ট্রাম্প জমানায় বামপন্থার অবরোধ লুলা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৭৩ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দেকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল অগাস্তো পিনোশে। মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে সংঘটিত অভ্যুত্থানের পর সমাজতন্ত্রীদের ওপর দমনপীড়ন, বেসরকারীকরণ, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার হরণের পাশাপাশি জাতীয় শিল্প সুরক্ষার নীতি প্রত্যাহারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত ‘শক ডকট্রিন (সংকটকালে আকস্মিকভাবে চালুকৃত কর্মসূচি)’ চিলিকে গ্রাস করেছিল; পরিণতিতে চিলি তখন অধুনা উদারবাদী বিশ্বব্যবস্থার পরীক্ষাগার। ২০২৬ সালের অক্টোবরে সদ্যসমাপ্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে এরই মধ্যে পরাজয় বরণকারী ফ্লাভিও বলসোনারো; পিনোশেরই প্রতিভূ, যিনি কি না দক্ষিণ আমেরিকার সর্ববৃহৎ অর্থনীতিকে মার্কিন পুঁজির হাতে সঁপে দিতে প্রস্তুত ছিলেন। উত্তুঙ্গ নির্বাচনী সাফল্যে কারাবন্দি সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর পুত্র ফ্লাভিও বলসোনারোকে ঠেকিয়েছেন অশীতিপর বামপন্থী নেতা লুলা ইনাসিও দ্য সিলভা। নব্য-উদারবাদী (নিওলিবারেল) বিশ্বে নিদেনপক্ষে যন্ত্রণা উপসমের প্রতিশ্রুতিদায়ী নেতা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছিলেন তিনি।
এর আগে ব্রাজিলে প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় দফার ভোটে (রান অব) জয়লাভ করতে পারেননি কেউই। কিন্তু লুলা পারলেন। তিনি দ্বিতীয় দফায় প্রথমবারের চেয়ে ১০ মিলিয়নেরও বেশি ভোট পেয়েছেন, নিঃসন্দেহে অবিশ্বাস্য ঘুরে দাঁড়ানো! তা ছাড়া তার আগে দেশটিতে কেউ চারবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট পদে জয়লাভ করতে পারেননি।
জল-জঙ্গল-ধরিত্রীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠা জীববৈচিত্র্যকে অবমূল্যায়ন এবং আদিবাসী মানুষের ভূমি-জীবন-জীবিকা সুরক্ষাকে যারা অবজ্ঞা করেন, তাদের কাছে ক্রমেই উত্তপ্ত পৃথিবীর বিবর্ণ প্রতিচ্ছবির মূল্য নেই। সামরিক শাসক ও শাসনের ইতিহাস এবং ডানপন্থার ক্লাসিক্যাল চরিত্র একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠে, বলসোনারোদের কাছে তাই ব্রাজিলের সামরিক শাসন পূজনীয়। অন্যদিকে তারুণ্য এবং সাধারণ জনতা সেই হাঁপিয়ে ওঠা শ্রেণি, যারা নব্য উদারবাদের জাঁতাকলে পিষ্ট। সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট লুলার পেছনে তারাই দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ, বাজার অর্থনীতির ভাগাড় থেকে চুইয়ে পড়া অংশেও যেন টান পড়ার উপক্রম। সাধারণরা উপলব্ধি করেছে, আমাজন বাঁচলে দক্ষিণ আমেরিকা বাঁচবে, সর্বোপরি বিশ্ব বাঁচবে। তাদের কাছে বলসোনারোর শাসনামলের বন উজাড় এবং লুলার বন সংরক্ষণবাদী নীতির তুলনামূলক চিত্রটা স্পষ্ট ছিল। ইউক্রেনের বিরল খনিজে মার্কিনিদের হাত বাড়ানো এবং দিনদুপুরে ডাকাতির মতো ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদে ওয়াশিংটনের অন্যায্য-অবৈধ কর্তৃত্বের সঙ্গে ফ্লাভিওর সম্ভাব্য শাসনে মার্কিন ছায়ায় আমাজন উজাড় করে সোনাদানাসমেত বিরল খনিজ লুণ্ঠনের চিত্রকে তুলনা করে দেখেছে ব্রাজিলের সিংহভাগ মানুষ। অসম প্রতিযোগিতাপূর্ণ, অনিয়ন্ত্রিত এবং অধিকতর উন্মুক্ত বাজারব্যবস্থায় অসংবেদনশীল মুনাফা কারবারিদের যোগসাজশ তারা অনুমান করতে পেরেছে। সেই সূত্রে মার্কিন শাসক ও তল্পিবাহকদের প্রবেশাধিকারকে রুখে দিয়েছে লুলার নির্বাচনী সাফল্য। আবার নির্বাচনের মাঠে বলসোনারো জুনিয়র মেরূকরণের চেষ্টা করেছেন লুলার ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানকে লক্ষ্য করে। তবে দ্বিধাহীন ছিলেন ৮১ বছর বয়সী লুলা। দ্বিধাহীনভাবে ইসরায়েলের গণহত্যাকে নিন্দা জানিয়েছেন।
গণতন্ত্রের আকুতিতে সরব দুনিয়া। সেই দাবিতে আজকের প্রতিবাদমুখর দুনিয়ার মিছিল। লুলা ইনাসিও দ্য সিলভার পেছনে শামিল হওয়া তরুণ-যুবা-জনতা সেই মিছিলেরই প্রতিনিধি
ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি কোনো নির্বাচনে এত ব্যাপকভাবে আসেনি, যেভাবে এবার এসেছে। কারণ হলো, নির্বাচন কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাপক মাথাব্যথা দেখানো।
৭১ বছর বয়সী বলসোনারো ২০২৩ সালে নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর দাঙ্গা সৃষ্টি ও ক্যু ঘটানোর মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চেষ্টার অভিযোগে ২৭ বছরের সাজা ভোগ করছেন। ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন প্রশাসন তার মুক্তির ব্যাপারে শুরু থেকেই সরব। লুলার আগের শাসনামলে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কারোপ করে মার্কিন প্রশাসন। শুল্ক প্রত্যাহারের শর্ত জুড়ে দিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্টের মুক্তির দেনদরবার করে তারা। বিষয়টি তরুণ ভোটারদের কাছে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ব্রাজিলে বিরল খনিজের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে লুলার অনড় বিরোধিতাও নির্বাচনের মাঠকে প্রভাবিত করেছে। নির্বাচন ঘিরে ওয়াশিংটন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) থেকে শুরু করে প্রথাগত গোয়েন্দাবৃত্তির সবটাই করতে তৎপর ছিল।
উদারবাদী ব্যবস্থার পণ্ডিতদের পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় ব্যয়ভারের কাটছাঁটকে যখন অনিবার্য মনে করা হচ্ছে, তখন ব্রাজিলের পেনশন ব্যবস্থায় সরকারি বরাদ্দ হ্রাসের কলাকৌশলকে প্রশ্রয় দেননি লুলা। বলসোনারোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ধনী-গরিবের করহারের রেখা ধূসর হতে বাধ্য। লুলা হয়তো বৈপ্লবিক অর্থনীতির উদগাতা নন, তবে তিনি সম্পদশালীদের ওপর অধিকার হারে কর চাপাতে চান। উদারবাদী চিন্তার পোষ্য শাসকদের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী-বহুজাতিক গোষ্ঠীর গাঁটছড়া অবশ্যম্ভাবী; লুলা এই ‘আনহোলি নেক্সাস’-এর সামনে বামপন্থার ‘সংস্কারবাদী অবরোধ’। এজন্য ধ্রুপদি সমাজতন্ত্রীরা তাকে ‘সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট (সামাজিক গণতন্ত্রী)’ বলে বিদ্রূপ করছেন।
বিদ্রূপকারীরা অবিচল থাকতে পারেন। তবে নব্য-উদারবাদের উপজাতস্বরূপ গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থার সামনে যে গভীর খাদ; তাকে সাময়িক স্বস্তি দিতে এখন লুলা দ্য সিলভাদের প্রয়োজন।
ঘটনাবহুল বিশ্বে যেদিকে তাকানো যায়, সেদিকই প্রতিবাদমুখর। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে গাজায় নৃশংস ইসরায়েলি গণহত্যা এবং ইরানের ওপর মার্কিন বাহিনীর অন্যায্য আক্রমণের অভিঘাত বিশ্বের তারুণ্যকে অস্থির করে তুলছে। শিক্ষা সংকট সমাধানের দাবিতে সরব আলবেনিয়ার শিক্ষার্থী-শ্রমিক-জনতার বিক্ষোভ সামলাতে মরিয়া সরকার। সার্বিয়ায় শিক্ষার্থী জোটের কাছে প্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্দার ভুসিচ পরাজিত হয়েছেন। তাদের বিক্ষোভের কেন্দ্রে ছিল জীবনযাত্রার সংকট ও শিক্ষাকেন্দ্রিক দাবিনামা। সবচেয়ে আলোচিত ফ্রান্সের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংকট থেকে উদ্ভূত জীবনযাত্রার মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদী জাগরণ। এদিকে ভারতে নির্বাচনব্যবস্থার জালজালিয়াতির বিরুদ্ধে অনবরত বিক্ষোভে মানুষের জীবনযাত্রার সংকটের আলোচনা ঠাঁই পাচ্ছে। জীবন-জীবিকার তাগিদ ঘুরেফিরে এসেছে। গণতন্ত্রের আকুতিতে সরব দুনিয়া। সেই দাবিতে আজকের প্রতিবাদমুখর দুনিয়ার মিছিল। লুলা ইনাসিও দ্য সিলভার পেছনে শামিল হওয়া তরুণ-যুবা-জনতা সেই মিছিলেরই প্রতিনিধি।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক



