ভারতে ব্রিকসের এই সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ, এজেন্ডায় কী

ভারতের নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের ভেন্যু ভারত মণ্ডপমের বাইরে বিভিন্ন দেশের পতাকার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক নারী। ছবি: রয়টার্স
এক টেবিলে বসছে ইরান, রাশিয়া, চীন, ভারত ও সৌদি আরব। কিন্তু তাদের স্বার্থ এক নয়। কেউ যুদ্ধের মধ্যে আছে। কেউ যুদ্ধের প্রভাব সামলাচ্ছে। কেউ আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখতে চাইছে।
এই অবস্থায় ভারতের নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। দুই দিনের এই সম্মেলন চলবে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর।
এবারের আয়োজক ভারত। সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য— ‘স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়ন’।
সম্মেলনে এক ডজনের বেশি দেশের নেতা অংশ নিচ্ছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা তাদের মধ্যে রয়েছেন।
ব্রাজিল প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা নির্বাচনের কারণে আসছেন না। দেশটির প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
চীন থেকে শি জিনপিংয়ের অংশ নেওয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সাত বছর পর তিনি ভারত সফরে এসেছেন। ভারত ও চীনের সম্পর্ক গত কয়েক বছরে সীমান্ত বিরোধের কারণে তলানিতে নেমেছিল। এখন কিছুটা বরফ গলেছে। এই সম্মেলন দুই দেশের শীর্ষ নেতার সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নতুন সুযোগও তৈরি করেছে।
কিন্তু শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়। এবার ব্রিকসের সামনে আরও বড় প্রশ্ন।
যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, নিষেধাজ্ঞা, ডলারের আধিপত্য এবং বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তনের মধ্যে ব্রিকস আসলে কতটা একসঙ্গে চলতে পারবে?
ব্রিকস আসলে কী
ব্রিকসের নাম এসেছে পাঁচ প্রতিষ্ঠাতা দেশের নাম থেকে—ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
২০০৬ সালে এটি একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ২০০৯ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন প্রথম শীর্ষ সম্মেলন করে। পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দেয়।
২০২৩ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ দেওয়া হয়। একই সময় আর্জেন্টিনাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
কিন্তু পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া যোগ দেওয়ার পর এখন ব্রিকসের সদস্য ১১টি দেশ— ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া।
এই ১১ দেশ মিলে বিশ্বের প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। তাদের হাতে বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ২৬ শতাংশ।
ব্রিকসের বড় লক্ষ্য হলো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে সদস্যদের জন্য আরও জায়গা তৈরি করা।তবে ব্রিকস কোনো ন্যাটো নয়। এটি কোনো সামরিক জোটও নয়।সদস্যদের সব বিষয়ে একমত হতে হয় না। বরং নিজেদের মধ্যে মতভেদ রেখেই তারা অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক শাসন নিয়ে সহযোগিতা করতে চায়।এটাই ব্রিকসের শক্তি। আবার এটাই এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও।বিশ্ব এখন একাধিক যুদ্ধ ও সংকটের মধ্যে আছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে নাড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে কমেছে।এর পাশাপাশি ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতও দ্রুত বাড়ছে। লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় বাব আল-মান্দাব নিয়েও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।অর্থাৎ, বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ একই সময়ে চাপের মুখে। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা ব্রিকসের জন্য বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।ভারতের এবারের অগ্রাধিকারও সেই বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ মোকাবিলা, সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানো সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য।ব্রিকসের আলোচনার একটি বড় অংশ হবে অর্থনীতি নিয়ে।রাশিয়া ও ইরানের ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে দুই দেশই পশ্চিমা অর্থব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে।এখানে আন্তঃসীমান্ত অর্থ লেনদেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।ব্রিকসের দেশগুলো কীভাবে নিজেদের মধ্যে অর্থ লেনদেন আরও সহজ করতে পারে, সেটি নিয়ে আলোচনা হবে। রাশিয়া অন্য সদস্য ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির বিষয়েও আলোচনা করবে বলে ক্রেমলিন জানিয়েছে।তবে এর মানে এখনই ডলার বাদ দেওয়া নয়।বিশ্লেষকদের মতে, ব্রিকস সদস্যরা ডলারের বিকল্প নিয়ে কথা বললেও পুরোপুরি ডলার বাদ দেওয়ার মতো বাস্তবতা এখনো তৈরি হয়নি।কারণ সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি, মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থা একে অপরের থেকে অনেক আলাদা।তবে একটি বিষয় পরিষ্কার। নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক, যুদ্ধ ও সরবরাহব্যবস্থার সংকটের মধ্যে ব্রিকস দেশগুলো নিজেদের মধ্যে এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে চায়, যাতে কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে না হয়।এটি শুধু অর্থের প্রশ্ন নয়। এটি ভবিষ্যতের বাণিজ্যব্যবস্থার প্রশ্নও।এবারের সম্মেলনে সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলোর একটি হতে পারে ইরান যুদ্ধ। ইরান ব্রিকসের সদস্য।কিন্তু যুদ্ধের অন্য পাশে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতও ব্রিকসের সদস্য।যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাব এরই মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোয় পড়েছে। ইরানের হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই সামরিক সদস্য, একজন বেসামরিক ঠিকাদার ও ১২ জন বেসামরিক নাগরিক রয়েছেন।আগস্টে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞাও ঘোষণা করেছে। ফলে ব্রিকসের সামনে খুব কঠিন প্রশ্ন।ভারত ইরান ও ইসরায়েল— দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ।তাই ব্রিকস এবার সম্ভবত কোনো পক্ষের নাম না নিয়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে সাধারণ ভাষা ব্যবহার করবে।অর্থাৎ, একসঙ্গে থাকার জন্য তারা হয়তো যুদ্ধের নির্দিষ্ট পক্ষের নাম এড়িয়ে যাবে।এর মধ্যেই মে মাসে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে ইরানের যুদ্ধ নিয়ে যৌথভাবে নিন্দা জানানো সম্ভব হয়নি।এটি দেখিয়ে দিয়েছে, ইরান ইস্যুতে জোটটির ভেতরে মতভেদ কতটা গভীর।রাশিয়া নিজেই ব্রিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তাই ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকসের ভাষা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ।২০২৫ সালে রিও ডি জেনেইরোতে অনুষ্ঠিত ১৭তম সম্মেলনের যৌথ ঘোষণায় রাশিয়ার যুদ্ধের সমালোচনা করা হয়নি। বরং ইউক্রেনের রাশিয়ায় হামলার নিন্দা করা হয়েছিল। তাই এবারও বড় কোনো পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে।যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে নতুন করে আলোচনা চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা যুদ্ধ বন্ধের একটি প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন বলে ট্রাম্প জানিয়েছেন।তাই ব্রিকসের পক্ষে এবার ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে একটি সাধারণ ভাষা খুঁজে পাওয়া হয়তো তুলনামূলক সহজ হবে।তবু সমস্যা থাকবে। কারণ সদস্য দেশগুলোর প্রত্যেকের স্বার্থ আলাদা।ব্রিকসের আরেকটি বড় পরীক্ষা ভারত ও চীনকে ঘিরে। ২০২০ সালে হিমালয় সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হওয়ার পর সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হয়ে যায়।এরপর বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ভিসা ও মানুষের যাতায়াতেও নানা বিধিনিষেধ আসে।২০২৪ সালে সীমান্তে সেনা সরানোর একটি সমঝোতা হয়। এরপর ধীরে ধীরে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। সরাসরি বিমান চলাচল আবার শুরু হয়েছে। ভিসা ব্যবস্থাও কিছুটা সহজ হয়েছে। চীন ২০২৫-২৬ সালে ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানি উৎসে পরিণত হয়েছে। তবে সীমান্তে সেনা মোতায়েন এখনো রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে বিরোধ এবং বাণিজ্য ঘাটতি নিয়েও সমস্যা রয়ে গেছে।এই অবস্থায় সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের ভারত সফর আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে শি ও মোদির বৈঠক হতে পারে সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক করার সুযোগ। কিন্তু অবিশ্বাস পুরোপুরি কাটেনি। চীন নিজেকে গ্লোবাল সাউথের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ হিসেবে তুলে ধরতে চায়। অন্যদিকে ভারতও গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বে নিজের জায়গা শক্ত করতে চায়। এখানেও রয়েছে প্রতিযোগিতা।এখানেই জোটটির সবচেয়ে বড় মতভেদ। রাশিয়া ও চীন ব্রিকসকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তির পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।তাদের কাছে এটি পশ্চিমা আধিপত্য কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। কিন্তু ভারতের অবস্থান আলাদা।ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোট বানাতে চায় না। বরং পশ্চিমের বাইরে থেকেও নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে চায়।অর্থাৎ, ভারত পশ্চিমের বন্ধু হতে পারে। আবার রাশিয়া, ইরান বা চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে পারে।









