ভাতঘুম

শিবব্রত বর্মন
ভাতঘুম আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ। কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে, আধুনিক নগর জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিক কোনটা, আমি বলব— ভাতঘুমের বিদায়।
দুপুরে ভরপেট খেয়ে ফ্যানের নিচে ঘণ্টা খানেকের একটি জম্পেশ ঘুমের চেয়ে উপাদেয় আর কী থাকতে পারে পৃথিবীতে! পাওয়ার ন্যাপট্যাপ নয়। ভাতঘুম। আমাদের ১০টা-৫টার অফিস আর ক্যারিয়ারসর্বস্ব প্রতিযোগিতার জীবনে সেই বিলাসিতার সুযোগ কোথায়!
ভাতঘুম নাকি আবহমান বাঙালি জীবনের এক অচ্ছেদ্য অংশ। সমাজ গবেষকরা বললেন, আমাদের কৃষিজীবী সমাজের শ্রমের ধরনের সঙ্গে এর যোগ। ভোর থেকে মাঠে কাজ।
তারপর ভরপেট খেয়ে মাঠেই গাছতলায় একটু ঘুম। জেগে উঠে আবার কাজ।
আমাদের শৈশবে মফস্বল শহরের ধীরগতির জীবনে ভাতঘুম বলে যে একটি আলিশান ব্যাপার ছিল, সেটা বেশ দেখেছি। দুপুরবেলা পুরো শহর থমকে যেত। পথঘাট নিশ্চল, সুনসান। মহল্লার দোকানপাট বন্ধ। গরমের দিন গলিপথে হেঁটে গেলে এ বাড়ি ও বাড়ির খোলা জানালাপথে ভেসে আসত রেডিওর বিজ্ঞাপন তরঙ্গ আর ফ্যান চলার ঘটাং ঘটাং আওয়াজ। খুব গরম পড়লে মা-খালারা মেঝেতে মাদুর পেতে আঁচল বিছিয়ে শুয়ে পড়তেন। বিকালে রোদ পড়ে আসা পর্যন্ত চলত এই আলস্য। এমনকি রাস্তার কুকুর-বিড়ালরাও ঝিমাতে থাকত তখন। এগুলো সবই সেকালের কথা।
আমি ভাতঘুমের বাতিক পেয়েছি পারিবারিকভাবে। আমার বাবা কলেজে শিক্ষকতা করতেন। দুপুরের মধ্যে পাঠদান শেষে বাসায় ফিরে ভাত খেয়ে তাকে নাক ডেকে ঘুম দিতে দেখতাম। আমার নানার ছিল মিষ্টির দোকান। দুপুরে দোকান বন্ধ করে তিনি বাসায় ফিরতেন। ভাত খেয়ে বড় খাটে তিনি যখন কোলবালিশ জড়িয়ে ঘুমাতেন, আমাদের শিশুদের ছুটোছুটি হল্লা করা নিষেধ ছিল।
তার মানে সেকালে লোকে বেশ আয়োজন করেই ভাতঘুম দিত। তবে ভাতঘুমকে একেবারে বাঙালির নিজস্ব আবিষ্কার ভাবার মতো স্বদেশি আমি নই। পৃথিবীর গরম দেশগুলোর নানা সমাজে দুপুরের ঘুম বা বিশ্রামের চল আছে। স্পেন ও লাতিন আমেরিকার জীবনে যেমন ‘সিয়েস্তা’ বহুদিনের পরিচিত ব্যাপার। সেটা যে বাঙালির ভাতঘুমেরই লাতিন সংস্করণ, বেশ বোঝা যায়। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের গল্প-উপন্যাস পড়লে মনে হয়, দুপুর যেন সেখানে দিনের একটি আলাদা ভূগোল। মার্কেসের একটি বিখ্যাত ছোটগল্পের নাম ‘লা সিয়েস্তা দেল মার্তেস’ বা ‘মঙ্গলবারের সিয়েস্তা’। ‘একশ বছরের নিঃসঙ্গতা’ উপন্যাসেও সিয়েস্তার সময়ের অলসতা, ঘুম আর গরমের আবহ বারবার ফিরে আসে। আর ‘কলেরার দিনগুলোয় প্রেম’ উপন্যাসে ডাক্তার হুভেনাল উরবিনো সিয়েস্তার পর বই পড়েন।
অর্থাৎ দুপুরে খেয়ে একটু শুয়ে পড়ার মধ্যে আমরা যতই বাঙালিয়ানা খুঁজে পাই, মানুষ মাত্রেরই এই প্রবণতা কমবেশি আছে। বিশেষ করে যেখানে দুপুর মানেই প্রচণ্ড গরম, সেখানে শরীর নিজেই বলে— ভাই, গড়িয়ে নিই।
শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা কলকারখানা আর অফিস-আদালতের সভ্যতা দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ে ভাতঘুম ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে। আমাদের বঙ্গদেশে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকদের হাত ধরে যখন এই অফিস-সভ্যতার প্রবেশ ঘটে, তখন তার প্রতিক্রিয়া কেমন হয়েছিল, সে ব্যাপারে একটি ধারণা পাওয়া যায়, ১৮৭৩ সালে রাজনারায়ণ বসুর লেখা স্মৃতিচারণায়। তিনি লিখেছেন:
‘এতদ্দেশে ইংরাজি সভ্যতা প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে যে পরিশ্রম অত্যন্ত বৃদ্ধি হইয়াছে, তাহাতে আর সন্দেহ নাই। ইংরাজেরা যেরূপ পরিশ্রম করিতে পারেন, আমরা সেরূপ কখনোই পারি না। কিন্তু ইংরাজেরা চাহেন যে, আমরা তাহাদের ন্যায় পরিশ্রম করি। ইংরাজি পরিশ্রম এদেশে উপযুক্ত নহে।... এখনকার রাজপুরুষেরা যে দশটা হইতে চারিটা পর্যন্ত কর্ম করিবার নিয়ম করিয়াছেন, ইহা এ দেশের পক্ষে কোনোরূপে উপযোগী নহে।’
আমার সন্দেহ, ইংরেজদের অফিস সময় নিয়ে সেকালের বাঙালিদের আপত্তির মূলে ছিল তাদের ভাতঘুম দিতে না পারার মনঃকষ্ট।
আমি ভাতঘুম নিয়ে নস্টালজিক হা-হুতাশ করছি বটে, তবে আমাদের ঘুমের প্যাটার্ন নাকি চিরকালই বদলেছে। ইতিহাসবিদ এ রজার একির্খ এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, প্রাক-শিল্পযুগের ইউরোপে এমনকি রাতের ঘুম আজকের মতো একটানা আট ঘণ্টার ছিল না। মানুষের রাত ভাগ হয়ে থাকত মোটামুটি দুই পর্বে: ‘ফার্স্ট স্লিপ’ এবং ‘সেকেন্ড স্লিপ’। সন্ধ্যার পরপর বেশ কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিয়ে মানুষ মাঝরাতের দিকে জেগে উঠত। তখন কেউ প্রার্থনা করত, কেউ গল্পগুজব করত, কেউ ঘরের কাজ সারত, কেউ বিছানাতেই শুয়ে থাকত। তারপর আবার ঘুম। এবার ‘সেকেন্ড স্লিপ’। এটা চলত ভোর পর্যন্ত।
একির্খের মতে, আধুনিক কালের একটানা রাতের ঘুম আসলে মানুষের চিরন্তন অভ্যাস নয়। কৃত্রিম আলো, শিল্পবিপ্লব এবং বদলে যাওয়া কর্মজীবনের সঙ্গে উনিশ শতকে এই ঘুমের ধরনও বদলাতে শুরু করে।
কথা হলো, বিংশ শতাব্দীতে আমরা দিনের ঘুম তো বিদায় করেছিই, একবিংশ শতকে এসে রাতের ঘুমকেও কমিয়ে এনেছি। এত ঘুমালে ফেসবুক করব কখন আর রিলস দেখব কখন। কখনই বা নেটফ্লিক্স অথবা ডাউনলোড করা সিরিজগুলো বিন্জ ওয়াচ করব।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ যুগে ঘুমের ঘাটতি বিশ্ব জুড়ে এক মহামারীতে পরিণত হয়েছে। এক বিশাল ইনসমনিয়্যাক জনগোষ্ঠী আধোঘুমে আধো জাগরণে জম্বির মতো টলতে টলতে ছুটছে ক্যারিয়ার নামক এক মায়াহরিণের পেছনে।







