মানুষ হত্যার ব্যাকরণ বন্দুকযুদ্ধ অথবা মব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছ যে...’
২০১৮ সালের ২৬ মে। টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক ঘরে ফিরছেন না। ফোনে মেয়ের প্রশ্ন শুনে গলা ধরে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তার মৃত্যু হয়। র্যাবের বিবরণে তিনি মাদক কারবারে অভিযুক্ত; পরিবারের প্রকাশ করা ফোনালাপ সেই বিবরণকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। সেখানে একজন অভিযুক্তের পাশাপাশি একজন বাবা আছেন, যার কান্না তার মেয়ে শুনতে পেয়েছিল। সরকারি ভাষায় আছে ‘বন্দুকযুদ্ধ’; মেয়ের ভাষায় আছে ‘আব্বু’।
এই প্রশ্নের উত্তর একরামুল দিতে পারেননি। তার পরিবারের বিচার চাওয়ার লড়াই আট বছর পরও চলছে। মৃত্যু ঘটার পর রাষ্ট্রের দেওয়া পরিচয় টিকে যায়; পরিবারের কাছে মানুষটির অন্য পরিচয় কখনো মুছে যায় না। এই ফারাকটিই ‘ক্রসফায়ার’ শব্দের নৈতিক বোঝা।
এ দুই ভাষার মাঝখানে ক্রসফায়ারের ইতিহাস। কাউকে ধরে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের অভিযান, সহযোগীদের গুলি, পাল্টা গুলি, তারপর অভিযুক্তের মৃত্যু— বছরের পর বছর কাছাকাছি বিবরণ শুনেছি। প্রতিটি ঘটনার সত্যতা একভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। কিন্তু ২০১৮ সালের মাদকবিরোধী অভিযানে ৪৬৬টি সন্দেহভাজন বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর তথ্য দিয়েছিল অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ২০২০ সালে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের হত্যায়ও পুলিশের দেওয়া বিবরণ আদালতে টেকেনি; মামলায় কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা দণ্ডিত হয়েছেন।
মৃত্যুর ঘটনাকে ‘অভিযান’ এবং নিহত ব্যক্তিকে ‘অপরাধী’ বললে একটি বাক্যেই বিচার ও শাস্তি শেষ হয়ে যায়। কে গুলি করেছিল, বন্দুকটি কার, স্বাধীন তদন্ত হলো কি না— সেসব প্রশ্ন হারিয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় বিবরণকে প্রশ্ন করা তাই রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়; এটি আইনের শাসনের প্রাথমিক দাবি।
২৬ অক্টোবর ২০২৬, পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির বললেন, প্রয়োজন হলে সরকার অনুমতি দিলে ক্রসফায়ার করা হবে। পরে পুলিশ সদর দপ্তর ব্যাখ্যা দিল, তিনি বিচারবহির্ভূত হত্যা বোঝাননি; শব্দটি রূপক অর্থে বলেছেন। ব্যাখ্যাটি নথিতে থাক। কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুলিশ কর্মকর্তা আইন প্রয়োগ বোঝাতে কেন এমন একটি শব্দ বেছে নেবেন, যার সঙ্গে পরিবারের আতঙ্ক ও বিচারহীনতার স্মৃতি জড়িয়ে? আইনসম্মত বলপ্রয়োগের বিধান আছে; বিচার ছাড়া কাউকে হত্যা করার সরকারি অনুমতি নেই।
একরামুলের মেয়ে বাবার কান্না শুনেছিল। মবের শিকার মানুষগুলোরও পরিবার আছে। রাষ্ট্র যদি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ভাষায় একজনের কান্না মুছে দিতে চায়, আর জনতা ‘চোর’ বলে আরেকজনের কান্না অগ্রাহ্য করে, তবে হত্যার পর গল্প আলাদা হলেও নৃশংসতার অনুমতিটি থেকে যায়
আমরা এমন এক সমাজে এবং ব্যবস্থায় পৌঁছেছি, যেখানে রাষ্ট্রের ভাষার নৃশংসতা আছে, আবার মবের নৃশংসতাও চোখের সামনে। উভয় ক্ষেত্রেই কেউ একজন অন্যের জীবন কেড়ে নেওয়ার অধিকার দাবি করে। একদিকে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বলে মৃত্যুর ব্যাখ্যা, অন্যদিকে ‘চোর’ কিংবা ‘ধর্মদ্রোহী’ বলে হত্যার ন্যায্যতা। দুটি এক নয়, কিন্তু দুটিই মানুষকে আইনের সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে।
একটি রাষ্ট্র যখন একজন বাবার কান্না ঢেকে দিতে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ গল্প ব্যবহার করে, তখন সমাজের একাংশ কীভাবে ‘চোর’ কিংবা ‘ধর্মদ্রোহী’ পরিচয়ের আড়ালে অন্য একজন মানুষের কান্নাকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলে?
উত্তর খুঁজতে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখি। ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের কথিত ধর্ম অবমাননার অডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের অভিযোগ, ফেসবুক লাইভে মানুষ জড়ো করার আহ্বানও ছিল। মারধরের পর পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়; সেখানে দ্বিতীয়বার হামলা হয়। তিনি মারা যান। ২১ অক্টোবর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আলম শেখকে ‘শিশুচোর’ সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়। ২৫ অক্টোবর রংপুরে অটোরিকশা চুরির অভিযোগে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে লোক জড়ো করে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগ, সন্দেহ ও মাইকের ঘোষণা আদালতের জায়গা নিয়ে নেয়।
সাতক্ষীরায় হামলা থেকে উদ্ধার হওয়ার পরও হাসপাতাল তাকে রক্ষা করতে পারেনি। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালেও একজন সন্দেহভাজনের জীবন নিরাপদ থাকেনি। চিকিৎসার স্থান কীভাবে জনতার শাস্তির স্থানে পরিণত হয়? পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব কী ছিল, তা তদন্তে বের হওয়া দরকার।
একজনকে হত্যার আগে প্রায়ই তার পরিচয় সংকুচিত করা হয়। সে আর একরামুল, শামীম কিংবা আলম নয়; সে ‘মাদক কারবারি’, ‘ধর্মদ্রোহী’, ‘শিশুচোর’। অভিযোগ প্রমাণিত কি না— প্রশ্নটি আড়ালে চলে যায়। বিচার চাইতে বলাও তখন অপরাধীর পক্ষ নেওয়ার মতো শোনায়। এভাবেই সামাজিক হত্যা শারীরিক হত্যার পথ তৈরি করতে পারে।
‘অপরাধের নৃতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ব’ লেখায় হুমায়ূন আহমেদের মতি মিয়ার কথা বলেছিলাম। ‘চোর’ বলে তার চোখ তুলে ফেলার আয়োজন দেখতে মানুষ জড়ো হয়। ভয় শুধু আঘাতকারীর নয়; দর্শকেরও। তবে কেউ ভয়ে নীরব, কেউ ছবি তোলে, কেউ বাধা দিতে চায়। তাদের দায় এক নয়। বিপদ হয় যখন উপস্থিত জনতাকেই হামলাকারী তার কাজের সামাজিক অনুমোদন মনে করে।
এটিই আমাদের নৈতিক বাস্তুসংস্থানের প্রশ্ন। ক্ষমতাবানের অপরাধের সামনে অসহায় যে মানুষ, সে দুর্বল সন্দেহভাজনকে ঘিরে হঠাৎ বিচারকের শক্তি অনুভব করতে পারে। জনতা তাকে সংখ্যা দেয়, শত্রু দেয়, শাস্তি দেওয়ার অনুভূতি দেয়। এটি একটি সম্ভাব্য সামাজিক ব্যাখ্যা; প্রতিটি হামলাকারীর উদ্দেশ্যের নিশ্চিত বর্ণনা নয়।
‘মব ইন্ডাস্ট্রি’ বলতে প্রতিটি হামলার পেছনে এক পরিচালক বা টাকার লেনদেন বুঝি না। অভিযোগ তৈরি, প্রচার, অবস্থান জানানো, মানুষ ডাকা, হামলা, ভিডিও ছড়ানো, পরে অপরাধের সাফাই— এ কাজগুলো যখন বারবার একই সহিংস পরিণতির দিকে যায়, তখন একটি ব্যবস্থা দেখা যায়। কেউ নৈতিক কর্তৃত্ব অর্জন করে, কেউ অনুসারী বাড়ায়, কেউ স্থানীয় প্রভাব দেখায়। তবে কার লাভ কী ছিল, তদন্ত ছাড়া বলা যায় না।
এখানে নৈতিক কর্তৃত্বের আরেকটি বাজারও আছে। কাউকে ধর্ম, জননিরাপত্তা কিংবা রাজনৈতিক ন্যায়ের শত্রু বলে প্রচার করলে অভিযোগকারী নিজেকে রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে পারে। তার দর্শক ও অনুসারী বাড়তে পারে। কিন্তু ধর্ম রক্ষা, সম্পত্তি উদ্ধার বা রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের কোনো দাবি একজনকে আঘাত করার ব্যক্তিগত অধিকার দেয় না।
সাতক্ষীরায় অডিও ও ফেসবুকের ভূমিকা তদন্তযোগ্য; রংপুরে মাইকই যথেষ্ট। তাই মবের প্রযুক্তি শুধু ডিজিটাল নয়। পাড়া, ধর্মীয় পরিচয়, স্থানীয় সম্পর্ক এবং মোবাইল পর্দা একসঙ্গে কিংবা আলাদাভাবে কাজ করতে পারে। জুলাইয়ের গণপ্রতিরোধে ব্যবহৃত জমায়েত, ঘেরাও ও দ্রুত যোগাযোগকে কেউ প্রতিশোধের কাজে লাগালেও গণঅভ্যুত্থানকে মবের সঙ্গে এক করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় হত্যার স্মৃতি নতুন বিচারহীন হত্যার লাইসেন্স নয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারি-সেপ্টেম্বরে মব সহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ৪০, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ১৭১, এইচআরএসএসের হিসাবে ১৮৭। সংজ্ঞা ও গণনার পার্থক্য ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ২৫ অক্টোবরের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মব সহিংসতার কোনো মামলাই তখন পর্যন্ত বিচারপর্বে পৌঁছায়নি। এমন বিচারের শূন্যতায় নতুন সহিংসতার ঝুঁকি কমবে কীভাবে?
শুধু শেষ আঘাতকারী নয়; কে উসকানি দিল, লোক জড়ো করল, আক্রমণে সহায়তা করল, কে দায়িত্বে থেকেও রক্ষা করল না— প্রমাণের ভিত্তিতে সবার ভূমিকা তদন্ত চাই। পোস্ট শেয়ার করা বা ঘটনাস্থলে থাকা মাত্রই হত্যার দায় নয়। একইভাবে অপরাধ ও মব ঠেকানোর নামে ক্রসফায়ারও সমাধান নয়।
একরামুলের মেয়ে বাবার কান্না শুনেছিল। মবের শিকার মানুষগুলোরও পরিবার আছে। রাষ্ট্র যদি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ভাষায় একজনের কান্না মুছে দিতে চায়, আর জনতা ‘চোর’ বলে আরেকজনের কান্না অগ্রাহ্য করে, তবে হত্যার পর গল্প আলাদা হলেও নৃশংসতার অনুমতিটি থেকে যায়।
কাউকে হত্যাযোগ্য করার অধিকার রাষ্ট্রেরও নেই, জনতারও নেই।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়




