টিসিবিকে ভর্তুকিমুক্ত করতে ‘মিশন জিরো’
- ডিলার নিয়োগে এমপিদের ডিও লেটার নিয়ে ক্ষুব্ধ সংসদীয় কমিটি
- পাঁচ বছরে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
- মনিটরিং নিশ্চিত করতে টাস্কফোর্স গঠনের সুপারিশ

সংগৃহীত ছবি
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) সম্পূর্ণ ভর্তুকিমুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। ‘মিশন জিরো’ শীর্ষক এই পরিকল্পনা আগামী চার-পঁাচ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর অংশ হিসেবে লাভজনক পণ্যের বাণিজ্যিক বিক্রি, ডিজিটাল রূপান্তর, সুবিধাভোগী ও ডিলার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনয়ন, মজুদ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও ভর্তুকি সাশ্রয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে টিসিবির সার্বিক কার্যক্রম, ডিলার নিয়োগের অস্বচ্ছতা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কমিটির সদস্যরা। ডিলার নিয়োগে এমপিদের ডিও লেটার ও আইনি জটিলতা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান সদস্যরা। বৈঠকে ভর্তুকির চাপ কমাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে টিসিবির ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে একটি বড় রূপরেখা বা পরিকল্পনা গ্রহণের কথা জানায় মন্ত্রণালয়।
কমিটি সূত্র জানায়, বৈঠকে টিসিবির ডিলার নিয়োগ প্রসঙ্গে কমিটির সদস্য আব্দুল মুনতাকিম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ডিলারশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কোনো কর্মকর্তা এমপিদের ডিও লেটার দিলেই ডিলারশিপ দেওয়া হবে বলে মন্তব্য করছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এমপিদের ডিও লেটারের মাধ্যমে ডিলারশিপ দেওয়ার কোনো আইনগত বিধান আছে কি না? যদি এই নিয়ম না থাকে, তবে নির্ধারিত অফিসিয়াল পদ্ধতি মেনে ডিলার নিয়োগ দিতে গিয়ে কর্মকর্তারা কোনো প্রশাসনিক জটিলতা, চাপ বা বাধার সম্মুখীন হন কি না, সে বিষয়েও তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান।
এর জবাবে কমিটির আরেক সদস্য মো. বরকত উল্লাহ বুলু স্পষ্ট জানিয়েছেন, টিসিবি ডিলার নিয়োগে এমপিদের কোনো আইনগত ভূমিকা নেই। প্রতিযোগিতা এড়াতে বা নিজেদের দায়িত্ব এড়াতে অনেক সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বা জেলা প্রশাসকরা (ডিসি) আবেদনকারীদের এমপির ডিও লেটার নিয়ে আসতে বলেন। এটি সম্পূর্ণ তাদের ব্যক্তিগত কৌশল। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান সমস্যা সমাধান এবং সার্বিক মনিটরিং নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের জোরালো সুপারিশ করেন।
বৈঠকে টিসিবির অনিয়ম ও বাজার সিন্ডিকেট নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন সদস্য হেলেন জেরিন খান। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার আসার পর টিসিবির অনিয়ম অনেকটা কমলেও বিগত সরকারের অনেক অসাধু ডিলার এখনো বহাল থেকে সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করছে। অতীতে মাত্র ৮-১০টি বড় প্রতিষ্ঠান পুরো নিত্যপণ্যের বাজার ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেছে। সেই সিন্ডিকেট কিছুটা দুর্বল হলেও পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। তাই নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে নজরদারি আরও জোরদার করার তাগিদ দেন তিনি।
এ সময় টিসিবি চেয়ারম্যান কমিটির কাছে টিসিবির কার্যক্রম ও উদ্দেশ্য, প্যাকেজ বিতরণ ও কেনাকাটা, ভর্তুকি ও পণ্যমূল্য, অভিযোগ ও তদন্ত, কাজের পরিধি ও জনবল সংকট, সিন্ডিকেট ও নতুন ব্যবসায়ীদের সুযোগদানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, এক কোটি পরিবারকে ৩৫-৪০ শতাংশ কমমূল্যে নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সংস্থাকে সম্পূর্ণ ভর্তুকিমুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এর অংশ হিসেবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভর্তুকি কমে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে বলে জানান তিনি। বলেন, নির্দিষ্ট সিন্ডিকেট ভেঙে প্রতিযোগিতা বাড়াতে আমদানিকারকদের ১০ শতাংশ ভ্যাট মওকুফের প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যা কার্যকর হলে প্রতি বছর এক লাখ টন পণ্য ক্রয়ে সীমিত কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমবে।
এ ছাড়া গ্রাহক চাহিদার ভিত্তিতে পণ্যের তালিকায় সাবান, আটা, চা ও লবণ যুক্ত করে ৩০০-৪০০ কোটি টাকা আয়ের পরিকল্পনা আগামী মাস থেকে খোলাবাজারে লিটারপ্রতি ১০-১২ টাকা কমে সয়াবিন তেল বিক্রি করা হবে। জনবল ঘাটতির পাশাপাশি ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে সংশোধিত নীতিমালার মাধ্যমে চলতি বছরের ৪ হাজার ১২৫ জন ডিলারের চুক্তি নবায়ন না করে নতুনভাবে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলেও কমিটিকে জানান তিনি।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, টিসিবিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে ভর্তুকির অপচয় ও অনিয়ম রোধে টিসিবির কার্যক্রম সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হচ্ছে। অনলাইন ডিলার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালুর মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনা হচ্ছে। এ ছাড়া ভাড়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে টিসিবি নিজস্ব গুদামজাতকরণ ক্ষমতা প্রায় ১০ হাজার টন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।



