ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ, কতটা দায়মুক্তি পাবেন সাহাবুদ্দিন

ফাইল ছবি
রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব চুকিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। কিন্তু এখানেই সব শেষ হয়ে যায়নি; তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। তার বিরুদ্ধে মামলা, অনুসন্ধান, অভিযোগ তদন্ত ও বিচারের মুখোমুখি করা নিয়ে চলছে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি। কারণ, তার বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দমনপীড়নে মৌন সমর্থন ও ইসলামী ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকার ত্রুটিপূর্ণ ঋণ অনুমোদনের অভিযোগ তুলেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহল। তারা সদ্য সাবেক এই রাষ্ট্রপতিকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানোর পর সরকারের মন্ত্রীদের ‘সাংবিধানিক দায়মুক্তি’র বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে দানা বেঁধেছে এই বিতর্ক।
সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলা মোটরে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানানো হয়েছে এই দাবি। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে আইনের আওতায় আনতে রবিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে লিখিত দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ আজাদী পার্টি ও রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম নামে দুটি সংগঠন। এর মধ্যে সাহাবুদ্দিনের পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেছে আজাদী পার্টি। এরও আগে সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছে ইসলামী ব্যাংক।
সদ্য সাবেক হওয়া এই রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনারসহ বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারকে রক্ষার চেষ্টা, ব্যাংক খাতের লুটপাটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় নির্বিচারে ছাত্র-জনতা হত্যার ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগ উল্লেখযোগ্য। এসব ঘটনায় তার বিচারের দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। কিন্তু এসব দাবির বিপরীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী তিনি বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত, দায়মুক্তিও আছে তার।
রবিবার সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় স্বৈরাচারের শেষ দিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরোটা এবং বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের সময়ে তিনি বিধিবিধান ও সংবিধান অনুসারে দায়িত্ব পালন করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। সংবিধান অনুসারে তিনি প্রিভিলেজড; তার (ইনডেমনিটি) দায়মুক্তি আছে। ফৌজদারি অপরাধ বা অন্য বিষয়ে আদালতে তার বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না। এর বাইরে যদি কেউ বক্তব্য দিয়ে থাকেন, সেই স্বাধীনতা তাদের আছে; দিতে পারেন। কিন্তু আমলে নেওয়ার মতো কিছু দেখি না।’
তবে তার সঙ্গে একমত নন দেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞরা। তারা জানিয়েছেন, সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধ করে থাকলে সে বিষয়ে মামলা দায়ের, অনুসন্ধান, তদন্ত ও বিচারে নেই কোনো বাধা। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ও পরে তার যেকোনো ফৌজদারি ও দেওয়ানি অপরাধের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তাদের মতে, সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার মেয়াদকালের কর্মকাণ্ডকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাও সবক্ষেত্রে নয়। ফলে এ পদে থেকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের বাইরে যদি তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধ করে থাকেন, তাহলে সেই অপরাধেরও বিচার হতে পারে। তার উদাহরণও দেশে আছে।
‘আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে পরে কারাগারে যেতে হয়েছিল। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিতও হয়েছিলেন তিনি’— উদাহরণ দিলেন তারা।
সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘এই সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদের হানি না ঘটাইয়া বিধান করা হইতেছে যে, রাষ্ট্রপতি তাহার দায়িত্ব পালন করিতে গিয়া কিংবা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো কার্য করিয়া থাকিলে বা না করিয়া থাকিলে সেইজন্য তাহাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করিতে হইবে না, তবে এই দফা সরকারের বিরুদ্ধে কার্যধারা গ্রহণে কোনো ব্যক্তির অধিকার ক্ষুণ্ন করিবে না।’ ৫১(২) অনেচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাহার বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো প্রকার ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যাইবে না এবং তাহার গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য কোনো আদালত হইতে পরোয়ানা জারি করা যাইবে না।’
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক আগামীর সময়কে বলেছেন, সাবেক রাষ্ট্রপতির কোনো দায়মুক্তি নেই। যতদিন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, ততদিন কিছু বিষয়ে দায়মুক্তি পাবেন। তার মতে, ফৌজদারি মামলায় যেই বাদী হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তাতে সরকারকেই বাদী হতে হয়, তদন্ত করতে হয়। কিন্তু পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে সরকারের বাদী হওয়ার কোনো চিন্তা নেই। চাইলেই তার বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারে সরকার। তবে এ ব্যাপারে ঘাঁটাঘাঁটি করবে না তারা। ‘যারা সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবি করছেন, তাদের আরও সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ আনতে হবে। সাহাবুদ্দিন বিভিন্ন অপরাধের সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন— এমন অভিযোগ না করে তিনি কখন, কোথায়, কীভাবে, কী অপরাধ করেছেন, তা সুনির্দিষ্ট করে বলতে হবে’— মত দিলেন তিনি।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়ার ভাষ্য, সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে একজন দুই ধরনের কাজের ক্ষেত্রে দায়মুক্তি পেতে পারেন। প্রথমত, তিনি পদে থেকে যেসব দাপ্তরিক কাজ করবেন, সেসব কাজ নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। দ্বিতীয়ত, যতদিন পদে বহাল থাকবেন, ততদিন আগে বা পরের ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। কিন্তু এই পদ ছাড়ার পর আর তার এমন কোনো প্রটেকশন থাকবে না।
‘রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর ফৌজদারি অপরাধে মামলা দায়ের, জেল হওয়ার মতো ঘটনা আমাদের দেশেই আছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে জেলও খেটেছেন’— একই উদাহরণ উল্লেখ করলেন এই আইনজীবী।
একটু কৌশলী সুরে কথা বললেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। রবিবার চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নবীনবরণ ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানালেন, সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুদকের চেয়ারম্যান ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে সরকার। তদন্ত শেষে জনস্বার্থ বিবেচনায় আইন অনুযায়ী নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক রবিবার জানিয়েছে যে, সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে তারা আলাদা কোনো অনুসন্ধান চালাবে না। ‘পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো তদন্ত না হলেও পুরনো কোনো ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে’— অবস্থান স্পষ্ট করলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।




