মুক্তিযোদ্ধা তালিকা
মুক্তিযুদ্ধ একবার, তালিকা ৭ বার!
- দেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৮০০
- মাসিক ভাতা পান ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫৪ জন
- তালিকা থেকে অমুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেওয়া হবে : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও চূড়ান্ত হয়নি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান— প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা। এ পর্যন্ত সরকারিভাবে তৈরি হয়েছে ছয় তালিকা। ফের নতুন তালিকা করে ‘অমুক্তিযোদ্ধা’দের বাদ দেওয়ার ঘোষণা এসেছে সরকারের তরফে। লক্ষ্য, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নির্মোহভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই। তবে উদ্যোগটি নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠে ফুটেছে আক্ষেপ। তারা বলছেন, সরকার বদলের সঙ্গে বদলায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকাও। নতুন সরকার আসে আর নতুন তালিকা করার ঘোষণা দেয়। বিষয়টিকে তারা রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় আর নিজেদের দুর্ভাগ্য উল্লেখ করে বলছেন, এটিকে তারা নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পান আহমেদ আজম খান। প্রতিমন্ত্রী হন ইশরাক হোসেন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের ‘সঠিক তালিকা’ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ‘প্রকৃত তালিকা’ তৈরি করে প্রতিবেদন দিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছিল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ অক্টোবর বীর মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় গেজেটভুক্তির আবেদন গ্রহণসংক্রান্ত গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত বুধবার (৭ অক্টোবর) ছিল আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন। বুধবারই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের প্রকৃত তালিকা প্রণয়নের কৌশল ও করণীয় নির্ধারণে মতবিনিময় সভা হয়। বৈঠকে বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধি, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, মুক্তিযোদ্ধা এবং বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় নেতারা অংশ নেন। তবে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের শীর্ষপর্যায়ের কোনো নেতাই উপস্থিত ছিলেন না ওই সভায়।
বৈঠক শেষে নতুন তালিকা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে মন্ত্রী আহমেদ আজম খান বলেছেন, এরই মধ্যে সংসদে, সংসদের বাইরে ও রাস্তাঘাটের বিভিন্ন আলোচনায় উঠে এসেছে, মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা যোদ্ধা তাদের সঙ্গে হাজার হাজার অমুক্তিযোদ্ধা যুক্ত হয়েছেন। ১৯৭১ সালের শহীদদের তালিকা নিয়েও অনেক বিতর্ক রয়েছে। এসব নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় নির্মোহভাবে কাজ করছে।
মন্ত্রী বলছিলেন, ‘দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে আমরা সঠিকভাবে যদি মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তুলে আনতে পারি, তাহলে ইতিহাসের দায় থেকে আমরা নিজেদের মুক্ত করতে পারব। অমুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে সেই প্রক্রিয়া শেষ হতে কত সময় লাগবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা ও তালিকা যাচাইয়ের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয় ফারুক ই আজমকে (বীরপ্রতীক)। এরপর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) পুনর্গঠন করা হয়। মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নির্ধারণসহ তালিকা প্রণয়ন-সংশোধনের কাজটি করে জামুকা। সেখানে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণ করে অধ্যাদেশ হয়, তা আইনে পরিণত হয় বর্তমান সরকারের আমলে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মূলত রাজনৈতিক কারণেই মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। সরকার বদলের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার পরিবর্তন হওয়াটাও যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ পর্যন্ত সরকারিভাবেই ছয়টি তালিকা হয়েছে। যখনই নতুন তালিকা করা হয়েছে, তখনই দেখা গেছে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়েছে। আর আগের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নাম। এসব তালিকায় সর্বনিম্ন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৭০ হাজার ৮৯৬ জন, সর্বোচ্চ দুই লাখেরও বেশি। তালিকা চূড়ান্ত না হলেও এই মুহূর্তে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ লাখ ৯৭ হাজার ৮০০। এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা করে মাসিক ভাতা পান ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪৫৪ জন।
সরকারিভাবেই ৬ তালিকা
মুক্তিযুদ্ধের পর সেক্টর কমান্ডার ও সাবসেক্টর কমান্ডারদের বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধে নিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৮০০ এবং অনিয়মিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার। অর্থাৎ ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০০ জন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন সেক্টর বিলুপ্তির পর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রশিক্ষণ ও রেকর্ড সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান ইবিআরসিতে স্থানান্তরিত দলিলে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৭০ হাজার ৮৯৬ জন। এক্ষেত্রে আগের তালিকার বাকি মুক্তিযোদ্ধার হদিস পাওয়া যায়নি। এটিই পরবর্তীকালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে সংরক্ষিত রয়েছে। যেটি ভারতীয় তালিকা নামে পরিচিত। এর আগে ১৯৭৮ সালের পর মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরির কাজে হাত দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সে সময়কার সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে দায়িত্ব দেন তিনি। ওই তালিকায় ১৯৮৬ সালে এরশাদের শাসনামলে জাতীয় তালিকা নামে প্রকাশ করা হয়। যার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২ হাজার ৪৫৮। তবে এ তালিকা গেজেট হিসেবে প্রকাশিত হয়নি। ১৯৯৪ সালে বিএনপির শাসনামলে মুক্তিযোদ্ধা সংসদেও ভোটার-সূচক তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ৮৬ হাজার।
আওয়ামী লীগের আমলে (১৯৯৬-২০০১) চতুর্থবারের মতো ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়, যা মুক্তিবার্তা (সবুজ) হিসেবে পরিচিত। পরে আরও যাচাই-বাছাই করে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৪৫২ জনের আরেকটি তালিকা করা হয়, যা মুক্তিবার্তা (লাল) হিসেবে পরিচিত।
২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। সে সময় আগের নীতি বাদ দিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সুপারিশে মুক্তিযোদ্ধা সংসদকে বাদ রেখে ইউএনও ও ডিসিদের নিয়ে উপজেলা এবং জেলা যাচাই-বাছাই কমিটি করা হয়। আগের যেকোনো দুটি তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তাদেরই সুপারিশ করে কমিটি। তাদের সুপারিশের ব্যক্তিরাই মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যান। এভাবে ২০০৩ ও ২০০৪ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার দুটি গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর একটি ছিল বিশেষ গেজেট; যেখানে সামরিক বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল ৩৯ হাজার এবং অপর গেজেটে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৫৯ হাজার। দুটি মিলে তখন মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৯৮ হাজার জনে।
এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে অভিযোগ করে, জোট সরকারের আমলে ৭০ হাজারের বেশি অমুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনে বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। এর মধ্যে ২০২১ সালের মার্চ মাসে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৩৭ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার একটি তালিকা (অপূর্ণাঙ্গ) প্রকাশ করা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দিয়েও পূর্ণাঙ্গ তালিকা আর প্রকাশ করেনি।
আওয়ামী লীগ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, পূর্ণাঙ্গ তালিকায় সংখ্যাটি ১ লাখ ৯০ হাজারের বেশি হবে না।



