নতুন বেতন কাঠামো ও কাঠামোর বাইরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঘোষিত হয়েছে নবম বেতন কমিশন। অষ্টম বেতন কমিশনের প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই অন্তর্বর্তী সরকার ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করে। ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি ওই কমিশন সাবেক প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। তার পর থেকেই শুরু হয় পে-স্কেল সম্পর্কিত আলোচনা। কবে থেকে বাস্তবায়ন হবে এই বেতন কাঠামো, কার কতটুকু বেতন বাড়ল, বেতন কাঠামোর কী বৈষম্য হতে যাচ্ছে, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে তার কী প্রভাব পড়বে সমাজে এবং সরকারি বেতন কাঠামোর বাইরের বাকি শ্রমজীবীদের মজুরি কীভাবে এবং কতদিনে পুনর্বিন্যাস হবে ইত্যাদি বিতর্ক ছড়িয়ে পড়েছে সমাজে।
বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী গত ১১ জুন বাজেট বক্তৃতায় ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন সরকার বলছে, মূল্যস্ফীতি, বাজেটের ওপর চাপ কমানো, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট অর্থনেতিক চাপ সামলে নবম পে-স্কেল দুই বছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে।
বেতন কাঠামো কেমন হবে— সেই আলোচনার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এর জন্য কত টাকা লাগবে। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে একযোগে সব ভাতা কার্যকর হলে বেতন ও ভাতা বাবদ প্রয়োজন হবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। এই বাড়তি টাকা কোথা থেকে আসবে? একমাত্র পথ রাজস্ব আয়। রাজস্ব আয়ের উৎস বেসরকারি খাত ও জনগণ, অর্থাৎ যে জনগণের টাকায় তাদের বেতন-ভাতা প্রদত্ত হয়, সেই জনগণের কী হবে— সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
১৮ কোটি মানুষ, ১২ কোটি ৯১ লাখ ভোটার, ৭ কোটি ৬০ লাখের মতো শ্রমজীবী মানুষ আর বিপুলসংখ্যক কর্মপ্রত্যাশী মানুষের দেশে বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছে। তাদের বেতন-ভাতা, পেনশন ইত্যাদির জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। শতভাগ, অর্থাৎ ওপরের দিকে ১০০ শতাংশ এবং নিচের দিকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে বেতন বৃদ্ধি একটি নিয়মিত বিষয় হওয়ার কথা থাকলেও সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর নবম পে-স্কেল ঘোষণা হলো।
প্রশ্ন উঠছে, বেসরকারি কাজে, কৃষি এবং কলকারখানা ও সেবা খাতে নিয়োজিত যারা, তাদের জীবনের কষ্ট লাঘবের কী হবে? এরা উৎপাদন করে, ভ্যাট-ট্যাক্স দেয় এবং এরাই তো বাজারের প্রধান ক্রেতা
ঘোষিত পে-স্কেল অনুযায়ী, প্রথম গ্রেডের একজন সরকারি চাকরিজীবীর বেতন দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। দ্বিতীয় গ্রেডে মূল বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, তৃতীয় গ্রেডে ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০, চতুর্থ গ্রেডের বেতন ১ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০, পঞ্চম গ্রেডে মূল বেতন ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০, ষষ্ঠ গ্রেডের মূল বেতন ৭১ হাজার থেকে ধাপে ধাপে বেড়ে ১ লাখ ৩৪ হাজার, সপ্তম গ্রেডে ৫৮ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০, অষ্টম গ্রেডে মূল বেতন ৪৬ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ১০ হাজার ৮০০, নবম গ্রেডে ৪৪ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ পাঁচ হাজার ৯০০, দশম গ্রেডের মূল বেতন ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং ১১তম গ্রেডে ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে নবম পে-স্কেলে। এভাবে প্রথম থেকে এগারোতম গ্রেড পর্যন্ত বেতন বাড়ানো হয়েছে ১০০ শতাংশ।
পরবর্তী স্তর হলো নিম্নস্তরের কর্মচারীদের। তাদের বেতন বিভিন্ন গ্রেড থেকে ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। যেভাবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে সে অনুযায়ী ১২তম গ্রেডে ১১৫ শতাংশ, ১৩তম গ্রেডে ১১৮ শতাংশ, ১৪তম গ্রেডে ১৩০ শতাংশ, ১৫ ও ১৬তম গ্রেডে ১৩৫ শতাংশ, ১৭তম গ্রেডে ১৩৮ শতাংশ, ১৮তম গ্রেডে ১৩৯ শতাংশ, ১৯তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ এবং ২০তম গ্রেডে ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি করা হবে। ফলে টাকার অঙ্কে ১২তম গ্রেডে বেতন ২৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার, ১৪তম গ্রেডে ২৩ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৬ হাজার ৮০০, ১৫তম গ্রেডে ২২ হাজার ৮০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫৫ হাজার ২০০, ১৬তম গ্রেডে ২১ হাজার ৯০০ থেকে সর্বোচ্চ ৫২ হাজার ৯০০, ১৭তম গ্রেডে মূল বেতন ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০, ১৮তম গ্রেডে ২১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ৯০০, ১৯তম গ্রেডে ২০ হাজার ৫০০ থেকে সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা আর সরকারি চাকরির সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা হয়েছে নবম পে-স্কেলে। সর্বনিম্ন ২০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মূল বেতনের ওপর যুক্ত হবে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, বিনোদনসহ অন্যান্য ভাতা। ফলে টাকার অঙ্কে মোট বেতন দাঁড়াবে মূল বেতনের প্রায় দ্বিগুণের সমান।
সিদ্ধান্ত হয়েছে, ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং ভাতাগুলো ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও পেনশনধারীর জীবনযাত্রার মান ও বৃদ্ধ বয়সের আর্থিক নিরাপত্তা বিবেচনায় নিয়ে ধাপভিত্তিক পেনশনের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিট পেনশন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, অর্থাৎ যারা মাসে ৯ হাজার টাকা পেতেন, তারা এখন মাসে ১৮ হাজার টাকা পাবেন। যারা মাসিক ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পেনশন পেতেন, তাদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ; ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার ১ টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকা বা তদূর্ধ্ব পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পেনশন বৃদ্ধি পাবে।
শুধু তাই নয়, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের বেতন স্কেল ও সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আলাদা বেতন কাঠামোর অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ফলে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী উপকৃত হবেন।
এই নতুন বেতন কাঠামোর মাধ্যমে সরকার এই স্বীকৃতি দিয়েছে, বর্তমান আয়ে জীবনযাপন কষ্টকর। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, বেসরকারি কাজে, কৃষি এবং কলকারখানা ও সেবা খাতে নিয়োজিত যারা, তাদের জীবনের কষ্ট লাঘবের কী হবে? এরা উৎপাদন করে, ভ্যাট-ট্যাক্স দেয় এবং এরাই তো বাজারের প্রধান ক্রেতা। সরকার ঘোষিত বেতন কাঠামোর বাইরের এই বিপুল শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন যদি না বাড়ে, তবে অসন্তোষের নতুন মাত্রা তৈরি হবে দেশে।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও লেখক






