প্রবাসীদের মুদ্রা পাঠানোর ক্ষেত্র প্রসারিত করুন

প্রতীকী ছবি
গত কয়েক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত—এমনকি মধ্যপ্রাচ্য থেকেও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স এসেছে আমেরিকা থেকে। দেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ এবং ডলার সংকট নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন সরকার ও বর্তমান প্রশাসনকে একদিকে রাজনৈতিক মতভেদ, অন্যদিকে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নানামুখী চাপ সামলে এগোতে হচ্ছে। তদুপরি, আমেরিকার নতুন আরোপিত শুল্কনীতির কারণে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার তৈরি পোশাক রফতানি খাতের ভবিষ্যৎ আজ প্রশ্নের মুখে। আবার ইউএসএআইডির (USAID) অর্থায়ন বন্ধ হওয়ায় বিভিন্ন এনজিও কর্তৃক বাস্তবায়িত মূলধারার অনেক উন্নয়নমূলক কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের এই সংকটময় সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখতে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বজায় রাখতে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এত বছরের বৈদেশিক নির্ভরতা থেকে রাতারাতি মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তাই সংকটের এই দিনে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিদেরই এগিয়ে আসতে হবে, কারণ হুট করে অন্য কোনো বিকল্প তৈরি হবে না।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীরা তাদের হাড়ভাঙা খাটুনির উপার্জিত সব অর্থই দেশে থাকা পরিবার-পরিজনের কাছে পাঠান। অন্যদিকে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া কিংবা উন্নত বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসীদের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। তারা একসময় দেশের বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পড়াশোনা করে, অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠেছেন। ব্যস্ততার মাঝেও তাদের আজ মাতৃভূমির প্রতি সেই দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করা প্রয়োজন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্যও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, বিদেশের মাটিতে আমরা দিনশেষে অভিবাসীই। তাই আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য প্রবাসীদের অবদান রাখার পথ সুগম করতে হবে।
বাস্তবতা হলো, দেশের প্রতিটি সরকারই প্রবাসীদের বেশি বেশি ডলার বা রেমিট্যান্স পাঠানোর অনুরোধ জানায়। কিন্তু প্রবাসীদের একটি বিশাল অংশ চাইলেও যে সহজে অর্থ পাঠাতে পারেন না—সেই প্রশাসনিক জটিলতার খবর অনেকে রাখেন না। বর্তমানে বাংলাদেশে শুধু ব্যক্তিবিশেষের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অথবা এনজিও ব্যুরো নিবন্ধিত কোনো এনজিওর নামে বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো যায়। প্রবাস থেকে সরাসরি কোনো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক কল্যাণে অর্থ পাঠানো প্রায় অসম্ভব। দেশের স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা কিংবা গ্রাম-গঞ্জের সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে সহায়তা করতে প্রবাসীরা সরাসরি ডলার পাঠাতে পারেন না।
কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে রেমিট্যান্স পেতে হলে এনজিও রেজিস্ট্রেশন করতে বলা হয়। কিন্তু এনএসআই (NSI) ও এনজিও ব্যুরোর জটিল আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিবন্ধন নেওয়া কতটা কঠিন, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। করোনাকালের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা এখানে তুলে ধরা যাক। সিলেট কিডনি হাসপাতালের উদ্যোগে আমরা সিলেট সংলগ্ন দুটি সরকারি হাসপাতালে (খাদিমপাড়া ও দক্ষিণ সুরমা) নিজস্ব খরচে দুটি কোভিড আইসোলেশন সেন্টার চালু করেছিলাম। নিজস্ব অর্থায়নে অক্সিজেন, ওষুধ, বেড, খাবার সরবরাহের পাশাপাশি ৪৫ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে সাধারণ হাসপাতালগুলোতে কোভিড চিকিৎসা শুরু হলে ৬ মাস পর আমরা কেন্দ্র দুটি বন্ধ করি। সম্পূর্ণ সরকারি অনুদানহীন এই সামাজিক উদ্যোগে যখন নিউইয়র্ক থেকে আমার বন্ধু ফার্মাসিস্ট লিয়াকত ৫০ হাজার ডলার অনুদান দিতে চাইল, তখন বাধা হয়ে দাঁড়াল নিবন্ধন। যেহেতু কিডনি ফাউন্ডেশন এনজিও ব্যুরোভুক্ত ছিল না, তাই ব্যাংক থেকে সেই অনুদানের অর্থ গ্রহণ করা যায়নি। টানা আট বছর চ্যারিটি হাসপাতাল হিসেবে সেবা দিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রতিষ্ঠানটি আজও এনজিওভুক্ত হতে পারেনি। ফলে দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে ডায়ালিসিস দেওয়ার জন্য আজ পর্যন্ত বিদেশ থেকে সরাসরি হাসপাতালের অ্যাকাউন্টে অনুদান পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। একইভাবে, আমার বন্ধু শিহাব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের উন্নয়নের জন্য কোনো অর্থ পাঠাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং অর্থ উপদেষ্টার কাছে আমার আকুল আবেদন—প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর ক্ষেত্র প্রসারিত করুন। শুধু ব্যক্তি বা নিবন্ধিত এনজিও নয়; সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত সামাজিক সংগঠন, স্কুল, কলেজ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিভিন্ন চ্যারিটিকে প্রবাস থেকে সরাসরি অনুদান বা রেমিট্যান্স গ্রহণের অনুমোদন দিন। তাদের আইনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় এনে প্রক্রিয়াটি সহজ করুন
দেশের সংকটকালে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি বা অবকাঠামো সংস্কারের মতো যেকোনো উন্নয়নমূলক কাজে ব্যাংক বা মানি এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর পথ উন্মুক্ত করা উচিত। বর্তমানে অনেকে হয়তো ব্যক্তিউদ্যোগে আত্মীয়দের সাহায্য করেন, ঘরবাড়ি বানান বা যাকাত ও দান-ছদকা পাঠান। কিন্তু তারা যদি দেশের বিভিন্ন বিপদাপন্ন প্রজেক্ট বা স্থানীয় সামাজিক সংস্থায় সরাসরি অর্থ পাঠাতে পারতেন, তবে দেশে একটি নীরব সামাজিক বিপ্লব ঘটে যেত। এনজিও ব্যুরোর জটিলতা ছাড়া প্রবাসীরা যাতে সরাসরি নিজেদের এলাকার স্কুল, স্থানীয় চ্যারিটি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাঠাতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক, এনজিও ব্যুরো এবং এনএসআই-এর অনর্থক বাধা ও হয়রানি দূর করাই হওয়া উচিত সরকারের দায়িত্ব। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসীরা যদি বছরে গড়ে অন্তত ২০০ ডলার করেও দেশের এসব সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রকল্পে পাঠাতে পারেন, তবে বহু ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
গত চার বছর ধরে মূলধারার ‘গ্রেটার নিউ ইয়র্ক চেম্বার অব কমার্স’-এর সাথে যৌথভাবে ‘বাংলাদেশ-ইউএসএ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ’ বড় পরিসরে ট্রেড ফেয়ার ও রেমিট্যান্স ফেয়ার আয়োজন করে আসছে। এই যৌথ উদ্যোগের ফলে আমরা মার্কিন মূলধারার ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি। বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে এই চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রবাসী বাংলাদেশি-আমেরিকানদের আরও উৎসাহিত করতে আমরা বিভিন্ন পেশাজীবীদের নিয়ে জুম সভা করেছি। তথ্যপ্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যালস, চিকিৎসা ও গবেষণা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রস্তাবনা তৈরি করে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠালও সরকারি সদিচ্ছার অভাবে অনেকে হতাশ হয়েছেন।
গত বছরের রেমিট্যান্স ফেয়ারে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘স্মল বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এর প্রধান ক্যাথি লোফলার প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আমেরিকা ছাড়াও যুক্তরাজ্য, ইতালি, পোল্যান্ড ও কানাডার প্রবাসী বিজনেস চেম্বারের নেতারা অংশ নেন। এছাড়া কোরিয়ান, দক্ষিণ আমেরিকান ও নেপালি-আমেরিকান চেম্বার অব কমার্সের মতো বিভিন্ন এথনিক চেম্বারও আমাদের জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এমনকি আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ডিজাইনার গ্লোরিয়া স্টার্কও বাংলাদেশের ফ্যাশনকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে আগ্রহ দেখিয়েছেন।
এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং অর্থ উপদেষ্টার কাছে আমার আকুল আবেদন—প্রবাসীদের বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানোর ক্ষেত্র প্রসারিত করুন। শুধু ব্যক্তি বা নিবন্ধিত এনজিও নয়; সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত সামাজিক সংগঠন, স্কুল, কলেজ, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, পরিবেশবাদী সংগঠন ও বিভিন্ন চ্যারিটিকে প্রবাস থেকে সরাসরি অনুদান বা রেমিট্যান্স গ্রহণের অনুমোদন দিন। তাদের আইনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় এনে প্রক্রিয়াটি সহজ করুন।
দুর্ভাগ্যবশত, বাংলাদেশের মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত বা সরকারি কর্মকর্তারা প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। অথচ উন্নত বিশ্বে এই প্রবাসীদের প্রভাব ও যোগ্যতা অনেক বেশি। করোনাকালের একটি ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে—তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিউইয়র্কে এসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, আমেরিকা আমাদের কোনো ভ্যাকসিন দেবে না। কিন্তু তার মাত্র সাত দিনের মাথায় আমেরিকা বাংলাদেশকে ৫ মিলিয়ন ডোজ কোভিড ভ্যাকসিন প্রদান করে। এটি সম্ভব হয়েছিল প্রবাসী বাংলাদেশি-আমেরিকানদের নিরলস কূটনৈতিক যোগাযোগের ফলে।
আমরা নেভাডার বিখ্যাত কার্ডিওলজিস্ট ডা. চৌধুরী হাফিজ আহসানের সাথে যোগাযোগ করেছিলাম। তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের ঘনিষ্ঠ হাফিজের রোগী ছিলেন নেভাডার প্রভাবশালী সিনেটর। কমলা হ্যারিস হোয়াইট হাউসের কোভিড টিমে হাফিজকে অন্তর্ভুক্ত করলে, তিনি যুক্তির মাধ্যমে তাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে বাংলাদেশের হাসপাতাল ব্যবস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং সেখানে ভ্যাকসিন না পৌঁছালে কোটি কোটি মানুষ ঝুঁকিতে পড়বে। যেখানে আমেরিকা সেসময় ইউরোপের অনেক দেশ বা ভারতকেও ভ্যাকসিন দেয়নি, সেখানে ডা. চৌধুরী হাফিজের অনুরোধে বাংলাদেশে দ্রুত ভ্যাকসিন পৌঁছেছিল।
আমেরিকাসহ উন্নত বিশ্বের মূলধারায় অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি নিজ নিজ মেধা ও যোগ্যতায় অত্যন্ত সম্মানিত অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশের রাজনীতি ও স্বজনপ্রীতির ঊর্ধ্বে উঠে যদি তাদের এই অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে সম্মানের সাথে দেশের কাজে যুক্ত করা যায়, তবে বাংলাদেশই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে। প্রবাসীদের যেকোনো ভালো উদ্যোগকে সম্মান জানানো, দেশের ব্যাংক ও প্রশাসনিক সংস্থাকে সঠিক নির্দেশনা দেওয়া এবং দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আজকের এই যুগসন্ধিক্ষণে আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে বাংলাদেশকে এক নতুন ভোরের দিকে নিয়ে যেতে।
লেখক: কনভেনর, রেমিট্যান্স ফেয়ার; এবং সভাপতি,
বাংলাদেশ-ইউএসএ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ।




