শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে ইসলামের নির্দেশনা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শিশু একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, একই সঙ্গে সমাজের আগামী দিনের নির্মাতা। অথচ বাংলাদেশের বহু শিশু নিজের ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক পরিবেশে নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হয়। শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি গালমন্দ, অপমান, ভয় দেখানো, অবহেলা, শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ ও যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনাও প্রতিনিয়ত ঘটছে। যার সবকটিই মারাত্মকভাবে শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কিন্তু ইসলাম শিশুকে শুধু পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, আল্লাহর দেওয়া আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। ফলে তার জীবন, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার অধিকার রক্ষা করা অভিভাবক, সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।
কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬) ইমাম তাবারি (রহ.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় পরিবারের সদস্যদের আল্লাহর আনুগত্যের শিক্ষা দেওয়া এবং গুনাহ থেকে বিরত রাখার দায়িত্বের কথা বলেছেন। (তাফসিরুত তাবারি, ২৩/৪৯১) অর্থাৎ সন্তানের আহার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করাই অভিভাবকত্বের পূর্ণতা নয়; তার চরিত্র, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার প্রতিও যত্নশীল হওয়া ইসলামি দায়িত্বের অংশ।
শিশুর প্রতি মমতা ও কোমলতা ছিল মহানবী (সা.)-এর আচরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) একবার তাঁর নাতি হাসান ইবনে আলী (রা.)-কে চুমু দিলেন। সে সময় তার কাছে উপস্থিত থাকা আকরা ইবন হাবিস বললেন, তার ১০টি সন্তান রয়েছে, কিন্তু তিনি কাউকেই কোনো দিন চুমু দেননি। তখন নবীজি (সা.) তার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।’ (বুখারি, হাদিস: ৫৯৯৭)
আনাস ইবনে মালিক (রা.) প্রায় ১০ বছর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেবা করেছেন। তিনি বলেন, নবীজি (সা.) তাকে কখনো ‘উফ’ বলেননি এবং কোনো কাজের জন্য ‘কেন করেছ?’ কিংবা কোনো কাজ না করার জন্য ‘কেন করোনি?’ বলে ভর্ৎসনা করেননি। (বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮) শিশুর ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে এ ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সংশোধনের নামে অপমান, ভয় কিংবা শারীরিক আঘাত করা শিশুর চরিত্র গঠনের ইসলামি পদ্ধতি নয়; বরং ধৈর্য, ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তাকে পথ দেখানোই নববী আদর্শ।
ইসলামের শিক্ষা হলো— শিশুকে ভয় নয়, নিরাপত্তা; অপমান নয়, মর্যাদা এবং নির্যাতন নয়, ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে
সহিংসতা শুধু শরীরে আঘাত করার নাম নয়; কটুকথা, উপহাস, অবজ্ঞা, অন্য শিশুর সঙ্গে অনবরত তুলনা করা কিংবা সবার সামনে অপদস্থ করাও শিশুর মর্যাদায় আঘাত করতে পারে। পবিত্র কোরআনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা একে অপরকে উপহাস করো না।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ১১) তাফসিরে ইবনে কাসিরে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় একে অপরকে হেয় ও অপমান করার নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে। (ইবনে কাসির, ৭/৩৭৬) শিশুর ক্ষেত্রেও এই নৈতিক বিধান সমভাবে প্রযোজ্য।
বাংলাদেশের বাস্তবতা এ সমস্যার গভীরতা আরও স্পষ্ট করে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইউনিসেফের যৌথভাবে পরিচালিত বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রায় ৯০ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাসনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে শারীরিক শাস্তির পাশাপাশি মানসিক আগ্রাসনও রয়েছে। অর্থাৎ ‘শাসন’ করার নামে শিশুকে আঘাত করা বা ভয় দেখানোর প্রবণতা এখনো আমাদের সমাজে গভীরভাবে বিদ্যমান।
শিশুশ্রমও শিশুর প্রতি এক ধরনের অধিকারবঞ্চনা। ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুর দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে তাকে শোষণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধেও পবিত্র কোরআনের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট। জাহেলি যুগে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার নির্মমতার বিরুদ্ধে কোরআন প্রশ্ন করেছে, ‘আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা তাকভির, আয়াত: ৮-৯) আজ সেই নিষ্ঠুর প্রথা নেই; কিন্তু কন্যাশিশুকে অবহেলা, শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা, বাল্যবিবাহে ঠেলে দেওয়া কিংবা যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে দেওয়া তার মর্যাদারই লঙ্ঘন।
এতিম ও অসহায় শিশুর প্রতি ইসলামের দায়িত্ববোধ আরও গভীর। মহান আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘অতএব, তুমি এতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না।’ (সুরা দুহা, আয়াত: ৯) এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করাকেও কোরআন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। (সুরা নিসা, আয়াত: ১০) এর মাধ্যমে ইসলাম দেখিয়েছে, যে শিশু নিজের অধিকার আদায়ে দুর্বল, তার অধিকার রক্ষায় সমাজের দায়িত্ব কত বেশি।
শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু মা-বাবার নয়; শিক্ষক, মাদ্রাসা ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, ইমাম, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজের প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিরও রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৮২৯) এই হাদিস শিশুর নিরাপত্তাকে ব্যক্তিগত দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক আমানতেও পরিণত করেছে।
তাই শিশুকে শাসনের নামে আঘাত করা, অপমান করা কিংবা ভয় দেখানোর সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ইসলামের শিক্ষা হলো— শিশুকে ভয় নয়, নিরাপত্তা; অপমান নয়, মর্যাদা এবং নির্যাতন নয়, ভালোবাসা ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে। শিশুর প্রতি দয়া কোনো অতিরিক্ত মানবিকতা নয়; এটি ইসলামের নৈতিক শিক্ষারই অংশ। যে পরিবার শিশুকে নিরাপত্তা দেয়, যে শিক্ষক শিশুর অধিকার দেন এবং যে সমাজ শিশুর পাশে দাঁড়ায়, তারাই প্রকৃত অর্থে নির্মাণ করতে পারে একটি মানবিক ভবিষ্যৎ।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



