ক্রান্তিকালের কারিগর
- বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আমি এটা বলব না— এটি ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ পত্রিকার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী, আমাদের শাহাদত ভাইকে নিয়ে লেখা কোনো নিরেট নৈর্ব্যক্তিক বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন। আসলে এটি এমন একজন মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি, যিনি কেবল একজন সফল সম্পাদক ছিলেন না, ছিলেন তৎকালীন সমাজের বা উত্তর একাত্তর মনন সৃষ্টির প্রধান কারিগর।
তিনি একগুচ্ছ আদর্শের প্রতীক ছিলেন, যা কেবল একটি নয়, একাধিক প্রজন্মের চিন্তাভাবনা এবং কাজকে বাস্তবায়নের পরিসর তৈরি করে দেয়। তাই তিনি সব অর্থেই ইতিহাসের ব্যক্তিত্ব, যিনি একজন সাংবাদিকের পোশাকে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলতে পেরেছিলেন, ‘নিজের মতো হও।’
তিনি বহুদিন হলো চলে গেছেন এবং আমাদের সময়ও ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু আমরা একসাথে একটি সময় এবং কালের কর্মযজ্ঞে হাত মিলিয়ে একসাথে ছিলাম। তাই আমার এই লেখাটি কোনো মূল্যায়ন নয়, বরং একজন মানুষ এবং তার নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি, যে প্রতিষ্ঠানটি নিজেই একটি যুগের সেরা প্রতীকে পরিণত হয়েছিল।
বিচিত্রা
আমরা বেড়ে উঠেছি তীব্র জাতীয়তাবাদী গণমাধ্যমের এক যুগে, যখন সেটা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে মধ্যবিত্তের প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। সেই সময়ের সংবাদমাধ্যমের অন্যতম সেরা উদাহরণ ছিল ‘দৈনিক পাকিস্তান’, মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা করে, যা সবার জন্য একটি আদর্শ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রত্যেকেই সেখানে নিজের লেখা প্রকাশ করতে চাইতেন এবং এতে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। কেউ সাহিত্যমনা হলে তো কথাই নেই, কারণ কবি শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান কিংবা শ্রদ্ধেয় আহসান হাবীব— তারা সবাই সেখানে কর্মরত ছিলেন।
১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর এটি আগের মতোই শক্তিশালীভাবে ফিরে আসে। যত দূর মনে পড়ে, দৈনিক পাকিস্তান প্রথমে ‘দৈনিক বাংলাদেশ’ এবং পরে ‘দৈনিক বাংলা’ নাম ধারণ করে। একজন গণমাধ্যম গবেষক হিসেবে আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি, সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং তথ্য সংগ্রহের নানা প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও সততা ও প্রতিবেদনের গুণগত মানের দিক থেকে এই পত্রিকাটি আজও অনন্য হয়ে আছে।
দৈনিক বাংলার অন্যতম সেরা অর্জন তাদের সাথে যুক্ত সাপ্তাহিক প্রকাশনা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’— সবাই যাকে ‘বিচিত্রা’ নামেই ডাকত। আর এর সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী ছিলেন সেই অর্জনের মূল কারিগর।
সেই কালে
আমার যখন শাহাদত ভাইয়ের সাথে প্রথম আলাপ হয়, ততদিনে বিচিত্রা অতি পরিচিত নাম, আমি ইউনিভার্সিটির ছাত্র। যে দৈনিক পত্রিকা থেকে এর জন্ম হয়েছিল, মধ্যবিত্তের কাছে বিচিত্রা এর চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিল। এটি ছিল নাগরিক, চৌকস ও ফ্যাশনেবল। অনেক প্রকাশনাকে আচ্ছন্ন করে রাখা বাংলাদেশ পূর্ব রক্ষণশীলতার কোনো ছায়া এর ওপর ছিল না। আমরা শাহাদত চৌধুরীর নাম জানতাম, জানতাম শাহরিয়ার কবিরের নাম— যিনি ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম আইকনিক নাম জহির রায়হানের পরিবারের খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। ছিলেন মাহফুজউল্লাহ, সংবাদজগতের আরেক দিকপাল। এই রকম আরও অনেক নাম। তারা কেবল লেখক বা সাহিত্যিকই ছিলেন না, বরং ছিলেন এমন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, যারা একটি প্রদেশ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ফলে বাংলাদেশে যে আমূল পরিবর্তন ঘটেছিল, তাকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।
পাহাড়ের বনে বাঘের বিপদ
২৯ জুলাই ২০২৬
দুটি উদাহরণ দিই। বিচিত্রা এমন একটি সাময়িকী ছিল যেখানে বামপন্থী রাজনীতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হতো। আবার এটিই ছিল সেই পত্রিকা, যা প্রচ্ছদে বিকিনি পরা এক বাংলাদেশি তরুণীর ছবি ছেপেছিল। সেটা ছিল ১৯৭২-৭৩ সাল। এটাই ক্রান্তিকালের সাংবাদিকতা।
প্রথম পরিচয়
১৯৭২ সালের শুরুর দিকে বাম রাজনীতি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বভাবতই এর অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। আমরা সবাই ‘লেখক শিবির’-এর সাথে যুক্ত ছিলাম, যার নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আহমদ শরীফ স্যার। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (সিক স্যার) এবং অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক (ফজলু স্যার) ছিলেন আরও দুটি নাম, যা অনায়াসেই মনে পড়ে।
এই সংগঠনটি পরিচালনা করতেন শাহরিয়ার কবির ভাই, যার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল বদরুদ্দীন উমরের রাজনৈতিক সংগঠনের সাথে। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবরার চৌধুরী— যে তখন তাদের কাছাকাছি ছিল; এক দিন আমাকে বিচিত্রা অফিসে নিয়ে যায়। আমার পরিচয় হয় এক নতুন বাংলাদেশের সাথে, যা ছিল আধুনিক, অগ্রণী, সাহসী এবং যুদ্ধের আগুনে পুড়ে খাঁটি হওয়া।
শাহাদত ভাই ততদিনে একজন আইকন হয়ে উঠেছেন এবং খুব দ্রুতই কিংবদন্তিতে পরিণত হন। তিনি কেবল ২ নম্বর সেক্টরের একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং খালেদ মোশাররফের ঘনিষ্ঠই ছিলেন না, বরং সব মুক্তিযোদ্ধারই আপনজন ছিলেন। আর যদি এমন কোনো মুক্তিযোদ্ধার কথা বলতে হয়, যার সাথে তিনি সত্যিই ভীষণ কাছের ছিলেন, তিনি হলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। গণস্বাস্থ্যের যে অভাবনীয় বিকাশ, তার অনেক পরিকল্পনা ওই অফিসে বলতে শুনেছি।
জাফরুল্লাহ ভাই প্রায় সময়ই শাহাদত ভাইয়ের ছোট অফিসে বসে আড্ডা দিতেন এবং পরিকল্পনা করতেন। তিনি ওখানেই সবার জন্য স্বাস্থ্য (হেলথ ফর অল) আন্দোলন এবং আরও বেশ কিছু প্রকল্পের সূচনা করেছিলেন।
আমার বিশেষভাবে একটি মর্মস্পর্শী মুহূর্তের কথা মনে পড়ে, যা ঘটেছিল স্বাধীনতার কয়েক বছর পর— ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর যাতে খালেদ মোশাররফ নিহত হন। মর্গে তার এবং মেজর হায়দারের মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে পড়ে ছিল। জাফরুল্লাহ ভাই সেখানে গিয়ে তাদের লাশ গ্রহণ এবং দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
দেখেছিলাম সেই ঘটনা নিয়ে দুজন কথা বলছিলেন গম্ভীর গলায়। তাদের মুখগুলো কষ্টে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আর আমি সেখানে ভারী বুকে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সেই মোড় পরিবর্তনের কথা শুনছিলাম, যা প্রতিদিন দেখতে দেখতে এখন আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
ঐতিহাসিক অর্থ ও দায়ভার পালন
আজকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বহু বছর পার করার কারণে নানা টানাপড়েনে দমবন্ধ হয়ে আসে স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু তখনকার বাতাস ছিল সতেজ। শাহাদত ভাই প্রায়ই বলতেন, ‘জানালাগুলো যতটা পারো খুলে দাও। বাতাস আসতে দাও।’
পত্রিকার পাতায় প্রকাশিত ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের (পার্সোনাল ক্লাসিফাইড অ্যাডভার্ট) বিরুদ্ধে আসা নানা সমালোচনার জবাবে তিনি এ কথা বলতেন। স্বাভাবিকভাবেই, পুরুষেরা সেই কলামগুলোর মাধ্যমে নারীদের সাথে বন্ধুত্ব করত এবং তাতেই কিছু মানুষ ক্ষোভে প্রতিবাদ জানাত। কিন্তু তৎকালীন ঢাকা এবং বাংলাদেশ ছিল অনেক বেশি সহনশীল, আর তাই সেই কলামটি নিয়মিত চলতেই থাকল, থামেনি।
ফ্যাশন শোগুলো নিয়মিতভাবে কাভার করা হতো এবং মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পরিবারের নারীরা মডেল হিসেবে পোজ দিতেন। আপনি যাদের নামই ভাবুন না কেন, তারা যদি আকর্ষণীয় হতেন, তবে বিচিত্রার পাতায় তাদের জায়গা হয়েছিল এমন সম্ভাবনা অনেক। তারা অত্যন্ত মার্জিত পোশাক পরিধান করতেন এবং সত্যি বলতে কী, বিচিত্রা গোটা ফ্যাশন ধারণার মধ্যেই একটি আভিজাত্য এনে দিয়েছিল। রক্ষণশীলতার দেয়ালগুলো যে নীরবে ভেঙে পড়ছিল তা স্পষ্টভাবে শুনতে পাওয়া যেত। বাতাসে তখন পরিবর্তনের সুর।
একাত্তর, টোকাই আর কবিদের কথা
১৯৭১ সালের ইতিহাস খুব প্রাধান্য দিয়ে তুলে ধরা হতো এবং সে কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সব আইকনদের নিয়েই বিচিত্রা প্রতিবেদন করত। এর কারণ শুধু এটাই ছিল না যে সম্পাদক নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, বরং অধিকাংশ মানুষই তখন তেমনটা অনুভব করতেন, যা আজকের দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির চেয়ে অনেক আলাদা ছিল।
তবে কবিতাও বেশ জনপ্রিয় ছিল এবং বিচিত্রা এই কবিদের সেলিব্রিটিতে পরিণত করেছিল। সে হেলাল হাফিজ হোক কিংবা সাফদার সিদ্দিকী বা অন্য যে কেউই হোক না কেন, বিচিত্রা কাউকেই উপেক্ষা করেনি।
তবুও সবচেয়ে বড় আইকনিক সৃষ্টি কোনো জীবিত মানুষ ছিল না। ছিল রফিকুন নবীর (রনবী) আঁকা ‘টোকাই’ নামের একটি কার্টুন চরিত্র, যা আজ অব্দি সমৃদ্ধতম কার্টুন চরিত্র হয়েই টেকেনি, বরং সবচেয়ে পরিচিত চরিত্র হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে টিকে আছে।
তার কাজগুলো ছিল ছোট ছোট মাস্টারপিস। কার্টুনের সেই সংলাপগুলো সবার মুখে মুখে ফিরত। আর উনার প্রচ্ছদের অলংকরণগুলো বিচিত্রার কাভার করা গল্পগুলোকে— তা কোনো কেলেঙ্কারি হোক বা গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা, অনেকগুণ বেশি আকর্ষণীয় করে তুলত।
ক্যামেরাপারসন ছিলেন আল-মাজি, যিনি প্রেস ফটোগ্রাফিকে একটি শিল্প ফর্মে রূপ দিতে অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে বেশি অবদান রেখেছিলেন। চিন্ময়দা, চন্দন সরকার, সাজ্জাদ কাদির— নামগুলো এভাবে চলতেই থাকবে।
বড় অর্জন
কোনটা শাহাদত ভাইয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব বা অর্জন? আমি মনে করি তিনি কেবল একজন টিম প্লেয়ারই ছিলেন না, বরং তিনি একটি দল তৈরি করেছিলেন এবং নিজের হাতে মশাল ধরে তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
তবে বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যেটি ছিল তার সবচেয়ে বড় অবদান সেটা বলি : তিনি কেবল একটি অফিস বা টিম তৈরি করেননি। বরং আমাদের মধ্য থেকে এমন একদল সমর্থক তৈরি করেছিলেন যারা নিজেদের সেই দলের অংশ মনে করত, তাদের ভাবনা ধারণ করত।
কারণ বিচিত্রা কেবল আমাদের এবং আমাদের প্রজন্মের ধ্যান-ধারণা, চিন্তা ও ঝোঁককে প্রতিনিধিত্বই করত না, বরং তা নিজেই তার প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিল। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো গণমাধ্যমই সম্ভবত এই ভূমিকা পালন করতে পারেনি বা স্বীকৃতি আদায় করতে পারেনি।
আমি তাকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করব। আমাদের দিকনির্দেশনা দেওয়া ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য কৃতজ্ঞ থাকব।
ইতিহাসের ওপর আমার প্রথম প্রবন্ধ ও গবেষণামূলক নিবন্ধ, আমার প্রথম ছোটগল্প এবং আমার প্রথম উপন্যাস— সবই ওখানে প্রকাশিত হয়েছিল। অন্য যেকোনো প্রকাশনীর চেয়ে আমি এই পত্রিকার কাছে অনেক বেশি ঋণী। আমার মতো আরও অনেক তৎকালীন তরুণ এই কথা বলবে।
এটি আমাদের আত্মিক বন্ধন, যৌথতা এবং গৌরব এনে দিয়েছিল। আর শাহাদত ভাই, যিনি ব্রাউন নিউজপ্রিন্ট প্যাডের পাতা অনবরত ছিঁড়ে ফেলার অদ্ভুত মুদ্রাদোষে ভুগতেন, একজন সম্পাদক ও সংগঠক ছিলেন, তিনি আমাদের এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছেন।
আপনার জন্য কোনো বিদায় নেই শাহাদত ভাই। কারণ আপনি সবসময় সেখানেই আছেন— আপনার অফিসে বসে মৃদু হেসে পরবর্তী সংখ্যার পরিকল্পনা করছেন।











