সিএমপিতে কথায় কথায় ওসি বদল
- গত দুই বছরে অন্তত ২০ দফায় অসংখ্য ওসি রদবদল
- সবচেয়ে বেশি আটবার বদল খুলশী থানার ওসি
- বিব্রত পুলিশের কর্মকর্তারাই
- রুটিন কাজ বলছেন সিএমপি কমিশনার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ছয় মাসে পাঁচজন ওসি বদলি। এর মধ্যে একজনের মেয়াদ ছিল মাত্র দুই দিন। আরেকজন কোনোমতে মাসখানেক। এ চিত্র চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) খুলশী থানার, অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত এটি। শুধু খুলশী নয়; এ অস্বাভাবিক চিত্র সিএমপির প্রায় প্রতিটি থানার। কেউ দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে বদলি। কেউ কেউ টিকেছেন কয়েক সপ্তাহ। এমনও ঘটনা ঘটেছে, নিয়োগ দেওয়া ওসি চেয়ারে বসার আগেই করা হয়েছে প্রত্যাহার।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত দুই বছরে অন্তত ২০ দফায় অসংখ্য ওসি রদবদলের আদেশ হয়েছে। বারবার ওসি পরিবর্তনের ঘটনায় মাঠপর্যায়ের পুলিশি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও স্থিতিশীলতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক থানার ওসি বললেন, ‘আমরা এখন থানায় পোস্টিংয়ের অর্ডার পেলে দুশ্চিন্তায় থাকি। আদৌ থানায় যোগ দিতে পারব কি না। কখন আবার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। কখন হঠাৎ বদলি হয়ে যাই।’
পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ কে এম শহিদুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, একজন ওসি পোস্টিং পেয়ে থানায় বসে প্রস্তুতি সেরে কাজ শুরু করতেও তো মাসখানেক লাগে। ছয় মাসে এক থানায় পাঁচবার ওসি বদল করা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়; অস্থিরতার লক্ষণ।
এ ধরনের বদলির কারণ উল্লেখ করে সুনির্দিষ্টভাবে জনগণকে অবহিত করা উচিত। যদি রাজনৈতিক কারণে হয়, তাহলে সেটি দুঃখজনক। আর ভুল লোককে পদায়নের কারণে যদি বারবার বদল করতে হয়, তাহলে সেটা ইউনিট প্রধানের ব্যর্থতা।
এভাবে বারবার ওসি বদলের বিষয়ে জানতে চাইলে সিএমপি কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী আগামীর সময়কে বললেন, ‘এটি রুটিন কাজ। ওসি হিসেবে বদলির পর পারফরম্যান্স কেমন, চালাতে পারছে কি না— সেটি বিবেচনা করেই বদলি করা হয়। কেউ যদি চালাতে না পারে, তাকে দীর্ঘসময় না রেখে দ্রুততম সময়ে বদলি করে দেওয়া হয়। যে পারবে না তাকে রেখে দিয়ে লাভ কী!’
নগর বিশেষ শাখা (সিটি এসবি) থেকে খুলশী থানায় ওসি হিসেবে মোহাম্মদ আব্দুর রহিম যোগ দিয়েছিলেন গত ২৩ আগস্ট। হত্যা মামলার আসামি স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা ওয়াকিল হোসেন বগাকে গ্রেপ্তারে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয়, অর্থাৎ নগর ভবনে অভিযান চালায় খুলশী থানা-পুলিশ। এ নিয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন উষ্মা প্রকাশ করেন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বুধবার রাতে ওসি রহিমকে বদলির আদেশ দেন সিএমপি কমিশনার। যদিও রহিম বলছিলেন, অভিযানের সময় তিনি ছুটিতে ছিলেন। সর্বসাকল্যে ওসি রহিমের মেয়াদ ছিল ১ মাস ১০ দিন।
আব্দুর রহিমের আগের ওসি মোজাম্মেল হক। তিনি যোগ দিয়েছিলেন ১৫ জুন। ২ মাস ৮ দিনের মাথায় তাকে পাঁচলাইশ থানায় বদলি করে দেওয়া হয়। ১৩ জুন বাকলিয়া থানা থেকে বদলি হয়ে মোহাম্মদ সোলাইমান যোগ দিয়েছিলেন খুলশী থানায়। যুবদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের একটি ঘটনার পর মাত্র দুই দিনের মাথায় ১৫ জুন তাকে বদলি করা হয় সিটি এসবিতে। সোলাইমানের আগে খুলশীর ওসি ছিলেন আরিফুর রহমান। তিনি ২৫ মার্চ যোগ দিয়েছিলেন। ক্রিকেটার নাঈমকে হেনস্তার অভিযোগে ১৩ জুন তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয়। সংসদ নির্বাচনের আগে ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর জাহিদুল ইসলামকে খুলশী থানার ওসি করা হয়েছিল। তিনি মোটামুটি সাড়ে ৪ মাস দায়িত্ব পালন করে ২৫ মার্চ পাঁচলাইশ থানায় বদলি হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর দুই দফায় প্রথম ওসি বদলি করা হয়। যদিও সেটি করেছিল পুলিশ সদর দপ্তর। প্রথম দফায় সিএমপির ১৬ থানার মধ্যে ১৩ ওসিকে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। তারা সবাই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আমলে থানায় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেই আমলের আরও তিন থানার ওসিকে প্রত্যাহার করে বিভিন্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।
এরপর গত দুই বছরে সবচেয়ে খুলশী থানায় আটবার ওসি বদল হয়েছে। চকবাজার, কর্ণফুলী ও চান্দগাঁও থানায় পাঁচবার করে ওসি বদল হয়েছে। কোতোয়ালি, বাকলিয়া, সদরঘাট, ডবলমুরিং, আকবর শাহ ও পাঁচলাইশ থানায় চারবার করে ওসি পদে রদবদল করা হয়েছে। পাহাড়তলী, বায়েজিদ বোস্তামী, হালিশহর, বন্দর ও পতেঙ্গা থানায় তিনবার ওসি বদল হয়েছে। ইপিজেড থানায় অবশ্য মাত্র দুবার ওসি বদল হয়েছে।
এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর ১৬ থানার ওসি পদে একযোগে রদবদল হয়। সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের আদেশে এটি স্বাভাবিক রদবদল ছিল। এ ছাড়া বাকি সব রদবদলের ঘটনার মধ্যে কোনো না কোনো ‘কিন্তু’ আছে। এই কিন্তুর ব্যাপারে কেউ মুখ খুলছেন না। তবে ধারণা করা যায়— মেয়র, স্থানীয় এমপি, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের পছন্দ-অপছন্দের ঠেলাঠেলিতে এসব রদবদল। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনাগ্রহী এক উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তার আক্ষেপ, ‘সবাই বলে এই চেয়ারে বসে অনেক এনজয় করা যায়। কিন্তু আমি কোনো এনজয় করতে পারছি না।’
ওসি বদলি নিয়ে গত ছয় মাসে খুলশীর পর সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটেছে সদরঘাট ও কর্ণফুলী থানায়। গত ৫ জুলাই সদরঘাট থানার ওসি মুহাম্মদ শরীফকে যোগদানের মাত্র ১৭ দিনের মাথায় বদলি করা হয়। অন্য জেলার একজন প্রতিমন্ত্রীর আধাসরকারি পত্রের (ডিও) ভিত্তিতে তাকে বদলি করার এ ঘটনা নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হয়েছিল। ১৮ জুন সিটি এসবির পরিদর্শক কাজী মাসুদ ইবনে আনোয়ারকে কর্ণফুলী থানার ওসি পদে বদলির আদেশ দিয়েছিলেন সিএমপি কমিশনার। আদেশ প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপির একটি মিছিলে বাধা দেওয়ার ঘটনার ছবি ফেসবুকে ভাইরাল করে দেন দলটির নেতাকর্মীরা। যদিও সেই আমলে ‘কোণঠাসা’ হয়ে থাকা পুলিশ পরিদর্শকদের মধ্যে একজন ছিলেন মাসুদ। বিএনপির আপত্তির মুখে তিনি ওসির চেয়ারে বসার আগেই তাকে প্রত্যাহার করে সিটি এসবিতে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন সিএমপি কমিশনার।
বারবার ওসি বদলি নিয়ে অস্বস্তি আছে সিএমপির শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তার মধ্যেও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উপকমিশনার বললেন, ‘প্রশাসনিক প্রয়োজন, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে ওসি বদলি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু রাজনৈতিক চাপের মুখে বারবার ওসি বদল করা হলে পুলিশের স্বাভাবিক কাজে প্রভাব পড়ে। একজন ওসি তার এলাকার অপরাধ ও অপরাধীদের নিয়ে কাজ শুরুর আগেই যদি তাকে সরে যেতে হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা কঠিন।’



