আট কলামের ষোলকলা

অমিত হাবিব
বহুজাতিক কোম্পানি কোকা-কোলা গ্রাহক আকৃষ্ট করতে একটি বিলবোর্ড বানিয়েছিল। ওই বিলবোর্ডে একজন মানুষকে দেখা যায় তিন ভঙ্গিতে। প্রথম ছবিতে মানুষটি খুব ক্লান্ত; বসে আছে। দ্বিতীয় ছবিতে দাঁড়ানো; হাতে কোকা-কোলা। তৃতীয় ছবিতে দুই হাত তুলে উল্লসিত; দারুণ সতেজ। বিলবোর্ডের ছবি বলছে এই রকম— প্রথম অবস্থায় মানুষটি ক্লান্ত ছিল। এরপর কোকা-কোলা পান করল। তারপর শক্তি পেয়ে উল্লসিত।
ইউরোপ-আমেরিকায় এই বিলবোর্ড মানুষকে কোকা-কোলা পানে ব্যাপক উৎসাহিত করে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে এই কোমল পানীয়। আকাশছোঁয়া লাভের মুখ দেখে কোম্পানি।
এবার একই বিলবোর্ড টানানো হলো মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানকার মানুষ বিলবোর্ডের ছবি দেখে ভাবল— এ আবার কেমন পানীয়? একজন সুখী মানুষ হাত উঁচিয়ে আনন্দ করছে। অথচ যেই কোকা-কোলা পান করল; ক্লান্ত হয়ে নুয়ে পড়ল। ফলে আরব দেশের লোকেরা কোকা-কোলা বর্জন করল।
কেন? প্রথম ঘটনায় যারা বিলবোর্ড দেখেছিলেন, তারা ‘দেখেন’ ‘লেখেন’ ‘পড়েন’ বাম থেকে ডানে। তারা বুঝেছেন বিলবোর্ডের ক্লান্ত মানুষটি কোকা-কোলা খেয়েই সতেজ হয়েছে। আর আরবের লোকেরা ‘দেখেন’ ‘লেখেন’ ‘পড়েন’ ডান থেকে বামে। ফলে তারা বুঝেছেন, সতেজ মানুষটি কোকা-কোলা খেয়েই নুয়ে পড়েছেন। বহুল প্রচলিত এ গল্পের কেন অবতারণা?
সম্পাদক অমিত হাবিব আমার কর্মজীবনের শিক্ষক ছিলেন। একবার বার্তাকক্ষে মিনিং অব মিনিং বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন এই গল্প। কিন্তু পত্রিকার জন্য কেন এই গল্প? আরেকটু পরে বলা যাক।
একটি পত্রিকার সবচেয়ে আর সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ পেজ মেকআপ।
অমিত হাবিবের ভাষায় ‘পত্রিকা তৈরি’। এ কাজটি যেখানে হয় সাধারণত সেই কক্ষটিকে ডাকা হয় মেকআপ রুম। অমিত হাবিব বলতেন ‘অপারেশন থিয়েটার’। তিনি মনে করতেন, এ কক্ষই সংবাদপত্রের সব কক্ষপথের রক্ষাকবচ। একটি বেস্ট রিপোর্টকে বেস্ট স্থানে স্থাপন করে পত্রিকাকে জীবন দেওয়া যায়। তা-ও এবার এক দিনের জন্য। আবার ভুল ‘অস্ত্রোপচার’ করে পত্রিকাকে মেরে ফেলাও সম্ভব।
তো ‘পত্রিকা তৈরি কক্ষে’ কেমন ছিলেন অমিত হাবিব। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে বিভিন্ন পত্রিকা তৈরিতে তিনি ছিলেন অদ্বিতীয় ম্যাজিশিয়ান, যা বলা বাহুল্য। সম্পাদক হওয়ার পর ‘দেশ রূপান্তর’-এ তাকে খুব কাছ থেকে দেখার, কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। ফলে তাকে নিয়ে বলার জায়গাটি এ পত্রিকা ঘিরেই। একজন জাদুকর নিয়ে আমার বলাটা যথেষ্ট নয়!
পত্রিকায় কী হবে, কী থাকবে তা প্রতিদিন ঠিক করা হয় প্ল্যানিং মিটিংয়ে, বিকেলে। তার আগে পরিকল্পনা কী, তা ঠিক করা হয় দুপুরে। স্বাভাবিকভাবে সম্পাদকের নির্দেশনা মেনেই চলে সব কাজ। পত্রিকার প্রতিটি পৃষ্ঠার দায়িত্বে একজন থাকেন। আর সর্বশেষ দেখে দেন সম্পাদক। কিন্তু সম্পাদক অমিত হাবিব ছিলেন ব্যতিক্রম। তৈরি পাতা দেখার সময় হয়ে যেতেন একজন কর্মী। ফলে নানাভাবে বদলে যেত পৃষ্ঠাটি। যুক্ত হতো আরও কিছু।
সাধারণত একটি পত্রিকার দৈর্ঘ্য ২০ ইঞ্চি। প্রথম পৃষ্ঠার মাস্ট হেড বাদ দিলে ১৮ ইঞ্চি। প্রসে ১৩ ইঞ্চি। নিউজের জায়গা সিঙ্গেল কলাম ১.৫ ইঞ্চি, ডাবল কলাম (ডিসি) ৩.১ ইঞ্চি, তিন কলাম (থ্রি সি) ৪.৭ ইঞ্চি, চার কলাম (ফোর সি) ৬.৪৩ ইঞ্চি। এ জায়গাগুলোর পুরোটা মাথায় থাকত অমিত হাবিবের। ফলে সম্পাদক অমিত হাবিবের নির্দেশনার মাপকাঠি জাদুর কাঠির মতোই।
অমিত হাবিবের পেজ মেকআপে সবচেয়ে গুরুত্ব পেত নিউজ বা কনটেন্ট। কীভাবে পৃষ্ঠা সাজানো হবে। দেখতে কেমন হবে তা পুরোপুরি নির্ভর করত নিউজটি কেমন তার ওপর। তথ্যের যে আলাদা একটি গোপন চেহারা আছে, তার অবয়ব বের করে এনে সাজাতেন পত্রিকার পৃষ্ঠা। বিশেষ করে প্রথম পৃষ্ঠার ক্ষেত্রে। তিনি মনে করতেন নিউজের চেহারাই পত্রিকার চেহারা। নিউজের হেডিং করতেন মনোমুগ্ধকর নান্দনিক।
তার মতে, সমাজের অন্তরালে একটা গোপন সমাজ আছে, রাষ্ট্রের অন্তরালে একটা অলিখিত রাষ্ট্র আছে। এ অন্তরালটা খবরের কাগজে প্রকাশ্যে দেখাতে হয়। তেমনি ঘটনার অন্তরালে যেমন ঘটনা থাকে। নিউজের অন্তরালে গোপন একটা নিউজ থাকে। নিউজটা পড়ার, কিন্তু নিউজের গোপন নিউজটা শুধুই দেখার। সঠিকভাবে নিউজটা কাগজে উপস্থাপন করতে পারলে এই দেখাটা দেখা যাবে।
পত্রিকায় ছবির ক্ষেত্রে অন্যরকম বলতেন, ভাবতেন। শুধু নান্দনিকতার জন্য ছবি ব্যবহার করতেন না মোটেই। ছবিকে শুধু ছবি ভাবতে নারাজ। ছবির ভাষাটা খবর হলেই শুধু স্থান পেত তার পত্রিকায়। একবার এক আলোকচিত্রী একটা ছবি ছাপতে উনাকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছিলেন। ছবিটায় ছিল নীল আকাশ, বিস্তর প্রান্তর। ছবিটা নিলেন না। আলোকচিত্রী ছবিটা ছাপতে যুক্তি দিলেন ঢের। উনি আলোকচিত্রীকে বললেন, ‘ছবিটা পত্রিকার চেয়ে আপনার প্রদর্শনীতে কাজে লাগবে বেশি।’
আবার শুধুই ছবির ব্যাপারে আলাদা পক্ষপাত ছিল অমিত হাবিবের। স্রেফ চাক্ষুস ছবিকেও নিউজ ভাবতেন। তার কাছে ক্যাপশন মানে একটি ধ্রুপদি কবিতার প্রথম লাইনের মতো। ছবিতে যা দেখা যায়, ক্যাপশনে তা লেখা ছিল বড় ধরনের অপরাধ। মানে ছবিতে যা থাকবে, তা লেখা যাবে না। আবার ক্যাপশনে যা লেখা হবে, তা হবে ওই ছবির পরিভাষা। তার মতে, ক্যাপশন মানুষের নামের মতো। তার চেহারার সঙ্গে নামের মিল নেই। অথচ ডাকলেই ঘাড় ঘুরে যায়।
পত্রিকার প্রথম কলাম ছেড়ে পেজ মেকআপ করতে পছন্দ করতেন। অর্থাৎ পত্রিকার প্রথমে ছবি বসুক বা নিউজ। প্রথম কলাম থেকে শুরু করতেন না। ঘটনা বা নিউজের গুরুত্ব অনুযায়ী যে এর ব্যতিক্রম হতো না, তা নয়। তবে অমিত হাবিবের গ্রামারে প্রথমে কলাম ছেড়ে চার কলাম ছবি বা নিউজ বসে। এটা শুধু প্রথম পাতা নয়, নিউজের যেকোনো পেজের ক্ষেত্রে ছিল প্রযোজ্য।
স্থান পেলেই প্রথম পাতায় বেশি নিউজ দিতে চাইতেন। অযথা সৌন্দর্যের খাতিরে নিউজ কম রাখা মানতে পারতেন না। প্রথম পাতায় লিড নিউজ; সেকেন্ড লিড নিউজ, লিড ছবি ব্যবহারের পর চাইতেন সব বিটের নিউজ রাখতে। বাণিজ্য, খেলা, অপরাধ, কূটনৈতিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিভাগের রাখতেন সিঙ্গেল কলাম হলেও। নারী-শিশুর প্রতি সহিংসতা, সীমান্তে হত্যা, ধর্ষণ, মানবাধিকার বিষয়ে অপেক্ষাকৃত দুর্বল নিউজ হলেও প্রথম পাতায় রাখতেন চমকপ্রদ শিরোনাম ব্যবহার করে।
নিউজে অযথা শোল্ডার ব্যবহার করতে চাইতেন না। ইনসার্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ছিলেন খুঁতখুঁতে। একবার আমি নিজেই লিড নিউজের পেটে সংশ্লিষ্ট বিষয়েই একটা ছবি ব্যবহার করেছিলাম। ছবির ওপর একটা স্ট্রিপ ছিল। উনি এই দেখে বিরক্ত হয়েছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন এটা কেন? উত্তরে বলেছিলাম, ‘দাদা, ছবিটি সংশ্লিষ্ট।’ উনি বলেছিলেন, ‘তা না হয় হলো, কিন্তু আপনার যুক্তি কী?’ আমি চুপ ছিলাম। দাদা বললেন, ‘শোনেন আপনারা ছবিকে ছবি মনে করেন। কিন্তু লেখাগুলোকে ছবি ভাবতে পারেন না।’ তার মানে উনি লেখাকেও ছবি ভাবতে পারেন। তার ভাবনায় লেখা যদি স্বয়ং ছবি হয়ে থাকে, তাহলে ছবির ওপর ছবি বসানো তো রীতিমতো ব্লান্ডার।
নিউজ ট্রিটমেন্টের ব্যাপারে অমিত হাবিব ছাড়া এত নির্মম আর কজন আছেন। অমিত হাবিবের আদর্শ লিড নিউজের জায়গা চার কলাম। সেকেন্ড লিড তিন কলাম। তো অমিত হাবিবের চার কলাম লিডে জায়গা পাওয়া যেকোনো প্রতিবেদকের জন্য এক লাফে চাঁদের তীক্ষ্ণ কোনো বাক্যে চারপাশসহ হেসে ওঠার বিরল মুহূর্ত।
প্রাচীর ডিঙানোর মতো। স্পেশাল রিপোর্ট তিনি কখনোই চার কলামের বেশি ট্রিটমেন্ট দিতেন না। দেশ রূপান্তরের দেশ কাঁপানো প্রতিবেদন ‘কেনা-তোলায় এত ফাঁক’ (বালিশকাণ্ড) লিডে থাকা সেই নিউজটির ট্রিটমেন্ট ছিল চার কলাম। তবে দেশ জুড়ে আলোড়ন তোলা বড় ইভেন্টের ক্ষেত্রে তিনি কলাম গুনতেন না। পত্রিকার আট কলাম জুড়ে থাকত তার ষোলকলাপূর্ণ মহিমা।
দিনটা ছিল ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। নিউজটা ছিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে। তো রাত সাড়ে ৯টায় দিকে তিনি মেকআপ রুমে আসলেন। নিউজটার ওপর নজর পড়ল। এরপর সোজা নিউজটা উঠে গেল লিডে। শিরোনাম দিলেন ‘ধমকের আড়ালে আশকারা’
ওই যে বলছিলাম নিউজকে তিনি ছবির মতো দেখতেন। একবার প্রথম পাতার মাঝখানে তিন কলামে একটা নিউজ বসালাম। দিনটা ছিল ২০১৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। নিউজটা ছিল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে। তো রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনি মেকআপ রুমে আসলেন। নিউজটার ওপর নজর পড়ল। এরপর সোজা নিউজটা উঠে গেল লিডে। শিরোনাম দিলেন ‘ধমকের আড়ালে আশকারা’। তিনি মনে করতেন, একটা শক্তিশালী নিউজ দুর্বল নিউজের এক ইঞ্চি নিচে থাকতে পারে না। নিউজে নিউজে ফাইট করে নিউজের গুণে নিউজ থাকে তার প্রাপ্য জায়গায়।
অমিত হাবিব পত্রিকা তৈরিতে টিম টিউনিংকে গুরুত্ব দিতেন সবচেয়ে বেশি। যিনি পেজ মেকআপে নির্দেশনা দিচ্ছেন আর যিনি কম্পিউটারে অপারেট করছেন; এ দুইয়ের টিউনিং হতে হবে চমৎকার। নির্দেশনা দিতেন যতখানি, গ্রহণে ততখানি না থাকলে তার প্রভাব পড়বে কাগজে। আর যিনি পেজ মেকআপ করবেন তার মাথায় গেঁথে থাকতে হবে পুরো পৃষ্ঠাটা। প্রাথমিকভাবেই তিনি মাথার মধ্যে পৃষ্ঠা সাজিয়ে নেবেন। আর তা না হলে পেজে বসে অনেকগুলো ‘অকারেন্স’-এর মুখোমুখি হতে হবে। অপ্রত্যাাশিত কর্নার তৈরি হবে। পৃষ্ঠাসজ্জায় থাকবে না কোনো ভারসাম্য।
অমিত হাবিব বলতেন, ভোর থেকে ভোররাত পর্যন্ত এত কিছুর পর একটি পত্রিকার ক্লাসিকের বয়স পাঠকের এক পলকের সমান...
লেখক : বার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়
দেশ রূপান্তর থেকে প্রকাশিত অমিত আলোকসজ্জায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল।









