ইসলামে বাজারদর্শন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাজারে পণ্যের দাম হ্রাস-বৃদ্ধি অর্থনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা। উৎপাদন ব্যয়, পরিবহন খরচ, আমদানি ব্যয়, সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনের কারণে পণ্যের মূল্য বাড়তে-কমতে পারে। এমন স্বাভাবিক বাজারগত পরিবর্তনকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেনি; বরং ব্যবসা-বাণিজ্য ও বৈধ মুনাফাকে ইসলাম স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনকে পুঁজি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি, পণ্য মজুদ করে রাখা, প্রতারণামূলক বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়ানো ইসলামের ন্যায়ভিত্তিক বাজারনীতির পরিপন্থী।
পবিত্র কোরআনে ব্যবসায়িক লেনদেনে পারস্পরিক সম্মতি ও ন্যায়নীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯) আয়াতটিতে ব্যবসাকে বৈধ ঘোষণা করার পাশাপাশি অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে একবার পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সাহাবিরা তাঁর কাছে বাজারদর নির্ধারণের আবেদন করেছিলেন। তিনি বললেন, ‘আল্লাহই মূল্যের গতি নির্ধারণকারী, তিনিই তা কমান ও বৃদ্ধি করেন এবং একমাত্র তিনিই রিজিকদাতা। আমি এই আশা করি যে, আমি আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করব যেন আমার ওপর কারও জীবন বা সম্পদের ওপর জুলুম করার কোনো অভিযোগ না থাকে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৫১) এ হাদিসের আলোকে ইসলামি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থায় কৃত্রিমভাবে মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়া সবসময় ন্যায়সংগত নয়। চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে দাম ওঠানামা করতে পারে। কিন্তু এই হাদিসকে ব্যবসায়ীর জন্য ইচ্ছামতো দাম বাড়ানোর অনুমতিপত্র হিসেবেও দেখা যাবে না। কারণ, ইসলাম একই সঙ্গে প্রতারণা, মজুদদারি, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণও নিষিদ্ধ করেছে।
ইসলামে বাজারদর্শনের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি ব্যবসা ও মুনাফার বিরোধিতা না করে মুনাফাকে নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। ব্যবসায়ী লাভ করবেন কিন্তু প্রতারণা করবেন না
ইসলামি ফিকহে ‘ইহতিকার’ বা মজুদদারি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মজুদদারি করে, সে পাপী।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫) তবে সাধারণ ব্যবসায়িক মজুদ ও কৃত্রিম সংকট তৈরির উদ্দেশ্যে পণ্য আটকে রাখার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একজন ব্যবসায়ী ভবিষ্যতে বিক্রির জন্য পণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন। কিন্তু কোনো প্রয়োজনীয় পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে রেখে সংকট তৈরি করা এবং পরে বেশি দামে বিক্রি করা ইসলামের ন্যায়নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মূল্যবৃদ্ধির কারসাজি শুধু পণ্য গুদামজাত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কখনো পণ্যের প্রকৃত মান গোপন করা হয়, কখনো নিম্নমানের পণ্যকে উন্নতমানের বলে বিক্রি করা হয়; আবার কখনো বাজারে পণ্যের ঘাটতি বা মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরি করা হয়। এসব আচরণও ইসলামের ব্যবসায়িক নৈতিকতার পরিপন্থী। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়।’ (সুরা মুতাফফিফিন, আয়াত: ১) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ধোঁকা দেয়, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, ১০২) অর্থাৎ ব্যবসায় সততা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়, এটি ইসলামি লেনদেনের মৌলিক শর্তগুলোর অন্যতম।
আধুনিক বাজারব্যবস্থাতেও পণ্যের ত্রুটি গোপন, ভুল তথ্য প্রদান, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা মানুষের প্রয়োজনের সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিক দাম নির্ধারণ ইসলামি নৈতিকতার পরিপন্থী। ইসলাম ব্যবসায়ীর মুনাফার নির্দিষ্ট কোনো শতাংশ বেঁধে দেয়নি; বৈধ উপায়ে অর্জিত মুনাফা, তা তুলনামূলক বেশি হলেও বৈধ। তবে প্রতারণা, মজুদদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও জুলুমের মাধ্যমে অর্জিত মুনাফা গ্রহণযোগ্য নয়। ইবনে তাইমিয়্যা (রহ.) স্বাভাবিক বাজারে চাহিদা-সরবরাহের প্রভাবকে স্বীকার করলেও অন্যায়ভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ বা মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে জনস্বার্থে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের কথা তুলে ধরেছেন। (আল-হিসবাহ ফিল ইসলাম; মাজমুউল ফাতাওয়া) অর্থাৎ ইসলামে বাজারের স্বাধীনতা আছে, তবে তা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করার স্বাধীনতা নয়।
এ কারণেই ইসলামি ইতিহাসে বাজার তদারকির একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছিল, যা ‘হিসবা’ নামে পরিচিত ছিল। বাজারে মাপ-তোলা ঠিক রাখা, পণ্যের মান পর্যবেক্ষণ, প্রতারণা রোধ এবং ব্যবসায়িক অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ ছিল এর অন্যতম দায়িত্ব। এতে প্রমাণিত হয়, ইসলাম শুধু ব্যবসায়ীকে নৈতিক হওয়ার আহ্বান জানায়নি; বাজারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকেও গুরুত্ব দিয়েছে।
বর্তমান সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ইসলামের এই নীতিগুলোর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কোনো পণ্যের উৎপাদন বা আমদানি ব্যয় বেড়ে গেলে তার দাম বাড়তে পারে। সরবরাহ কমে গেলে বা চাহিদা বেড়ে গেলেও দাম বাড়তে পারে। এসব স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। কিন্তু পণ্য গুদামে আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা, কয়েকজন মিলে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা, গুজব ছড়িয়ে ক্রেতাদের আতঙ্কিত করা কিংবা মানুষের জরুরি প্রয়োজনকে কাজে লাগিয়ে অস্বাভাবিক মুনাফা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এটি বাজারের স্বাভাবিক নিয়মের বিকৃতির পাশাপাশি মানুষের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করার মতো অপরাধও।
এর দায় শুধু ব্যবসায়ীর নয়; এখানে রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে বাজারে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার। মজুদদারি, প্রতারণা, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি না থাকলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নেয়। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। তারা গুজবে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুদ করবেন না। অপ্রয়োজনীয় চাহিদা তৈরি করে বাজারে সংকট বাড়াবেন না। মূলত একটি ন্যায়সংগত বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় ব্যবসায়ী, রাষ্ট্র ও ভোক্তা— সবার দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন।
ইসলামে বাজারদর্শনের সৌন্দর্য এখানেই যে, এটি ব্যবসা ও মুনাফার বিরোধিতা না করে মুনাফাকে নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। ব্যবসায়ী লাভ করবেন, কিন্তু প্রতারণা করবেন না। পণ্য মজুদ করবেন, কিন্তু কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করবেন না। দাম নির্ধারণ করবেন, কিন্তু মানুষের দুরবস্থাকে পুঁজি করবেন না। রাষ্ট্র বাজারে হস্তক্ষেপ করবে, কিন্তু স্বাভাবিক বাণিজ্যের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করবে না। আর ভোক্তাও নিজের প্রয়োজনের বাইরে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করবেন না।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



