এ দেশে ম্যাগাজিন সংস্কৃতি জনপ্রিয় করেছেন শাহাদাত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শাহাদত চৌধুরী কেবল একজন দক্ষ সম্পাদকই ছিলেন না, ছিলেন একাত্তরের রণাঙ্গনের দুর্ধর্ষ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা। ২ নম্বর সেক্টরের বিখ্যাত ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ গেরিলা দলের সদস্য শাহাদত চৌধুরী ঢাকা শহরে পরিচালিত গেরিলা অপারেশনগুলোর অন্যতম মস্তিষ্ক ছিলেন। শহীদজননী জাহানারা ইমামের ‘একাত্তরের দিনগুলি’ থেকে শুরু করে হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের ‘ব্রেভ অব হার্ট’ গ্রন্থে তার সাহসিকতার বণর্না আছে। শাহাদত চৌধুরী ও তার দুই ভাই— ফতেহ চৌধুরী, ডা. মোরশেদ চৌধুরীও সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ঢাকা শহরের হাটখোলায় অবস্থিত তাদের পারিবারিক বাড়িটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ও অস্ত্রাগার। সহযোদ্ধা শাফী ইমাম রুমী ধরা পড়ার পর পাকিস্তানি বাহিনী তাদের বাড়িতে অভিযান চালায় এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুট করে।
বিষয়বৈচিত্র্য ও আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ পরিকল্পনা বিচিত্রাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়
শাহাদত চৌধুরী ছিলেন দারুণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন ও প্রজ্ঞাবান। তার ব্যক্তিত্ব ও প্রজ্ঞার অনন্য উদাহরণ পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের সঙ্গে তার একটি তর্কের ঘটনায়। হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের ‘ব্রেভ অব হার্ট’ বইয়ে এ সম্পর্কে উল্লেখ আছে। খালেদ মোশাররফ একদিন শাহাদত চৌধুরীকে ডেকে বললেন, ‘আমি ঢাকাকে গোরস্তান বানাতে চাই। একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চাই।’ শাহাদত চৌধুরী বললেন, ‘কাদের দিয়ে মিশিয়ে দেবেন?’ খালেদ মোশাররফ বললেন, ‘কেন তোমাদের দিয়ে, ছাত্রদের দিয়ে।’ উত্তরে শাহাদত চৌধুরী বললেন, ‘ছাত্ররা কি এখানে প্রশিক্ষণ নিতে এসেছেন তাদের মা-বাবাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে? তারা কি তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করতে এখানে এসেছেন? আপনি কি আপনার মা-মেয়েকে হত্যা করতে চান? আপনি এটি করতে পারেন না।’ খালেদ মোশাররফ বিস্মিত হন। এরপর খালেদ মোশাররফ ও শাহাদত চৌধুরী মিলে ঢাকায় যুদ্ধের পরিকল্পনা সাজান।
স্বাধীনতার পর শাহাদত চৌধুরী চিত্রশিল্পের বদলে সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি কালজয়ী ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিষয়বৈচিত্র্য ও আকর্ষণীয় প্রচ্ছদ পরিকল্পনা বিচিত্রাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর দেশে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ হিসেবে ধরা হয় সাপ্তাহিক বিচিত্রাকে। বাংলাদেশে ফিচার সাংবাদিকতা ও আধুনিক ম্যাগাজিন সংস্কৃতি জনপ্রিয় করার পেছনে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য। পরে তিনি ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ ও ‘আনন্দধারা’র সম্পাদক হিসেবেও সাংবাদিকতাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০০৬ সালে (মরণোত্তর) রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।




