ড্রাইভিং লাইসেন্স
উদ্যোগেই জট জিইয়ে রাখার আয়োজন
- আটকে আছে সাড়ে ১৫ লাখ লাইসেন্স সরকার চুক্তি করবে ১৬ লাখ ৮৫ হাজারের
- দুবার দরপত্রেও কাজে রাজি হয়নি কোনো প্রতিষ্ঠান আবারও দরপত্র আহ্বান

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আবেদনের পর, পরীক্ষাও দেওয়া শেষ; ফি-ও পরিশোধ করেছেন। কিন্তু দিনের পর দিন অপেক্ষা; মাস পেরিয়ে বছর। তবু মিলছে না কাঙ্ক্ষিত স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্সটি। কারণ একটাই— কার্ড ছাপানোর ঠিকাদার নেই। সংকট কাটাতে আবারও দরপত্র ডেকেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। কিন্তু নতুন পরিকল্পনাতেও পুরনো জট কমার বদলে আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে লাইসেন্সের এ জট এক অন্তহীন গল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। যার শেষটা আপাতত জানা নেই কারও।
বিষয়টি খোলাসা করা যাক— তথ্য বলছে, এখন ছাপার অপেক্ষায় আছে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স। এই অবস্থায় নতুন ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র দিয়েছে বিআরটিএ। কাজ পাওয়া ঠিকাদারের মেয়াদ হবে এক বছর। আর এই এক বছরে ছাপাতে হবে ১৬ লাখ ৮৫ হাজার কার্ড।
সমীকরণটা জটিল হয়েছে এখানেই। কারণ, প্রতি মাসে গড়ে নতুন ও নবায়ন মিলিয়ে প্রায় ৫০ হাজার আবেদন জমা পড়ে। অর্থাৎ এক বছরের মধ্যে আরও প্রায় ৬ লাখ আবেদন জমে থাকা আবেদনের সঙ্গে যুক্ত হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সমীকরণে শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের অপেক্ষার লাইন প্রায় আগের জায়গাতেই থেমে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিআরটিএর সূত্র বলছে, ৮ জুলাই স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড, কার্ড পার্সোনালাইজেশন প্রিন্টার, সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও প্রয়োজনীয় সেবা সরবরাহের জন্য জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করেছে তারা। সরকারি ই-জিপি পোর্টালের মাধ্যমে আহ্বান করা এই দরপত্র জমা ও খোলার শেষ সময় ২৯ জুলাই।
দরপত্রের শর্তে বলা হয়েছে, নির্বাচিত ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হবে এক বছরের জন্য। এই সময়ে তাকে ১৬ লাখ ৮৫ হাজার কার্ড ছাপিয়ে দিতে হবে। তবে আগে পুরনো আবেদন নিষ্পত্তি হবে, নাকি নতুন আবেদন— সেই সিদ্ধান্ত নেবে বিআরটিএ।
দরপত্র সংগ্রহ করা একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদারের মূল কাজ হবে সময়ের মধ্যে নির্ধারিতসংখ্যক কার্ড ছাপানো। কিন্তু সেই সংখ্যার মধ্যে পুরনো জট পুরোপুরি কমবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
পুরনো সংকটের পুনরাবৃত্তি: সর্বশেষ চুক্তির আওতায় থাকা ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের সঙ্গে বিআরটিএর চুক্তি ছিল ৫ বছরের। তখন তাদের ৪০ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারের চুক্তি শেষ হয় ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই। এর আগে লাইসেন্স ছাপানোর জন্য টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি ছিল। এই চুক্তির মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর। তাহলে এখন কেন মাত্র এক বছরের জন্য চুক্তি হবে এমন প্রশ্নের জবাবে বিআরটিএর উপপরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মো. ইব্রাহীম খলিল বলছিলেন, ‘এতে কোনো সমস্যা নেই। চুক্তি শেষে আবার দরপত্র হবে, নতুন চুক্তি হবে। কাজ থেমে না থাকলেই তো হলো।’
ড্রাইভিং লাইসেন্সের জট নতুন নয়। ২০১৯ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর লাইসেন্সের আবেদন হঠাৎ বাড়লে বড় সংকট তৈরি হয়। এরপর ২০২১ সাল নাগাদ প্রায় ১৪ লাখ আবেদন জমে যায়। তখন পরিস্থিতি সামলাতে সেনাবাহিনী পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে পুরনো আবেদনগুলোর কার্ড ছাপানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই সময় মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স কাজে যুক্ত হয়। তারা নতুন জমা পড়া আবেদন নিয়ে কাজ শুরু করে। আর পুরনো জট সামাল দেয় সেনাবাহিনী।
কিন্তু এবার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানোর পথে হাঁটেনি সরকার। ফলে আগের সংকটই যেন আরও বড় হয়ে ফিরে এসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি ঠিকাদারি কাজ পেতে দরপত্রে অংশ নিয়েছিল। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে তখন সরাসরি দায়িত্ব দিতে পারেনি সরকার।
জানা গেছে, টাইগার আইটির সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই ২০২০ সালের ২৯ জুলাই উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের সঙ্গে চুক্তি করে বিআরটিএ। কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি কাজ করতে পারেনি। আবার তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সরকার ঠিকাদার নিয়োগের নতুন বিজ্ঞপ্তি দেয়নি। ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ সময়মতো না নেওয়ায় বর্তমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
টাইগার আইটি যখন কার্ড ছাপানোর দায়িত্বে ছিল তখন শিক্ষার্থীদের সড়ক আন্দোলনের কারণে ড্রাইভিং লাইসেন্সের ওপর চাপ বাড়ে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে টাইগার আইটিকে চুক্তির প্রায় সব লাইসেন্স প্রিন্ট করতে হয়। ওই সময়ে কার্ড সংকট তৈরি হলে মূলত লাইসেন্সের জট লাগা শুরু।
দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ ছাপানোর মেশিন: ড্রাইভিং লাইসেন্সের এই দীর্ঘ অপেক্ষার শুরু আজ নয়। ঠিকাদার না থাকায় গত বছরের আগস্ট থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্সের কার্ড ছাপানোর কাজ। বিদায়ী ঠিকাদারের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। অথচ তখনই প্রায় সাত লাখ লাইসেন্স ছাপার অপেক্ষায় ছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, তিন-চার লাখ লাইসেন্স প্রিন্টের অপেক্ষায় থাকাকে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু নতুন ঠিকাদার নিয়োগে দেরি হওয়ার কারণে সেই সংখ্যা এখন বেড়ে সাড়ে ১৫ লাখে পৌঁছেছে।
কেন এই সংকট? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আগামীর সময় কড়া নাড়ে বিআরটিএর দরজায়। জানা গেছে, ৫০ লাখ কার্ড ছাপানোর জন্য সরকার যে বরাদ্দ দিয়েছিল, তার থেকে অন্তত তিনগুণ বেশি দামে দরপত্র জমা পড়ে। তাই কোনো ঠিকাদারকে কাজ দিতে পারেনি বিআরটিএ। প্রথমে লাইসেন্স ছাপানোর জন্য ঠিকাদার না পেয়ে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। তাতেও কাজ হয়নি, তাই নতুন করে আবারও দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
বিআরটিএর ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় প্রকৌশল শাখা থেকে। এই বিভাগের প্রধান (পরিচালক) মোহাম্মদ
শহীদুল্লাহ বলছিলেন, প্রথম দরপত্রে সরকার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ায় কোনো ঠিকাদার কাজ করতে রাজি হননি। কেউ তো আর লোকসান দিয়ে কাজ করবেন না। লাভের মুখ দেখলেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে চাইবে। একটি ভালো মানের কার্ড ছাপাতে যে খরচ হয়, সরকারের বরাদ্দ সেটির অর্ধেকেরও কম ছিল।
বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, একটি উন্নত মানের পলিকার্বোনেট স্মার্ট কার্ডের দামই ৮০ থেকে ৯০ টাকা। চিপ সংযোজনে আরও ২৫ থেকে ৩০ টাকা লাগে। এর সঙ্গে ছাপানো, যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও জনবল ব্যয় মিলিয়ে একটি কার্ড তৈরিতে মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৮০-৩০০ টাকা। অথচ সরকার সর্বোচ্চ ১৫০ টাকার মধ্যে কাজটি করাতে চেয়েছিল। তাই কোনো প্রতিষ্ঠান সেই শর্তে কাজ নিতে রাজি হয়নি।
কেন ঠিকাদারনির্ভরতা: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক বলছেন, অল্প সময়ের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে জটিলতা নিরসন সম্ভব নয়। কিছুদিন পর আবার ঠিকাদার খুঁজতে হবে। তখন প্রতিষ্ঠানের ভোগান্তি বাড়বে। এতে এই সমস্যা জিইয়ে থাকবে। তাই এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি উপায় বা সমাধান বের করতে হবে।
এত দীর্ঘ সময় ধরে শুধু ঠিকাদার না থাকায় লাইসেন্স ছাপানো বন্ধ থাকাকেও অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন অধ্যাপক শামছুল হক। তার মতে, লাইসেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিতে একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুরোপুরি ঠিকাদারের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। বিআরটিএর নিজস্ব সক্ষমতা থাকলে ঠিকাদার পরিবর্তনের কারণে মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর নাগরিকদের লাইসেন্সের জন্য অপেক্ষা করতে হতো না।




