বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়াও যেসব পথ ছিল

সংগৃহীত ছবি
পাইকারি ও গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে গত বুধবার। বরাবরের মতোই এবারও এর পেছনে সরকারের যুক্তি, উৎপাদন খরচ বেড়েছে, আর টানা সম্ভব নয় ভর্তুকির বোঝা। এবারও এসব ‘খোঁড়া’ যুক্তির আড়ালে চাপা পড়ে গেছে বিকল্প পথগুলো। ফলে বাড়তি ব্যয়ের ঘানি সাধারণ মানুষকেই টানতে হচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে বিকল্প কী করা যেত? আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা অন্তত সাতটি বিকল্প উপায় বলেছেন। যেগুলো বিবেচনায় নিলে আপাতত গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম না বাড়ালেও চলত।
তারা বলছেন, বাংলাদেশে বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার বড় একটি কারণ হলো, এ খাতে একের পর এক অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ। বিগত সরকারের আমলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। আবার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমিয়ে আনায়ও কখনো মনোযোগ দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি প্রাথমিক জ্বালানির স্থানীয় উৎসগুলোকে কাজে লাগাতে না পারা এবং নবায়নযোগ্য খাতে বিনিয়োগে অনিচ্ছার কারণেও খাতটিতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির পরিমাণ ক্রমেই বেড়েছে।
বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির বোঝা ধাপে ধাপে শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করছে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস (আইইইএফএ)। সংস্থাটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের মাধ্যমে বছরে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারে পিডিবি।
আইইইএফএর বাংলাদেশের প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বললেন, ‘ভর্তুকির পরিমাণ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোকে পুরোপুরি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে হবে। গ্যাসচালিত বয়লারের পরিবর্তে বিদ্যুৎচালিত বয়লার ব্যবহার করতে পারে শিল্প। এতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ পাবে পিডিবি।’
বিদ্যুতের দাম বাড়ল
০৩ জুন ২০২৬
আগামীর সময়কে শফিকুল আলম বলছিলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে একেবারে দাম না বাড়িয়ে কোনো উপায় নেই। আবার দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি সমন্বয় করাও যাবে না। অতীতে দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি করেও ঘাটতি পূরণ হয়নি। সেজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। তবে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং অদক্ষ ও ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহার কমিয়ে আনলে উৎপাদন ব্যয় কমবে। তা ছাড়া সাশ্রয়ী নীতি অবলম্বন এবং সিস্টেম লস কমিয়ে আনাসহ অন্যান্য পদক্ষেপ নিলে সরকারের যে ঘাটতি, তা অন্তত অর্ধেকে নামিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। তাতে বিদ্যুতের দাম এত বেশি বাড়ানোর দরকার ছিল না।’
ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম প্রশ্ন তুললেন, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি হলেও দাম কমানোর প্রস্তাব নিয়ে কখনো গণশুনানি হয় না কেন।
ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চার গুণ বাড়লেও খরচ বেড়েছে ১১ গুণ। দেশে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অথচ সর্বোচ্চ চাহিদা মাত্র ১৭ থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। শীতে এই চাহিদা ১০ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নামে। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে এই অতিরিক্ত সক্ষমতার মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎকেন্দ্র চলুক বা না চলুক, ভাড়া দিতেই হচ্ছে মালিকদের। ফলে মোট ভর্তুকির একটি বড় অংশই চলে যায় এই ক্যাপাসিটি চার্জে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অবহেলা
পরিবেশবান্ধব ও ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ায় এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ঝুঁকছে বিশ্ব। দেশে এই পরিকল্পনা নেওয়া হলেও অগ্রগতি খুবই সামান্য। বর্তমানে মোট উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ পাওয়া যায় নবায়নযোগ্য শক্তি থেকে।
পিডিবির এক কর্মকর্তা বলছিলেন, ‘সৌরবিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশে । ইউনিটপ্রতি এর উৎপাদন ব্যয় ৫ থেকে ৮ টাকা। সদিচ্ছা থাকলে বছরে অন্তত ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব শুধু ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে। একই সময়ে ৫ থেকে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেরও সুযোগ রয়েছে।’
সিস্টেম লস কমানো
বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় এখন সিস্টেম লস ১০ শতাংশেরও বেশি। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ম হলো, এটি থাকবে ২ শতাংশের মধ্যে। পিডিবির তথ্যমতে, প্রতি শতাংশ সিস্টেম লসের কারণে বছরে আর্থিক ক্ষতি অন্তত ৯০০ কোটি টাকা। এই সিস্টেম লস কমিয়ে গ্রহণযোগ্য মাত্রায় আনা গেলে বছরে ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান
দেশে সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস অনুসন্ধানে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে নির্ভরতা বেড়েছে আমদানি করা এলএনজিতে। এর পরও সামাল দেওয়া যাচ্ছে না গ্যাসসংকট। বাধ্য হয়ে চড়া দামের তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন করতে হচ্ছে বিদ্যুৎ। এ অবস্থা থেকে বের হতে দীর্ঘমেয়াদে অনুসন্ধান কার্যক্রম চালানোর পরামর্শ দিলেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে পুরনো গ্যাসকূপ সংস্কারও করতে বললেন।
সাশ্রয়ী হওয়া
এক ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের অর্থ হলো, দুই ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের সমান। এ কারণেই এখন সাশ্রয়ী ও অপচয় রোধ নীতি অবলম্বন করছে বিশ্ব। বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র বরাবরই এর বিপরীত।
বিদ্যুৎ খাতে যেমন অপ্রয়োজনীয় ব্যয় রয়েছে, তেমনি আলোকসজ্জাসহ নানাভাবে বিদ্যুতের অপচয় চলছে। এ নিয়ে সরকার বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিলেও কার্যত তা খুব একটা ফলপ্রসূ নয়। এখানে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
শিল্পের ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্ট থেকে জাতীয় গ্রিডে স্থানান্তর
বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো নিজস্ব গ্যাসচালিত জেনারেটরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এই ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টে গ্যাস সরবরাহ করে সরকার। কিন্তু এসব কেন্দ্রের দক্ষতা খুবই কম। বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের দক্ষতা যেখানে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। সেখানে ক্যাপটিভের দক্ষতা মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। এতে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে গ্যাসের অভাবে ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ থাকে বেশিরভাগ সময়।
ক্যাপটিভে গড়ে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহার হয়। কম দক্ষতাসম্পন্ন ক্যাপটিভ পাওয়ার বন্ধ করে এই গ্যাস দিয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন করলে ব্যয় কমে আসবে। আর ওইসব কারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে বিতরণ সংস্থাগুলোর আয়ও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
ভর্তুকির ভেতরেই লুকিয়ে মুনাফাখোরি
বছরের পর বছর লোকসান করছে বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত। প্রতি বছর এ খাতে সরকারের ভর্তুকি বাড়ছে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত সংঞ্চালন ও বিতরণ সংস্থাগুলো নিয়মিত মুনাফা করছে। সেই মুনাফার একটা ভাগ পাচ্ছেন কর্মীরা। অথচ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নীতি হওয়ার কথা, ‘মুনাফা নয়, লোকসান নয়’। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোতে বেতন সরকারি বেতন স্কেলের চেয়ে দেড়গুণ বেশি। এর পরও মুনাফার নামে শত শত কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আর তার দায় চাপছে জনগণের ওপর।






