প্রাণ বাঁচানোর বাহনই এখন প্রাণঘাতী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সাইরেন বাজে। ছুটে চলে অ্যাম্বুলেন্স। উদ্দেশ্য একটাই, একটি জীবন বাঁচানো। কিন্তু সেই অ্যাম্বুলেন্সই এখন অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন রোগী, স্বজন ও চালক। প্রশ্ন উঠছে জরুরি সেবার এই বাহনের নিরাপত্তা নিয়ে।
অথচ কথা ছিল—জরুরি মুহূর্তে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দিয়ে জীবন বাঁচানোর। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক দুর্ঘটনায় সেই জীবনরক্ষাকারী যানই অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। মুখোমুখি সংঘর্ষ, পেছন থেকে ধাক্কা কিংবা বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও ঘটছে।
সবচেয়ে আলোচিত দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটে চলতি বছরের মে মাসে ফরিদপুরের নগরকান্দায়। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন। নিহত সবাই অ্যাম্বুলেন্সের আরোহী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এর আগে জানুয়ারিতে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে একটি অ্যাম্বুলেন্সকে পেছন থেকে দুটি বাস ধাক্কা দিলে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ওই ঘটনায় চারজন নিহত এবং অন্তত ১৫ জন আহত হন। নিহতরা সবাই অ্যাম্বুলেন্সেই ছিলেন।
সম্প্রতি পাবনার সাঁথিয়ায় পাবনা এক্সপ্রেস বাসের সঙ্গে একটি অ্যাম্বুলেন্সের মুখোমুখি সংঘর্ষে তিনজন নিহত হন। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান অ্যাম্বুলেন্সের চালক ও শিশু কেয়ার নানি। আহত হন আরও কয়েকজন। ৫ জুলাই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে নবজাতকের মরদেহ বহনকারী একটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি পিকআপে ধাক্কা দিলে তিনজন গুরুতর আহত হন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন— অ্যাম্বুলেন্সের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পৃথক জরুরি লেন, চালকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, যানবাহনের নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং অন্যান্য চালকদের মধ্যে জরুরি যানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় জীবন বাঁচানোর প্রতীক অ্যাম্বুলেন্সই বারবার প্রাণঘাতী বাহনে পরিণত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিরিক্ত গতি, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, মহাসড়কে শৃঙ্খলার অভাব, ক্লান্ত চালক এবং রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোর চাপ অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্তের আশ্বাস মিললেও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনো দৃশ্যমান নয়।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে সদ্য সুস্থ হওয়া মাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে এসেছিলেন আবতাব হোসেন। তার মতে, সাধারণ মানুষ মনে করেন অ্যাম্বুলেন্স নিরাপদ এবং দক্ষ চালকরাই এগুলো চালান। কিন্তু চালকদের লাইসেন্স, রোড পারমিট বা যানবাহনের বৈধতা সম্পর্কে যাত্রীদের জানার সুযোগ নেই।
প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনার খবর দেখা যায়। এ কারণে সরকারের আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন— উল্লেখ করেন আবতাব।
তবে নিজের কাধে দায় নিতে চান না অ্যাম্বুলেন্স চালক বাশার। বললেন, রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হলে দ্রুত গাড়ি চালাতে হয়, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকি নিয়ে চালানো হয় না।
একই সুরে কথা বললেন আরেক চালক হাবিব উল্লাহ। তার দাবি, রোগীর স্বজনদের চাপের কারণে অনেক সময় দ্রুত যেতে হয়। যানজট থাকলে বিকল্প পথ বা উল্টো দিক ব্যবহার করতে হয়। তার ভাষ্য, দুর্ঘটনা কেউ ইচ্ছা করে ঘটায় না।
চালকদের অবহেলা ও গাফিলতির বিষয়টি উড়িয়ে দিলেন বাংলাদেশ অ্যাম্বুলেন্স মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা। তার দাবি, অ্যাম্বুলেন্স দুর্ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে। চালক নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেন, যাতে রোগী পরিবহন ও জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারে দক্ষতা থাকে।
অ্যাম্বুলেন্সের মান নিয়ে তিনি জানান, আগে ব্যক্তিগত গাড়ি পরিবর্তন করে অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করা হলেও এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিদেশ থেকে প্রস্তুত অ্যাম্বুলেন্স আমদানি করা হচ্ছে। কর ছাড়ের সুবিধা থাকায় এগুলো কেনাও তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
চালকদের মাদক গ্রহণ প্রসঙ্গে গোলাম মোস্তফা অভিযোগ করেন, অনেক চালক মাদকাসক্ত। নিয়মিত ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। তার অভিযোগ, কিছু ক্ষেত্রে জাল মেডিকেল রিপোর্টের মাধ্যমে লাইসেন্স নেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পাশাপাশি অনেক চালক হাসপাতালকেন্দ্রিক দালাল চক্রের সঙ্গেও জড়িত বলে দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) রোড সেফটি শাখার উপপরিচালক সুবীর কুমার সাহা জানান, নির্দিষ্ট অভিযোগ বা সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনের প্রতিবেদন পেলে বিআরটিএ ব্যবস্থা নেয়। সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনার বিষয়ে তার কাছে কোনো প্রতিবেদন এসেছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি। তবে অভিযোগ এলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেন।
ডোপ টেস্ট প্রসঙ্গে তিনি জানান, ডোপ টেস্টের রিপোর্ট যাচাই করেই লাইসেন্স দেওয়া হয়। কোনো চালকের বিরুদ্ধে মাদক গ্রহণের প্রমাণ মিললে তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নতুন কোনো নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিআরটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।







