বাঘ দিবস
পাহাড়ের বনে বাঘের বিপদ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৭১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের কাসালং সংরক্ষিত বনে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল এক মানুষখেকো বাঘ। ১৯৭৬ সালের মধ্যে বাঘটি ৩০ জনের বেশি মানুষকে শিকার করেছিল। অবজারভার ও ইত্তেফাক পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়েছিল বাঁশ কাটতে গিয়ে প্রাণ হারানো অসহায় মানুষগুলোর নাম। ১৯৫০ সালের অক্টোবরে কাসালংয়ে বাঘ দেখে লিখেছিলেন বন কর্মকর্তা ইউসুফ এস আহমেদ; কাপ্তাই বাঁধ তৈরির সময় মাইনি ও মাহিল্লা এলাকায় বাঘ শিকারের বিশদ বর্ণনা দেন এনায়েত মাওলা।
শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামই নয়; গত শতকের মাঝামাঝিতে সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ময়মনসিংহের গারো পাহাড় এবং ঢাকার কাছে ভাওয়াল-মধুপুর গড়ে বাঘ খুব অস্বাভাবিক প্রাণী ছিল না। ১৯৬০-এর দশকে প্রকৃতিবিদ নওয়াজেশ আহমেদ লাউয়াছড়ার জঙ্গলে জিপে চলার সময় প্রকাণ্ড এক বাঘকে রাজকীয় চালে হেঁটে যেতে দেখেন। পঞ্চাশের দশকে সুনামগঞ্জে বাঘ শিকারের বিবরণ দেন আবদুর রহমান চৌধুরী। তারও আগে থমাস হারবার্ট লুইন, জর্জ পি স্যান্ডারসন ও আর এইচ স্নেইড হাচিনসনের মতো ব্রিটিশ কর্মকর্তার নথিতেও মিলত পাহাড় জুড়ে বাঘ বিচরণের ভূরি ভূরি তথ্য।
তাহলে গত ৭০ বছরে দেশের সমৃদ্ধ পাহাড়ি বনগুলো থেকে এই রাজকীয় প্রাণীটি প্রায় পুরোপুরি বিলুপ্তির মুখে পড়ল কেন?
অত্যধিক ও অনিয়ন্ত্রিত শিকারকে দায়ী করেন অনেকে। একসময় ইংরেজ সাহেব এবং দেশীয় রাজা-জমিদাররা শখে বাঘ শিকার করতেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কাছে এটি ছিল জীবিকার অন্যতম উপায়; তারা বাঘের মাংসও খেতেন। কিন্তু বাঘের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় সংঘবদ্ধ চোরাশিকারিদের উপদ্রব। বাঘের প্রধান খাদ্য মায়া হরিণ, সাম্বার ও বুনো শূকর নিধন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক কাঠ সংগ্রহ, জুম চাষ ও মানববসতির বিস্তার বন ধ্বংসে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবু কিছু বাঘ এখনো কোনোরকমে পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে টিকে থাকতে পারে বলে ধারণা গবেষকদের। ড. মনিরুল খানের ‘টাইগার্স ইন ম্যানগ্রোভস’ গ্রন্থে ২০১০ সালেও কাসালং রিজার্ভে বাঘ ছিল বলে জানিয়েছেন। ২০১১ সালে তাজিংডং পাহাড়ে বাঘ শিকার হয়। বন্যপ্রাণী গবেষক সুপ্রিয় চাকমার তথ্যমতে, ২০০৫-০৬ সালে কাসালংয়ের দুর্গম অরণ্যে দুটি বাঘ মারা পড়ে এবং ২০১০-১১ সালে রাইংক্ষ্যং অরণ্যেও মেলে বাঘের খোঁজ। পরিবেশ সাংবাদিক হোসাইন সোহেল বান্দরবানের মোদকের কাছে দুটি বাঘ শিকারের তথ্য দেন। এমনকি ২০২০ সালেও কেওক্রাডংয়ের পাদদেশে বাঘের আক্রমণে একটি গরু মারা যাওয়ার কথা জানান পাহাড়ি কারবারি লালা বম।
কাজাখস্তান যদি বিলুপ্ত বাঘ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা হাতে নিতে পারে কিংবা ভারত যদি নামিবিয়া থেকে চিতা এনে বনে ছাড়তে পারে তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন পারবে না?
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সাজেকে বেড়াতে গিয়ে এক রিসোর্ট মালিকের সঙ্গে আড্ডায় জানতে পারি— আগের বছর একটি বাঘ শিকারের পর মাংস খেয়েছিলেন তারা। এর বাইরে ২০১১ সালে কুলাউড়ার জুড়ীর লাঠিটিলায় এক স্থানীয় শিকারি বাঘ দেখার কথা বলেন। তবে খণ্ড-বিখণ্ড বন ও খাবারের অভাবে সিলেটে বাঘের স্থায়ী বসতির আশা করা অবান্তর। কঠিন বাস্তবতা হলো, গত পাঁচ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘের কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি। কাসালং সীমান্তঘেঁষা ভারতের ডামপা ব্যাঘ্র প্রকল্পেও সবশেষ জরিপে বাঘ মেলেনি, যদিও ২০২১ সালে এক বনরক্ষীর ক্যামেরায় বাঘের একঝলক অবয়ব ধরা পড়েছিল। তারপরও কাসালং, সাঙ্গু-মাতামুহুরী এবং সীমান্তঘেঁষা ভারত ও মিয়ানমারের বিস্তীর্ণ অরণ্যের ভৌগোলিক সংযোগ বা করিডর ধরে এখনো খুব অল্প সংখ্যায় বাঘ টিকে আছে বলে ধারণা করা যায়। আন্তরিক উদ্যোগে এখনো পাহাড়ে বাঘ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তবে মূল চ্যালেঞ্জটি কেবল পরিবেশগত নয়; রয়েছে জটিল ভূরাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকটও। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্পষ্ট নিষ্পত্তি না থাকায় বন বিভাগ ইচ্ছা করলেই বনাঞ্চলে একক আইনি বা প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। গহিন অরণ্যে নিরাপত্তা সংকট, আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তাপ এবং সশস্ত্র গ্রুপগুলোর উপস্থিতির কারণে বনকর্মীদের পক্ষেও নিয়মিত মনিটরিং কাজে গভীরে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব।
বাঘের সুরক্ষার জন্য প্রথমত, বন বিভাগের সঙ্গে সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে যুক্ত করে দুর্গম সীমান্ত বনাঞ্চলে একটি শক্তিশালী যৌথ সুরক্ষাবলয় গড়ে তুলতে হবে, যাতে চোরাশিকার ও অবৈধ কাঠ পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রথাগত ভূমি অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে তাদের বনাঞ্চল সুরক্ষার সরাসরি অংশীদার ও সুবিধাভোগী করতে হবে। পাহাড়ে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলোকে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব বুঝিয়ে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
ক্যামেরা ট্র্যাপিং করে কাসালং ও সাঙ্গু-মাতামুহুরীর গহিন বনে বাঘ এবং তার খাদ্য প্রাণীর সুনির্দিষ্ট ঘনত্ব ও উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। যদি বাঘের উপস্থিতি মেলে, তবে সে অঞ্চলের বন রক্ষা ও বন্যপ্রাণীর সংখ্যা বাড়ানোর উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আর যদি অনুপস্থিত থাকে, তবে বাঘ ছাড়ার দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান গ্রহণ করা সম্ভব। কাজাখস্তান যদি বিলুপ্ত বাঘ ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা হাতে নিতে পারে কিংবা ভারত যদি নামিবিয়া থেকে চিতা এনে বনে ছাড়তে পারে, তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম কেন পারবে না? সেখানে এখনো শিকার প্রাণীর বৈচিত্র্য মোটামুটি ভালো। পাহাড়ের বুক থেকে রাজকীয় বাঘের গর্জন চিরতরে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে না— এটাই চাওয়া।
লেখক: সাংবাদিক, বন্যপ্রাণীবিষয়ক লেখক




