সেদিনও ওরা বলেছিল ‘আমরা ভালো নেই’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
একটি শিশুকে রক্ষা করার প্রাথমিক ও চূড়ান্ত দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রের; কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র কি পেরেছে তার আশ্রয়ে থাকা অসহায় সন্তানদের ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে? ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে থাকা ষষ্ঠ শ্রেণির এক ১৪ বছর বয়সী শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থার চরম ফাঁক গলে স্কুল যাতায়াতের পথে ৫৪ বছর বয়সী এক দর্জি এই জঘন্য অপরাধটি ঘটিয়েছে। আদালতের নির্দেশে শিশুটিকে এখন নিজ আশ্রয় ছেড়ে রাখা হয়েছে নারী ও হেফাজতিদের আবাসন কেন্দ্রে। এই এক ঘটনাই আবার প্রমাণ করল, সরকারি শিশু সদন বা পরিবারগুলো শিশুদের পূর্ণ নিরাপত্তা দিতে পারছে না। ২০২৩ সালেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল এবং বিভিন্ন সময়ে মেয়েদের প্রতি যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। মূলত তীব্র অব্যবস্থাপনা এবং তদারকির অভাবই এ আবাসনগুলোকে আজ শিশুদের জন্য চরম অনিরাপদ করে তুলেছে।
এই নিরাপত্তাহীনতা ও অরাজকতা আজকের নতুন কোনো ঘটনা নয়। ২০১৪ সালের কথা, যশোর শিশু উন্নয়নকেন্দ্রের ১৫ জন কিশোর কাচ দিয়ে নিজেদের শরীর চিরে আর্তনাদ করে প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিল, ‘আমরা ভালো নেই।’ তারপর ২০২০ সালের আরও নির্মম হত্যাকাণ্ডের কথা কি আমরা ভুলে গেছি? কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকাশ্য অফিসিয়াল বৈঠক শেষে পিটুনিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিল তিনটি কিশোর, আহত হয়েছিল আরও কয়েকজন। যেন রক্ষকই সেদিন ভক্ষক হয়ে উঠেছিল।
ঠিক ২০ বছর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে দেখা হয়েছিল কিশোর রহিমের সঙ্গে। সারা গায়ে ছিল আঘাতের চিহ্ন। টঙ্গী সংশোধনাগার থেকে পালিয়ে আসা পিতৃহীন এই শিশুটি জানিয়েছিল, বস্তিতে খালার কাছে থাকার সময় পুলিশি অভিযানে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই তাকে তুলে সংশোধনাগারে রাখা হয়েছিল। সেখানে তথাকথিত ‘বড় ভাইদের’ চরম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে গার্ডকে ২০ টাকা দিয়ে সে পালিয়ে এসেছে। এর দুই দশক পর, ২০২৫ সালে নেত্র নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ঠিক একই ভীতিপ্রদ বাস্তবতার চিত্র ফুটে ওঠে। ১০ বছরের শিশু রাকিবুলকে টঙ্গীতে ময়লা কুড়ানোর সময় পুলিশ তুলে নিয়ে যায়। কোনো মামলা, কাগজপত্র কিংবা আদালতের নির্দেশ ছাড়াই তাকে এক বছরের জন্য আটকে রাখা হয় এবং তীব্র নির্যাতনের মুখোমুখি করা হয়।
প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে, রাষ্ট্রের আইনি দায়বদ্ধতা ও রাষ্ট্র পরিচালিত তিনটি শিশু উন্নয়নকেন্দ্রের ভেতরের বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে। পুনর্বাসনের নামে এসব কেন্দ্রে এমন অসংখ্য শিশুকে বছরের পর বছর বন্দি করে রাখা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে কোনো দণ্ডাদেশ নেই, এমনকি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্রও নেই। অভিভাবকহীন, অনাথ ও অসহায় শিশুদের কোনো সামাজিক রক্ষাকবচ না থাকায় রাষ্ট্র তাদের অনায়াসে ধরে এনে বন্দিশালায় নির্যাতন করছে। অথচ আইনি ও নৈতিকভাবে এই আশ্রয়হীন শিশু-কিশোরদের একমাত্র বৈধ অভিভাবক খোদ রাষ্ট্র।
কেন্দ্রে অবস্থানরত শিশুরা মৌলিক চাহিদাগুলো থেকে বঞ্চিত এবং প্রতিনিয়ত ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, নির্মম মারধর, না খাইয়ে রাখা এবং গরম খুন্তির ছ্যাকাসহ বিভিন্ন মধ্যযুগীয় শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে। মারাও গেছে কয়েকজন। তীব্র অবহেলা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি কেন্দ্রগুলোয় পর্যাপ্ত কর্মকর্তা বা প্রহরী নেই, ফলে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে এবং পুরনো বন্দিরা নতুন অল্প বয়সীদের ওপর জোর খাটায়।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ‘শিশু অধিকার সনদ’-এ প্রথমদিকে স্বাক্ষরকারী দেশ। এই সনদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যেসব শিশু অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছে, তাদের সঙ্গেও এমন আচরণ করতে হবে, যাতে শিশুর মর্যাদা রক্ষিত হয়। বাংলাদেশের নিজস্ব ‘শিশু আইন ২০১৩’ এবং আন্তর্জাতিক আইনও শিশুদের প্রতি যেকোনো ধরনের অমানবিক আচরণ কিংবা শারীরিক দমনকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আইনের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে, রাষ্ট্রীয় আশ্রয়ে থাকা প্রতিটি শিশুর পর্যাপ্ত পুষ্টি, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
সংশোধনমূলক বিচারব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো— অভিযুক্ত শিশু-কিশোরদের সাধারণ কারাগারের অন্ধকার পরিবেশ থেকে দূরে রেখে মানবিক উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা। শিশু আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অপরাধে জড়িত শিশুদের সঙ্গে সম্পূর্ণ নিরপরাধ শিশুদের একই স্থানে রাখা সংশোধনমূলক নীতির চরম লঙ্ঘন। এতে নিরপরাধ শিশুদের মধ্যেও বিচ্যুত আচরণ শেখার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়, যা পুনর্বাসনের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দেয়।
যেহেতু রাষ্ট্র এই অসহায় শিশুদের অভিভাবক, তাই অবিলম্বে এই কেন্দ্রগুলোর আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় বাজেট বাড়িয়ে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য, বিশুদ্ধ জল, নিরাপদ আবাসন ও বিনোদনের জায়গা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, শারীরিক নির্যাতনের পরিবর্তে শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য শরীরচর্চা, মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিং এবং সৃজনশীল শিক্ষার ব্যবস্থা করা জরুরি। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবিক শিক্ষক ও প্রশিক্ষক নিয়োগ করতে হবে, যারা শিশুদের বৃত্তিমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দেবেন, যাতে তারা কেন্দ্র থেকে বের হয়ে সম্মানজনক কাজে ফিরতে পারে।
সর্বোপরি, এই সংশোধন কেন্দ্রগুলোয় কঠোর ও নিয়মিত মনিটরিংব্যবস্থা চালু করতে হবে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী এখানে কাজ করবেন, তাদের সবার আগে সংবেদনশীল ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ হতে হবে। যে সংশোধনাগারে নিপীড়ন-নির্যাতন ও অপরাধ চলে, শিশুর মনে জন্ম নেয় ভয় ও হতাশা— সেখানে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে এগুলো চালানোর কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে কি?
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক




