একান্ত আলাপে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
আমাদের সমাজে আর পাঠক নেই, এই পাঠক এখন জন্ম দিতে হবে

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ—ছবি: কবির হোসেন
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ব্যক্তিত্বের প্রায় সব দিক সমন্বিত হয়েছে তার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সংগঠক সত্তায়। তিনি অনুভব করেছেন যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের প্রয়োজন অসংখ্য উচ্চায়ত মানুষ। আলোকিত মানুষ চাই- সারা দেশে এই আন্দোলনের অগ্রযাত্রী হিসেবে প্রায় তিন দশক ধরে তিনি রয়েছেন সংগ্রামশীল।
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছে একটু একটু করে, অনেক দিনে। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মুখে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে তাকে এগোতে হয়েছে। ষাটের দশকের সাহিত্য আন্দোলন ও কণ্ঠস্বর পত্রিকার সম্পাদক, কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিনের সঙ্গে অকপট আলাপে জানিয়েছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের জন্ম ও পথচলার পূর্বাপর।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বয়স ৩৫ বছর হতে চলল। বই পড়া নিয়ে এমন একটা সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের আন্দোলন গড়ে তুলবেন- এমন ভাবনা প্রথম কবে মাথায় এলো, কবে দেখলেন এই এখন সত্যি হওয়া বিশাল স্বপ্নটা?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: ব্যাপারটা হচ্ছে কি, আমি এমন একটা জায়গায় লিখেছি, আমরা সবাই আমাদের স্বপ্নের চেয়ে বড়। স্বপ্ন সব সময় আমাদের চেয়ে সামনে হাঁটে এবং আমাদের স্পর্শের বাইরে থাকে। আমরা তার সমান হওয়ার চেষ্টা করি এবং স্বপ্নটা একটা অস্পষ্ট বিষয়। মানুষ ঠিক জানে না, ওই স্বপ্নটার ভেতর একটা কংক্রিট বিষয় লুকিয়ে থাকে। দেখে সে স্বপ্ন হিসেবে। যেমন ফল যে হবে এটাকে মানুষ ফুল হিসেবে দেখে। তখন মানুষের কল্পনা করাও সম্ভব না যে ফুলটার ভেতর থেকে এতবড় একটা কাঁঠাল বেরোবে। আমি যখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিন্তা করি, স্বপ্ন দেখি, তখন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নামগন্ধও তাতে ছিল না। যেমন যদি মুক্তিযোদ্ধারা জানতেন দেশটা একদিন এই হবে, দস্যুদের আখড়া হবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নিশ্চয়ই তারা যুদ্ধটা যেভাবে করেছেন, করতে পারতেন না।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: হ্যাঁ, আখড়া ও দস্যুদের হাতে জিম্মি বন্দি একটা জাতিতে পরিণত হবে। এভাবে মানুষের ওপর মানুষের অত্যাচার, তাহলে তারা যুদ্ধ করতে পারতেন না। তাদের স্বপ্নটা অস্পষ্ট ছিল বলেই তারা যুদ্ধটা করতে পেরেছেন। স্বপ্ন জিনিসটাই সব সময় অস্পষ্ট। এ কথা কখনো বলা যাবে না যে অত তারিখ থেকে আমি শুরু করেছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না, না স্যার, সেই আনুমানিক সময়কালটার কথা জানতে চাই। আশপাশের ঘটনাগুলোও।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: প্রথমে আমার একটা দুঃখবোধ, সেটা হলো ষাটের দশকের ঢাকার সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে আমি, তরুণদের সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে আমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলাম। সেই সাহিত্য পত্রিকা কণ্ঠস্বর, যেটা আমিই সম্পাদনা করতাম। তখন আমার মনে হয়েছিল আমাদের যারা লেখক-সাহিত্যিক, তাঁরা তিরিশের দশকে কলকাতায় যে সাহিত্য আন্দোলন হয়েছিল, তাদের চেয়ে গুণগতভাবে কোনো অংশে কম ছিলেন না।
হয়তো জীবনানন্দ দাশের মাপের একজন কবি সেখানে ছিলেন না; কিন্তু যথেষ্ট ভালো মাপের কবি সেখানে ছিলেন। এখানে যারা সাহিত্য করে, যে তরুণরা প্রাণ দিয়ে সাহিত্যে নিজেদের পরিচয় তৈরি করতে চায়, তারা কোনো অংশেই কলকাতায় যারা কাজ করছে, তাদের চেয়ে কম নয়। কিন্তু আমার মনে হলো, শেষ পর্যন্ত আমরা তাদের কাছে হেরে গেলাম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ওই সময় আপনার এটা মনে হয়েছিল?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: হ্যাঁ, ওই সময়। হেরে গেছি, হেরে গেলাম। কেন হারলাম! সব যোগ্যতা নিয়েও! আমার কাছে মনে হলো, এর কারণ জ্ঞানের জায়গায় তারা আমাদের চেয়ে উঁচু মাপের ছিল। তারা যে যুগে জন্মেছিল সেই যুগের মধ্যেই জ্ঞান ছিল। সেখানে রবীন্দ্রনাথের মতো কত বড় বড় মানুষ। আমরা ওইখানে হেরে গেলাম, আমরা উঠে এলাম বাংলা সাহিত্যের পটভূমি থেকে। আর ওরা উঠে এসেছে বিশ্বসাহিত্যের পটভূমি থেকে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পার্থক্যটা সেই সময়ই আপনি আমলে এনেছিলেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: আমার মাথার মধ্যে এলো এই পার্থক্যটা। এবং আমার মনে হলো, আমাদের জ্ঞান দরকার। একটা বৈশ্বিক মানুষ হয়ে উঠতে হবে আমাদের। বৈশ্বিক মাপের মানুষ হতে হবে। তাহলে আমরা আরো বড় মাপের মানুষ হতে পারব। তখনো দেশ স্বাধীন হয়নি। অনেক স্বপ্ন আমাদের সামনে। আমি কিছু ঢাকা কলেজের মেধাবীদের নিয়ে একটা পাঠচক্র করলাম। ছেলেমেয়েগুলো দারুণ করল, দারুণ আগ্রহীও ছিল; কিন্তু সাত-আট মাস চলল সেই পাঠচক্র। শুধু যে বই-ই পড়তাম তা নয়, মুক্ত আলোচনা থাকত, যেমন মনে আছে আমার, প্রথমদিকে আমি টপিক দিয়ে দিতাম, যেমন নৈরাজ্যবাদ।
এমন টপিক দিতাম যে সবাই পড়ে আসে, তারপর আলোচনা করেন। এনসাইক্লোপিডিয়া থেকে হোক, বই থেকে হোক, সবাই পড়ে আসে। তারপরে তাঁরা পড়ে এলেন, আমরা ডিসকাস করলাম, এ রকম একেক দিন একেক টপিক, একেক বই, কোনো দিন এটা কোনো দিন সেটা, এভাবে চলতে লাগল। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এলো এবং বহু খারাপ জিনিস দেশ থেকে বিতাড়িত হলো। দু-একটা ভালো জিনিসও গেল। তার মধ্যে আমাদের পাঠচক্র একটা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, গণ-অভ্যুত্থানের কারণে পাঠচক্র কেন গেল? আপনি ও পাঠচক্রের সবাই কি যুক্ত ছিলেন অভ্যুত্থানের সঙ্গে?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: না, সারা দেশের মধ্যে তখন একটা অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তার অভাব, এটা-সেটা হয় এবং উদ্দীপনা, উত্তেজনা, আমরাই, দেখা গেল যে আমাদের পড়াশোনার দিকে আর মন নেই। এখন দেশের মুক্তি প্রয়োজন, ফলে আমাদের পাঠচক্রটা উঠে গেল। আন্দোলন আরো দানা বাঁধল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো। দেশ স্বাধীন হলো। আমরা ভাবলাম, সোনার বাংলা হয়ে গেছে, এখন কাঁথা মুড়ি দিয়ে একটা ভালো ঘুম দিলেই হবে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৮ সালে একটা পাঠচক্র আমরা আবার শুরু করলাম। এবার মূলত বইকেন্দ্রিক। একটা বই সিলেক্ট করে প্রত্যেককে পড়তে বলা হতো, একটা করে কপি দেওয়া হতো, তা নিয়ে পরের সপ্তাহে আলোচনা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, ঢাকা কলেজের যে শিক্ষার্থীরা ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের আগে ছিলেন, আটাত্তরে এসে কি তাদেরই পেলেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: না, না, তারা সব কোথায় চলে গেছেন। আমি গেছি কোথায়! কথা হচ্ছে প্রথম প্রেমের মতো বিষয়টা, মানুষ শুধু প্রেমের ব্যাপারেই প্রথম প্রেম বলে; কিন্তু সব কিছুরই প্রথম হয়। যেটা আমি দেখিনি কোনো দিন, সেটাই আমার জীবনে প্রথম। সেটাই প্রথমা। কী করে কুয়াশায় একদম সব ঢেকে যায় হঠাৎ করে এবং ঘন বৃষ্টি চলে আসে, এটা আমি দুই বছর আগে শিলংয়ে প্রথম দেখলাম। আমার কাছে সেই থ্রিল, অনেক বয়স হয়েছে আমার; কিন্তু প্রথম প্রেমের মতো। সেই সৌন্দর্য, সেই দৃশ্য, সেই ঘটনা। মানুষ যেটা কোনো দিন দেখেনি, সেটা সে যে বয়সেই দেখুক, সেটাই তার প্রথম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেভেন্টি এইটে ছিলেন স্যার...
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: তখন আবার নতুন করে শুরু করলাম, দেখলাম আমার চারপাশে অনেক নতুন ছেলেপেলে। জানতে চায়। বুঝতে চায়। জীবনকে প্রশ্ন করে। আমার কাছে এসে প্রশ্ন করে, তখন ভাবলাম ওদের নিয়ে শুরু করি, এই শুরু। এবং এটা পাঁচ বছর চলল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এক ধরনের বিদ্যাবুদ্ধির স্ফুরণ?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: হ্যাঁ, স্ফুরণ ঘটল। স্ফুরণ হলো। ঝলকানি। যাকে বলা যেতে পারে, চিত্তের একটা ঝলকানি। আমি দেখলাম, সবার মধ্যে উদ্ভাস। এবং সত্যি সত্যি ওই গ্রুপের মধ্যে যারা ছিল, প্রত্যেকে তাদের নিজেদের জায়গায় ইম্পর্ট্যান্ট লোক হয়ে উঠল। তখন মনে হলো যে এটা যদি সাকসেসফুল হয়, তাহলে সারা দেশে বড় বা ছোটভাবে এই জিনিসটা করতে পারি। মনে রাখতে হবে, তখন দেশ কিন্তু একটা অরণ্য। শিক্ষা-দীক্ষার দিক থেকে অরণ্য। হিন্দুরা চলে যাওয়ার পর মুসলমানদের, মুসলমানপ্রধান বাংলাদেশের যে উত্থান, সেটা তো এরশাদের আমলের ঘটনা। তার আগে পর্যন্ত হানাহানি, হত্যা, রাজনৈতিক হত্যা, গুপ্তহত্যাসহ প্রচুর নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে! মানে একটা অরাজক অবস্থা, নৈরাজ্যপূর্ণ একটা পরিবেশ। তার মধ্যে হয়নি, তারপর এরশাদের সময়ে এসে এটা সুস্থির হয়ে গেল, কারণ জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর ভেতরের বিশৃঙ্খলা-অরাজকতাকে নির্মমভাবে দমন করেছিলেন। তার সুফলটা পেয়ে গেল এরশাদ। তখন আর বীর নাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বীর হাওয়া?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: মানে তখন যে বিদ্রোহ করবে সেই মানুষ আর নেই। সব শান্ত। তার মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রথম বিকাশ শুরু। সুতরাং ১৯৮৫ সালের আগে পর্যন্ত বাংলাদেশ ওই ১৯৪৭ সালের আগে যা ছিল, প্রায় তাই। আমরা যখন ঢাকা শহরে আসি, মানে ১৯৫২ সালেও ঢাকা শহরের জনসংখ্যা ছিল পৌনে তিন লাখ। ১৯৭০-৭১ সালে সেটা ১০ লাখ। ১৯৮০ সালে ২০ লাখ। এ-ই আর কি! এটুকু হয়েছে। মফস্বল শহরগুলো যা ছিল তাই। কোনো গুণগত পরিবর্তন নেই। এই হলো বাংলাদেশ। ১৯৬৫ সালের আগে ছিল হিন্দুরা। বাঙালি রেনেসাঁর এক ধরনের আলো তখনো তাদের মধ্যে ছিল। অস্তায়মান আলো আমরা তখনো তাদের মধ্যে পাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে কি হিন্দুদের চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এখানে এক ধরনের শূন্যতার সৃষ্টি হলো?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: অ্যাবসিলিউটলি। বড় শূন্যতা তৈরি হলো। হিন্দুরা চলে গেল, মুসলমানরা তাদের কাঁচা পয়সা বা গায়ের জোরে বাড়ি দখল করে নিয়ে প্রথমেই ফুলের গাছটা উপড়ালো, এগুলো কেন আছে তারা বুঝল না, সেখানে লাউ-কুমড়া-ধুন্ধল লাগিয়ে সারা বাংলাদেশকে লাভজনক করে তুলল। এই পরিবেশ চলল এই পর্যন্ত, তারপর দেশে সমৃদ্ধি শুরু হলো। আমরা যখন পাঠচক্র শুরু করলাম, তখন ভাবলাম এটা যদি সফল হয়, তাহলে সারা দেশে সফল করার চেষ্টা করা যেতে পারে। আমি এক জায়গায় লিখেছিলাম যে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র একদিন বাংলাদেশ হবে।
বাংলাদেশ হবে মানে, ওই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দালানটা বাংলাদেশ হয়ে যাবে না, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের যে আলোর স্বপ্ন- এটা একদিন সারা বাংলাদেশের হয়ে যাবে। আমি প্রথমে করেছিলাম ইউনিভার্সিটি লেভেলের ছেলেমেয়েদের নিয়ে, তারপর দেখলাম যে তাদের চেয়ে অনেক বেশি সেনসেটিভ, স্পর্শকাতর কলেজ ও স্কুলপর্যায়ের ছেলেমেয়েরা। কলেজে এক্সপেরিমেন্ট করলাম এক বছর, তার পরের বছর স্কুলেও এক্সপেরিমেন্ট করলাম। কয়েকটা স্কুল থেকে ছেলেমেয়েদের কেন্দ্রে নিয়ে এসে দেখলাম যে স্কুল হচ্ছে বেস্ট জায়গা, একটা অবোধ, কচি, অনুসন্ধিৎসু, ক্ষমতাসম্পন্ন ও আশ্চর্যভাবে শক্তিশালী মানুষের শৈশব। তখন মনে হলো, এই শৈশবকে সুন্দর করতে হবে।
আর শৈশবকে সুন্দর করতে পারলে আমরা জাতিকে সুন্দর করতে পারব। সেই থেকে আমি চলে গেলাম স্কুলে। তারপর বাড়াতে লাগলাম আস্তে আস্তে, টাকা নেই, বইয়ের জন্য টাকা, এ দেশে আজও কেউ দেয় না। আর সেই সময়, বুঝতেই পারছ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এত খারাপ ছিল, মুখস্থ করে পড়তে হতো! এখন তো তবু ভালো, সৃজনশীল হয়েছে। তখন এত নিগ্রহ, এত কষ্ট যে মানুষ বইয়ের নাম শুনলেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ত যে আবার বোধ হয় পরীক্ষা দিতে হবে!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই ভয়ংকর দশা থাকার পরও আজকের অবস্থানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এলো কিভাবে?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: প্রথমে একটা সুবিধা হলো যে আমি তখন টেলিভিশনে উপস্থাপনা করার কারণে সারা দেশে জনপ্রিয়। এটা কাজে লেগে গেল। খুব সাধারণ মানুষজন আমাকে পছন্দ করে। আমি ১৯৮৩ সালে একটা লাইব্রেরি করি এক লাখ বই নিয়ে। সেই লাইব্রেরি ফেইল করল।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ফেইল করল কেন?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: ফেইল করল, কারণ এক হাজার ২০০ মেম্বার হলো, আমাদের ছেলেবেলায় হিন্দুদের যে পড়াশোনা দেখেছি, আমার তো সেই ছবি ভেসে আছে চোখের সামনে। ভাবলাম, লাইব্রেরী করলে একেবারে মানুষে-পাঠকে সয়লাব হয়ে যাবে। কিন্তু পরে দেখলাম, মাত্র এক হাজার ২০০ পাঠক হলো। এক লাখ বই, সেসময়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ! এ টাকাটা আমি মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি। বিপুল টাকা তখন দেশে আসছে। আর আমি তখন পণ করে বসে আছি যে ওই বিদেশি টাকা নেব না। আমরা নিজেরা করব, যত কষ্টই হোক, যত দিনই লাগুক। কারণ ভিক্ষা নিয়ে কিছু করতে গেলে যে ছেলেটা বা মেয়েটা উৎকর্ষ প্রকল্পে আছে, সে যদি একবার বোঝে যে সে ভিক্ষার টাকা দিয়ে তৈরি হচ্ছে, মনটা ছোট হয়ে যাবে তার। আর কোনো দিনও বড় হবে না। মন ছোট হয়ে গেলে, স্বপ্ন ছোট হয়ে গেলে উৎকর্ষ দিয়ে কিচ্ছু হবে না। সে জন্য ঠিক করলাম, দারিদ্র্য ভালো, কিন্তু মাথা নত করে ভিক্ষা নেব না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: পরে কি স্যার আপনার এই চিন্তা বদলেছে?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: না, এই চিন্তা আজও বদলায়নি। আমরা বিদেশি টাকা নিয়েছি, সেটা টোটাল ব্যয়ের ৫ বা ৭ শতাংশ। আমাদের টোটাল আজ পর্যন্ত যা খরচ হয়েছে। শুধু ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরিটা চালাতে আমাদের বিদেশি টাকার শরণাপন্ন হতে হয়েছে। দেশ থেকে এত টাকা আমি জোগাড় করতে পারিনি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: হ্যাঁ স্যার, এত জেলায় যাওয়া-আসা, ফুয়েল কস্ট, হিউজই তো হওয়ার কথা।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: হ্যাঁ হিউজ কস্ট, ফুয়েল আছে, গাড়িপ্রতি দুজন লোকের বেতন, আর এগুলো প্রত্যেকটা একেকটা লাইব্রেরি, এটা এখন বন্ধ হয়ে যাবে। কারণ এই টাকা এখন আর পাচ্ছি না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যার, ৪০ লাখ টাকার বই দিয়ে শুরু করা লাইব্রেরির কথা বলছিলেন...
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: হ্যাঁ, এক হাজার ২০০ সদস্য হলো। তার মধ্যে ৬০০ প্রথম দিন এসে বই নিয়ে চলে গেল, আর ফিরল না। বাকি ৬০০-র মধ্যে ৪০০ দেখি যে খালি ওই গোয়েন্দা উপন্যাস, সস্তা সাহিত্য- এসব পড়ে। এসব খোঁজে, আর ২০০ নানা রকম বই পড়ে। আগ্রহ আছে। তখন ভাবলাম যে এত্ত টাকা, সেসময়ে ৪০ লাখ টাকা মানে এখন চার কোটি টাকা...
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অন্তত চার কোটি টাকা, কোনো সন্দেহ নেই।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: হ্যাঁ, এত্ত টাকা মানুষ কিভাবে দিয়েছে আমাকে! এতই ভালোবাসা আমি পেয়েছিলাম সেই সময় মানুষের কাছ থেকে, কিভাবে সেই টাকা তারা আমাকে দিয়েছে, নিজেদের কষ্টার্জিত উপার্জনের টাকা। তখন বুঝলাম যে এটা হবে না, আমাদের ক্রেতা আছে কি না, সেটা না ভেবেই আমরা দোকান খুলে ফেলেছি, মানে পাঠক ছাড়াই আমরা লাইব্রেরি খুলে ফেলেছি। পাঠক আছে কি না সে খোঁজ আমরা নিইনি। খোঁজ নিতে গিয়ে আমি নির্মম সত্যের মুখোমুখি হলাম। সেই সত্যটা হলো, আমাদের সমাজে আর পাঠক নেই। এই পাঠক এখন জন্ম দিতে হবে। আমি লাইব্রেরি খুললাম আর পাঠক হুড়হুড় করে আসবে- বিষয়টা এমন না, আমি তখন লিখেছিলাম এক জায়গায়, বিক্রমপুরের কোনো এক অজপাড়াগাঁয়, যদি পাল যুগের একটা বিখ্যাত ভাস্কর্য পাওয়া যায়, তাহলে ওই মূর্খ চাষাভূষা গ্রামবাসীর তাতে কি এসে যায়! কিছুই এসে যায় না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সে তো বুঝবেই না এটা কী!
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: বুঝবেই না। সেই গ্রামে কেউ এটার মূল্যই বুঝবে না। তখন চিন্তা করে স্থির করলাম যে না, আমরা লাইব্রেরি করব আর পাঠক আসবে এটা না, আমরা অ্যাগ্রেসিভ লাইব্রেরি করব। আমরা পাঠকের কাছে যাব। স্কুলে স্কুলে যাব, কোথায় কোথায় যাব, সেটাও ঠিক করলাম। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, এগুলো হলো মানুষের চাক, মৌমাছির যেমন চাক থাকে, মানুষের চাক হলো স্কুল-কলেজ। পরিবারও আছে, তবে স্কুল-কলেজে চাকের অধিবাসীর সংখ্যা বেশি। তো স্কুল-কলেজে যেতে হবে। সেখানে একসঙ্গে আমরা পেয়ে যাব সবাইকে। তখন আমরা ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির দিকে গেলাম, ঘরে ঘরে বই পৌঁছে দিতে হবে। এই বাংলাদেশ আমি নিজে ড্রাইভ করে সাতবার ঘুরেছি, সব জেলা-উপজেলায়, থানায়, প্রত্যন্ত গ্রামে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: কেন স্যার?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: খুঁজেছি, একটা মানুষ খুঁজেছি। তখন তো আমাদের টাকা ছিল না একেবারেই। একটা লোক খুঁজে বেড়াতাম, যে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পারবে, যার মধ্যে রুচি আছে, আদর্শ আছে, একটা বড় কিছু করার স্বপ্ন আছে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যে অস্পষ্ট স্বপ্নটা দেখেছিলেন স্যার, সেটা কি পূরণ হলো? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সঙ্গে কিঞ্চিৎ সংশ্লিষ্টতার কারণে বা লেখালেখি-পড়াশোনার কারণে বা আপনার লেখা ও রসিকতা, কাজকর্ম, বিদ্যাচর্চার ভক্ত হওয়ার কারণে, আপনার কি মনে হয় স্যার, স্বপ্নটা এখন স্পষ্ট?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: এখন অনেকটা স্পষ্ট, কিন্তু আবার অস্পষ্ট হয়ে গেছে। কারণ এখন মাথার মধ্যে আরো বড় স্বপ্ন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেই বড় স্বপ্নটা কী স্যার?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: সেটা হলো, এখন যেটা আমার কাছে মনে হয় যে অন্তত দেশের সব তরুণ ছেলেমেয়ের কাছে যদি যেতে পারি! আমরা তো এখনো যেতে পারিনি, আমরা অর্ধেক গেছি, কেমন! সবাইকে এর মধ্যে জড়িয়ে ফেলতে চাই। তাতে শিক্ষারও একটা বিরাট উপকার হবে। কারণ শিক্ষা এখন স্কুল-কলেজে হচ্ছে না, অন্তত উৎকর্ষ কর্মসূচির এসব বইও যদি পড়ে, সেটা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমকক্ষ একটা ব্যাপার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: নিশ্চয়ই আপনার এই স্বপ্নও একদিন স্পষ্ট হয়ে ধরা দেবে জাতির কাছে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ স্যার।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: তোমাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ।
(বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৩৫তম জন্মদিনে দৈনিক কালের কণ্ঠের বিশেষ আয়োজনে প্রকাশিত হয়েছিল সাক্ষাৎকারটি, গুরুত্ব বিবেচনায় রইল আগামীর সময়ের পাঠকদের জন্যও। আপনিও শেয়ার করে ছড়িয়ে দিতে পারেন।)







