ঈদের খুশি, বিষাদের ছায়া

দুদিন পরেই কোরবানির ঈদ। ঈদ মানে আনন্দ, উৎসব, পরিবার ও সমাজের মিলনমেলা। এ উৎসবে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি নতুন জামা, সুস্বাদু খাবার আর সামাজিক সম্প্রীতির নানা আয়োজন থাকে। কিন্তু এবারের ঈদের আকাশে খুশির রঙ কেমন যেন ম্লান। আনন্দের স্রোতে মিশে আছে গভীর বিষাদ। হাসপাতালের বেডে শ্বাসকষ্টে কাতর শিশুরা আর একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি— সব মিলিয়ে ভারাক্রান্ত চারদিক।
কোরবানির ঈদ ইসলামের অন্যতম বড় উৎসব। কোরবানির মাধ্যমে এই ঈদ আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ ও ত্যাগের শিক্ষা দেয়। ধনী-গরিব সবাই একসঙ্গে নামাজ পড়ে, পশু কোরবানি করে মাংস বিতরণ করে। কিন্তু যখন দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শত শত শিশু মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছে, তখন এ উৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পায় না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, চলতি বছর মার্চ থেকে শুরু হওয়া হাম এরই মধ্যে পাঁচশর বেশি শিশুর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। সন্দেহভাজন কেসও ৬০ হাজার ছাড়িয়েছে। অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু পাঁচ বছরের নিচে। অনেকে টিকা না পাওয়ায় বা অসম্পূর্ণ টিকায় এ ভাইরাসের শিকার হয়েছে।
হাসপাতালের করিডরে মায়েদের আর্তনাদ, শিশুদের বিষাদমাখা চোখে দৃশ্য কোনো সচেতন নাগরিককে স্পর্শ না করে পারে না। হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। টিকার মাধ্যমে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু টিকা সরবরাহে ঘাটতি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এ সংকটকে আরও গভীর করেছে। সরকার জরুরি টিকা অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু এখনো অনেক দূরে যেতে হবে। এ ঈদে যখন আমরা নতুন পোশাক পরে উৎসব করব, তখন অনেক মা-বাবা হাসপাতালের বেঞ্চে বসে সন্তানের জীবনের জন্য প্রার্থনা করবেন। এ বৈপরীত্য আমাদের বিবেক নাড়া দেয়।
আরও একটি ঘটনা দেশবাসীর মন বিষিয়ে তুলেছে। ছোট্ট শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড। ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা— এমন ঘটনা শুনলে শরীর শিউরে ওঠে। শিশু নির্যাতন ও নারী নির্যাতনের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়, কিন্তু প্রতিটি ঘটনা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতা তুলে ধরে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি, আইনের ধীরগতি এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব এ ধরনের অপরাধকে উৎসাহিত করে। রামিসা-রাইসার মতো অসংখ্য শিশু আমাদের সমাজে নিরাপদ নয়। এই ঈদে আমাদের উচিত শুধু আনন্দ করা নয়, বরং এসব অসহায় শিশুর কথা স্মরণ করে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়া।
উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের প্রত্যেক মানুষ সেই আনন্দে অংশ নিতে পারে
ঈদের আসল শিক্ষা হলো ত্যাগ, সহানুভূতি ও সাম্য। কোরবানি শুধু পশু জবাই নয়; নিজের অহংকার ও স্বার্থকে জবাই করারও প্রতীক। যারা সামর্থ্যবান, তাদের উচিত দরিদ্র ও অসুস্থদের পাশে দাঁড়ানো। সরকারের উচিত, হাম প্রতিরোধে জাতীয় অভিযান আরও জোরদার করা, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো। একই সঙ্গে শিশু নিরাপত্তা আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে।
ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মসজিদের ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সচেতন ব্যক্তিরা যদি শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করেন, তাহলে অনেক সংকট প্রতিরোধ করা সম্ভব। ঈদের জামাতে যেমন লাখো মানুষ একত্র হয়, তেমনি এ মিলনমেলাকে সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা, অসুস্থদের পাশে দাঁড়ানো এবং সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান নেওয়া আজ সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, উৎসবের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের প্রত্যেক মানুষ সেই আনন্দে অংশ নিতে পারে। যে পরিবার হাসপাতালের বেডের পাশে ঈদের দিন কাটাবে, যে মা সন্তান হারিয়ে শোকে নিস্তব্ধ কিংবা যে শিশুটি ভয়ের মধ্যে বেড়ে উঠছে— তাদের বেদনা আমাদের সামষ্টিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন তোলে। তাই কোরবানির প্রকৃত চেতনাকে ধারণ করে আমাদের উচিত মানবিক সমাজ গঠনে আরও আন্তরিক হওয়া। এই ঈদ শুধু উৎসবের নয়, আত্মসমালোচনা ও মানবিক দায়বোধ জাগ্রত করারও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠুক।
পাশাপাশি পরিবার থেকেই শিশুদের নিরাপত্তা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা শুরু হওয়া জরুরি। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে কিংবা কী ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে— সেদিকে অভিভাবকদের আরও মনোযোগী হতে হবে। প্রযুক্তির এ সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও নানা নেতিবাচক প্রভাব থেকেও শিশুদের সুরক্ষিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার— এ তিনটি স্তম্ভ একসঙ্গে কাজ করলেই শুধু শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব। ঈদের আনন্দের মধ্যেও তাই আমাদের প্রত্যেকের অন্তরে জাগ্রত হোক দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও মানবিকতা। কারণ, একটি নিরাপদ, সুস্থ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মুখে প্রকৃত হাসি ফিরিয়ে আনতে। ঈদ মোবারক।
লেখক: উপসম্পাদক, আগামীর সময়






