পালাব কোথায়

শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড— গুণীজনরা বলে গেছেন সেই কবেই। আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে গত কয় বছরে যা হয়েছে, তা গিনেস বুক রেকর্ডসে ঠাঁই পাওয়ার মতো।
স্যার গ্যারি সোবার্সের দু হাতে যে দুটো বাড়তি আঙুল ছিল, তা আমরা অনেকেই জানতাম না। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই ব্যাটসম্যান সেই আঙুল দুটো নাকি নিজেই কেটে ফেলেছিলেন, ছুরি দিয়ে।
নিজের হাতের আঙুল নিজ হাতে কেটে ফেলা খুব সাহসের ব্যাপার— আমরা এটা জানতাম, জানি এখনো!
আমরা কি এটা জানতাম, ফায়ার সার্ভিসের মো. সাদিক মারা যাবেন পানিতে ডুবে! যিনি কি না সেরা ডুবুরি হিসেবে জীবন বাঁচানোর দক্ষতার জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছিলেন গত বছর।
দক্ষ একজন ডুবুরি মারা যাবেন পানিতে ডুবে, এটা মানা যায় না, বিশ্বাসও হয় না।
কিন্তু জন্মানোর পর একজন মানুষ মারা যাবেন, যেতে পারেন অনেকভাবেই— আমরা এটা জানতাম, জানি এখনো।
৭০ টাকার মরিচ ঢাকায় এসে ২০০ টাকা! এ রকম আরও হয়েছে, আগে; তারও আগে। কুড়িগ্রাম, রাজশাহী রংপুর, বগুড়া থেকে কম দামে আসা বেগুন, টমেটো, পেঁয়াজ, আলু, পটোলের দাম হয়ে যায় কয়েক গুণ। আমরা এটা জানতাম, জানি। আমরা তো এ-ও জানি— পুরো রাস্তার কয়েক জায়গায় বখরা দিতে হয় ক্ষমতাসীন গৃহপালিতদের, মেজাজ ঠান্ডা রাখতে হয় কাঁধে বন্দুক রাখা আমাদের ট্যাক্সের টাকায় বেঁচে থাকা পাহারাদারদের, তারপর ঢাকায় আরও কয়েকবার হাতবদল!
রূপকথার গল্পের মতো তারপর সব। ব্যাংক ব্যালেন্স বেড়ে যায় মধ্যস্বত্বভোগীর, পকেট শূন্য হয় সাধারণের। এভাবে চলছে, চলবে অনন্তকাল— আমরা এটা জানতাম, জানি এখনো।
শিক্ষাই জাতীর মেরুদণ্ড— গুণীজনরা বলে গেছেন সেই কবেই। আমাদের দেশে শিক্ষা নিয়ে গত কয় বছরে যা হয়েছে, তা গিনেস বুক রেকর্ডসে ঠাঁই পাওয়ার মতো। এত নিয়ম, এত নিয়ম বদল, ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত, সিদ্ধান্তের অপমৃত্যু, পৃথিবীর আর কোনো দেশ দেখেনি এমন। আমাদের দেশে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়, নকলের মহোৎসব হয়, ভুল হয় প্রশ্নে, আরও কত কী! কাদের মাথায় এসব আসে, কারা এই শিক্ষাব্যবস্থা চালায়, তা রহস্যই রয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত!
তাই বলে একজন শিক্ষক দিয়ে একটি স্কুল চালানো! তা-ও চলে আসছে ছয় মাস ধরে! জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম নাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৃশ্য এটা। কারণ এখানে পাঠদানের জন্য কোনো শিক্ষক পাওয়া যায় না।
শুধু শিক্ষক নয়, একটা শিক্ষাব্যবস্থা চালানোর জন্য প্রকৃত মানুষ নেই আমাদের দেশে। শুধু আছে বাণী দেওয়ার মানুষ। ‘প্রাথমিক শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থেই জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।’ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, ‘এ রকম সবাই বলে যাবেন, বলতে থাকবেন; কিন্তু একটা প্রকৃত শিক্ষাব্যবস্থা দাঁড়াবে না আমাদের দেশে, যেমনটা দাঁড়ায়নি গত ৫৫ বছরেও— এটা আমরা জানতাম, জানি এখনো।’
চমৎকার একটা তালিকা করতে পারি আমরা এ মুহূর্তে, এখনই— গত চার যুগে যেসব সরকারি কর্মকর্তা বিদেশে গিয়েছেন, কোন কোন কারণে গিয়েছেন? এ কারণের তালিকা দেখে প্রথমে একপ্রস্ত হাসি আসবে আমাদের। বিদেশ থেকে অভিজ্ঞতা(!) নিয়ে এসে একেকজন দেশের কী কী উদ্ধার করছেন, তা দেখে হাসি আসবে আরেকবার। ব্যাপারটা আমরা শুধু আম পাবলিকরা জানি, তা নয়; যারা বসে আছেন আমাদের মাথার ওপর, জানেন তারাও। নির্লজ্জতার এই নাটক মঞ্চস্থ করতে করতে এই কয়দিন আগেও বিদেশে যেতে চেয়েছেন ১৪০ কর্মকর্তা! কীসের জন্য জানেন? জনসংখ্যার রিপোর্ট লেখা শিখতে। খরচ হবে ৩ কোটি টাকা! হায়, মরণ। অর্থনৈতিক মন্দার এ জটিল সময়ে এসব কর্মকর্তার কী অবিবেচক, বিবেকহীন চাওয়া!



