখানেই। ছিনতাইকারী যদি বিমান নিয়ে পালাতে চায়, আপনি তার সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারেন। কিন্তু ছিনতাইকারী যদি বিমানটিকে ধ্বংস করতেই চায়, তাহলে দর-কষাকষির ভাষা অকার্যকর।
কারণ তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তার দরকার নেই নিরাপদ অবতরণের। তার দরকার নেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের। তার দরকার নেই বন্দি বিনিময়ের। তার দরকার শুধু একটি লক্ষ্য। এবং সেই মুহূর্তে আকাশের নিরাপত্তা নতুন করে সংজ্ঞায়িত হয়।
৫. আকাশের দরজা বন্ধ হয়ে গেল ৯/১১-র পর
আমরা এখন বিমানে উঠলে ককপিটের দরজা দেখি না, কিন্তু তার অস্তিত্ব অনুভব করি। জুতা খুলে পরীক্ষা, ব্যাগ স্ক্যান, শরীর তল্লাশি, তরল বহনের বিধিনিষেধ, পরিচয় যাচাই—বিমানবন্দর আমাদের শরীরকে ধীরে ধীরে একটি নিরাপত্তা-অ্যালগরিদমের ভেতর প্রবেশ করায়।
৯/১১-র পর এই পরিবর্তনগুলো কেবল প্রযুক্তিগত ছিল না; এগুলো ছিল মনস্তাত্ত্বিকও। ককপিটের দরজা শক্ত হলো। বিমানকর্মীদের নিরাপত্তা-প্রশিক্ষণ বদলাল। যাত্রীদের আচরণ সম্পর্কে ধারণা বদলাল। সবচেয়ে বড় কথা, একটি নতুন অনুমান তৈরি হলো— যে কোনো ছিনতাইকারী হয়তো বিমানটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
৯/১১ কমিশন স্পষ্টভাবে বলেছে, সেদিনের বিদ্যমান বিমান-ছিনতাই প্রতিরোধব্যবস্থা আত্মঘাতী ছিনতাইয়ের জন্য তৈরি ছিল না; পুরোনো প্রোটোকল ধরে নিয়েছিল, ছিনতাইকারী ঐতিহ্যগত অর্থেই ছিনতাই করবে।
অর্থাৎ ৯/১১ শুধু তিনটি ভবন বা একটি শহরকে বদলায়নি। এটি বদলে দিয়েছে বিমানে ওঠার অর্থ।
৬. তারপরও কি পুরোনো ছিনতাই ফিরে আসে?
৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাই এর FZ1073 ফ্লাইটে যা ঘটল, সেটি এই ইতিহাসকে আবার অস্বস্তিকরভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। ঘটনাটি ছিল ভয়াবহ, কিন্তু এর বর্ণনায় সতর্ক থাকা জরুরি।
ফ্লাইটটি দুবাই থেকে তেল আবিব যাচ্ছিল। আকাশে থাকা অবস্থায় ককপিটে দুই পাইলটের মধ্যে সহিংস সংঘর্ষ হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কো-পাইলট ক্যাপ্টেনকে ছুরিকাঘাত করেন এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। বিমানটি অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত উচ্চতা হারায় এবং একপর্যায়ে ৭৫০০—অর্থাৎ unlawful interference—সংকেতও পাঠায়। পরে বিমানটি সৌদি আরবের তাবুকে নিরাপদে অবতরণ করে। যাত্রী ও ক্রুরা বিমানের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখেন; ফ্লাইটে থাকা অন্য পাইলটরাও বিমানটিকে নিরাপদে নামাতে সাহায্য করেন।
ইসরায়েল ঘটনাটিকে বিমানটি বিধ্বস্ত করার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ঘটনার উদ্দেশ্য, পূর্বপরিকল্পনা কিংবা সন্ত্রাসী সংযোগ নিয়ে তদন্ত এবং সন্দেহ শেষ হয়নি। তাই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না যে বর্তমান বাস্তবতায় ইসরায়েলি বিমান ছিনতাইয়ের ব্যার্থ ঘটনাটির দায় আসলে কাদের, উদ্দেশ্যই বা কী...। কারণ, সারা বিশ্বে ইসরায়েল ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে, গভীরভাবে।
কিন্তু, বিমান ছিনতাইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস পর্যালোচনায় নিলে- এই সতর্কতাটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ FZ1073-কে ১৯৭৭-এর ঢাকার ছিনতাই বা ৯/১১-এর সঙ্গে সরাসরি এক কাতারে বসানো ঠিক হবে না। কিন্তু তিনটি ঘটনাকে পাশাপাশি রাখলে একটি অদ্ভুত রেখা দেখা যায়।
১৯৭৭-এ বিমান দখল করে রাষ্ট্রকে কথা বলতে বাধ্য করা হয়েছিল। ২০০১-এ বিমান দখল করে কথার প্রয়োজনই বাতিল করা হয়েছিল। ২০২৬-এ আবার দেখা গেল, বিমানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-দুর্বলতা হয়তো বাইরের কোনো যাত্রী নয়—কখনো কখনো বিমানের ভেতরের মানুষও হতে পারে।
৭. ছিনতাইয়ের ভয় আসলে বিমানের ভয় নয়
মোহাম্মদপুরের রাস্তায় দাঁড়িয়ে এই ইতিহাসের কথা মনে পড়লে ব্যাপারটা আরও অদ্ভুত লাগে। মাটির ভয় থেকে পালিয়ে আমরা আকাশে উঠি। কিন্তু আকাশও আসলে মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
বিমান হলো পৃথিবীর সবচেয়ে সফল নিরাপত্তা-নির্ভর প্রযুক্তিগুলোর একটি। কয়েকশ মানুষকে একটি ধাতব নলবন্দি করে দশ কিলোমিটার ওপরে নিয়ে যাওয়া—মানবসভ্যতার পক্ষে এটি এক বিস্ময়কর আস্থার কাজ। আপনি পাইলটকে চেনেন না। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারকে চেনেন না। ইঞ্জিনিয়ারকে চেনেন না। বিমানটি যে মানুষটি বানিয়েছে তাকেও চেনেন না।
তবু আপনি উঠে বসেন। কারণ আপনি বিশ্বাস করেন—ব্যবস্থাটি কাজ করবে। এ কারণেই বিমান ছিনতাইয়ের গল্প এত ভয়াবহ। এটি কেবল মৃত্যুর সম্ভাবনা তৈরি করে না; এটি বিশ্বাসের কাঠামোকে আক্রমণ করে।
আপনি যখন বাসে ওঠেন, আপনার চারপাশে রাস্তা থাকে। আপনি চাইলে নেমে যেতে পারেন। দুর্ঘটনা হলেও আপনার চারপাশে অন্য রাস্তা, অন্য মানুষ, হাসপাতাল, পুলিশ, দোকান, বাড়ি—একটি সম্পূর্ণ পৃথিবী থাকে।
বিমানে ওঠার পর পৃথিবী নিচে নেমে যায়। আপনার স্বাধীনতা কমে যায়। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর আপনি অন্য মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
এই কারণেই বিমানযাত্রার আতঙ্কের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক দিক আছে। বিমান ছিনতাই মানে শুধু বিমান দখল নয়; এটি যাত্রীর নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিজ্ঞতা।
৮. মাটির অপরাধ আর আকাশের সন্ত্রাস
মোহাম্মদপুর দিয়ে আসতে আসতে তাই মনে হয়—মাটির ছিনতাই আর আকাশের ছিনতাইয়ের মধ্যে দূরত্ব আসলে যতটা মনে হয়, ততটা নয়। দুটির মধ্যেই আছে নিয়ন্ত্রণ কে নেবে—এই প্রশ্ন।
রাস্তায় আপনার কাছ থেকে ফোন, টাকা বা গাড়ি কেড়ে নেওয়া হতে পারে। বিমানে আপনার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় আরও বড় কিছু—আপনার গন্তব্য। আপনি যেখানে যেতে চেয়েছিলেন, সেখানে আর যাবেন না। আপনার সময় আর আপনার নিজের নয়। আপনার শরীর আর আপনার নিজের নয়। আপনার সামনে যে আকাশ, সেটিও আপনার নিজের নয়।
সত্তরের দশকের রাজনৈতিক ছিনতাইকারীরা এই নিয়ন্ত্রণকে ব্যবহার করেছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির জন্য। ৯/১১-এর সন্ত্রাসীরা সেটিকে নিয়ে গেল আরও চরম জায়গায়—নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত অর্থ হয়ে উঠল ধ্বংস।
আর FZ1073 আমাদের মনে করিয়ে দিল, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের শরীর ও মন এখনো সেই ব্যবস্থার ভেতরের সবচেয়ে অনিশ্চিত উপাদানগুলোর একটি।
৯. আকাশের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো আকাশ নয়
আমরা নিরাপত্তাকে সাধারণত দেয়াল, স্ক্যানার, তালা, অস্ত্র, ক্যামেরা আর প্রযুক্তির ভাষায় ভাবি। কিন্তু বিমান ছিনতাইয়ের ইতিহাস অন্য কিছু বলে।
নিরাপত্তার সবচেয়ে দুর্বল জায়গা কখনো কখনো হলো আমাদের অনুমান। আমরা ধরে নিই, ছিনতাইকারী পালাতে চায়। আমরা ধরে নিই, সে বাঁচতে চায়। আমরা ধরে নিই, সে দাবি জানাবে। আমরা ধরে নিই, সে আলোচনায় বসবে। তারপর কোনো একদিন দেখা যায়—এই অনুমানগুলোই ভুল।
১৯৭৭ সালের ঢাকার ঘটনাকে আজ আমরা প্রায় একটি পুরোনো রাজনৈতিক থিয়েটার হিসেবে দেখতে পারি। পাঁচজন সশস্ত্র মানুষ একটি বিমান দখল করেছে, রাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষি করেছে, বন্দি মুক্তি ও অর্থ দাবি করেছে, শেষ পর্যন্ত জিম্মিদের বাঁচিয়ে সংকট শেষ হয়েছে।
তারপর ২০০১ এসে বলল—সব ছিনতাইকারীর উদ্দেশ্য এক নয়।
একজন বিমান দখল করে কোথাও যেতে চায়। আরেকজন বিমান দখল করে কোথাও যেতে চায় না। সে চায় বিমানটিই তার শেষ গন্তব্য হয়ে উঠুক।
এই জায়গাটিই বিমান ছিনতাইয়ের ইতিহাসকে ভয়াবহ করে তোলে।
১০. আবার মোহাম্মদপুর
অফিসে পৌঁছে হয়তো এইসব ভাবনার কোনো মানে থাকবে না। কম্পিউটার খুলব। ফোন বাজবে। মেইল আসবে। খবর আসবে। শহর তার স্বাভাবিক বিশৃঙ্খলায় ফিরে যাবে।
কিন্তু রাস্তায় আসতে আসতে যে প্রশ্নটি মাথায় আসে, সেটি থেকে যাবে— আমরা কি সত্যিই মাটি থেকে আকাশে পালাতে পারি? নাকি ভয় আমাদের সঙ্গে সঙ্গেই উঠে যায়?
মোহাম্মদপুরের গলিতে যে ভয়, বিমানের কেবিনে তার চেহারা বদলে যায় মাত্র। সেখানে ছিনতাইকারী হয়তো মুখোমুখি দাঁড়ায় না; বরং সে হয়ে ওঠে একটি সম্ভাবনা। একটি অস্বাভাবিক শব্দ। ককপিটের দরজা। একটি জরুরি সংকেত। হঠাৎ বদলে যাওয়া উচ্চতা। পাইলটের কণ্ঠে অস্বাভাবিকতা।
আকাশে ওঠার পর আমরা পৃথিবীকে নিচে ফেলে আসি—এমনটাই মনে হয়। আসলে আমরা পৃথিবীটাকেই সঙ্গে নিয়ে উঠি। তার রাজনীতি, তার যুদ্ধ, তার ধর্ম, তার মতাদর্শ, তার প্রযুক্তি, তার paranoia, তার অপরাধ, তার অসমতা—সবকিছু। বিমান তাই কখনো কেবল বিমান নয়।
এটি মানুষের চলাচলের সবচেয়ে সুন্দর প্রতীকগুলোর একটি, আবার একই সঙ্গে মানুষের ভয়, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং প্রযুক্তির ওপর আমাদের ভঙ্গুর নির্ভরতারও প্রতীক।
১৯৭৭-এ ঢাকার রানওয়েতে দাঁড়িয়ে একটি ছিনতাই করা বিমান পৃথিবীকে দেখিয়েছিল, কীভাবে মাটির রাজনৈতিক সংঘাত আকাশে উঠে যেতে পারে। ২০০১-এ নিউইয়র্ক দেখেছিল, আকাশ কীভাবে নিজেই মাটির বিরুদ্ধে অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। আর ২০২৬-এর FZ1073 আমাদের আবার মনে করিয়ে দিল—বিমান যত নিরাপদই হোক, নিরাপত্তা কখনো সম্পূর্ণ কোনো অবস্থা নয়; এটি আসলে মানুষের তৈরি এক ধরনের অবিরাম সমঝোতা।
সম্ভবত সেই কারণেই মোহাম্মদপুর দিয়ে অফিসে আসতে আসতে হঠাৎ আকাশের দিকে তাকালে আমার মনে হয়— ভয় থেকে পালানোর জন্য আমরা যত ওপরে উঠি, ভয়ও তত নিঃশব্দে আমাদের সঙ্গে উঠে যায়।
পার্থক্য শুধু এই: মাটিতে ভয় আমাদের ঘিরে থাকে। আকাশে ভয় আমাদের সঙ্গে একই কেবিনে বসে। আর দরজা বন্ধ হয়ে গেলে—আমরা সবাই একই যাত্রী।
লেখক : কবি ও সাংবাদিক





