বাবার কান্না, বিচারের প্রশ্ন আর একটি নিথর শৈশব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আট বছর বয়সটা কেমন হয়? রঙিন স্বপ্নের, দুরন্ত ছোটাছুটির, মায়ের আঁচল ধরে টানাটানির বয়স। সেই বয়সে রামিসা প্রতিদিন নিজের বাসার চত্বরেই খেলত। পরিচিত পরিবেশ, পরিচিত মুখ, নিরাপদ জায়গা। কিন্তু সেই চেনা জায়গাতেই সেদিন তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক ভয়াবহ পরিণতি।
প্রতিবেশী সোহেল রানা কৌশলে ছোট্ট রামিসাকে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যান। নেশার ঘোরে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। ব্যর্থ হয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন নিষ্পাপ সেই শিশুকে। তারপর মরদেহ গুম করতে স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে নিয়ে মরদেহ টুকরো করতেও শুরু করেন। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এই ভয়াল ঘটনার কথা নিজেরাই জানিয়েছেন গ্রেপ্তার সোহেল ও স্বপ্না।
কথাগুলো লিখতে হাত কাঁপে। পড়তে গেলে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে ওঠে। যে শিশুটার সারাদিন কাটার কথা ছিল রঙপেন্সিল আর খাতা নিয়ে, যার স্বপ্ন ছিল হয়তো শিক্ষক হওয়ার, কিংবা নার্স। সে শিশুর জীবন শেষ হয়ে গেল এভাবে। এত নিষ্ঠুরভাবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সংবাদমাধ্যম, সর্বত্র এখন রামিসার জন্য শোকের ঢেউ। মানুষ ক্ষোভে ফুঁসছেন, বিচার চাইছেন, ন্যায়বিচারের দাবিতে সরব হচ্ছেন। প্রতিবাদের ভাষায় ভরে উঠছে স্ট্যাটাসের পর স্ট্যাটাস। কিন্তু এই শোক আর ক্ষোভের ভিড়ে একটি কণ্ঠ আলাদাভাবে কানে বাজে, বুকের গভীরে গিয়ে ধাক্কা দেয়। সেটি রামিসার বাবার কণ্ঠ।
মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানে বুধবার মেয়েকে দাফন করেছেন আবদুল হান্নান মোল্লা। বয়স পঞ্চান্ন। জীবনে অনেক কিছু দেখেছেন। কিন্তু নিজের আদরের মেয়েকে এভাবে হারানোর কোনো প্রস্তুতি তাঁর ছিল না, থাকার কথাও নয়। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে বিচার প্রসঙ্গ উঠতেই হাউমাউ করে কেঁদে বলে উঠলেন, আপনারা বিচার করতে পারবেন? পারবেন না। আপনারা কোনো দৃষ্টান্ত দাঁড় করাতে পারবেন? পারবেন না।
একজন বাবার এই কান্না ব্যক্তিগত শোকের প্রকাশ নয়। এটি বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা হতাশার বিস্ফোরণ। এটি একটি ভাঙা মানুষের চিৎকার, যাঁর ভেতরের বিশ্বাসটুকুও আর অবশিষ্ট নেই। তিনি জানেন, এই ঘটনার উত্তাপ বড়জোর পনেরো দিন থাকবে। এরপর আরও কোনো বড় ঘটনা আসবে, মিডিয়ার ক্যামেরা সরে যাবে আর রামিসার কথা চাপা পড়ে যাবে।
তাঁর কথায় মিথ্যা নেই। দেশে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নতুন নয়। প্রতিবারই গণমাধ্যমে ঝড় ওঠে, মানুষ রাস্তায় নামে, বিচারের দাবি ওঠে। তারপর আস্তে আস্তে সব স্তিমিত হয়ে পড়ে। মামলা চলে দীর্ঘসূত্রে, রায় হয় বছরের পর বছর পর, অথবা হয়ই না। এই বাস্তবতা দেখতে দেখতে একজন সাধারণ মানুষ যখন বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন, তখন তাঁকে দোষ দেওয়া যায় না।
রামিসার বাবা বিচার চান না, কারণ তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না যে বিচার হবে। এই না-চাওয়াটাই আসলে সবচেয়ে বড় অভিযোগ। একজন বাবা যখন নিজের সন্তানের হত্যার বিচার চাওয়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলেন, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজের কোথাও কিছু একটা গভীরভাবে ভেঙে পড়েছে।
ছোট্ট রামিসা আর নেই। মাটির নিচে চিরঘুমে আছে সে। হয়তো এখন আর কোনো ভয় নেই তার, কোনো কষ্ট নেই। কিন্তু যাঁরা তাকে ভালোবাসতেন, যিনি তার জন্য প্রতিদিন ভাত রাঁধতেন, যিনি তাকে কাঁধে তুলে স্কুলে নিয়ে যেতেন, তাঁদের কষ্ট কোথাও যাচ্ছে না। প্রতিটি ভোর তাঁদের মনে করিয়ে দেবে একটি হাসিমাখা মুখ, যা আর কোনো দিন দেখা যাবে না।
তার বাবার প্রশ্নগুলো রয়ে গেছে শূন্যে ভাসমান, উত্তরহীন। সেই প্রশ্নগুলোর জবাব দেওয়ার দায় শুধু আদালতের নয়। সেই দায় আমাদের, এই সমাজের, এই রাষ্ট্রের। রামিসার জন্য বিচার নিশ্চিত করা মানে একটি বার্তা পাঠানো যে, এই মাটিতে প্রতিটি শিশুর জীবনের মূল্য আছে। তারা নিরাপদ। সেই বার্তা দিতে আমরা কি পারব?







