বছরে প্রায় ২৪ কর্মদিবস হারাতে পারেন শ্রমিকরা
- উৎপাদনশীলতা ৫০% পর্যন্ত কমতে পারে
- স্বাস্থ্য ব্যয় ২০০০ সালের তুলনায় ৮৩০% বেড়েছে
- বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকতে পারে

ফাইল ছবি
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র তাপপ্রবাহে কমছে মানুষের আয়, বাড়ছে স্বাস্থ্য ব্যয়। ২০৩০ সালের মধ্যে কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা বছরে প্রায় ২৪ কর্মদিবস হারাতে পারেন। অন্যদিকে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ খরচ হয় জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে, যা আরও বাড়ছে। ফলে দেশের মানুষ একই সঙ্গে আয় হ্রাস ও ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিমুখী আর্থিক চাপে পড়ছে।
‘হিট, হেলথ অ্যান্ড ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং-অ্যা কল ফর অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তাপপ্রবাহজনিত এই নতুন সতর্কবার্তা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যাডেলফি গ্লোবাল।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তীব্র তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আগামী কয়েক দশকেও এই অবস্থা অপরিবর্তিত থাকবে।
বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা- এই আট দেশের ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপপ্রবাহ একই সঙ্গে মানুষের আয় কমায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
অ্যাডেলফি গ্লোবালের নির্বাহী পরিচালক ও প্রতিবেদনের লেখক ডেনিস টেন্জলার বলেছেন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো বন্ধ না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে থাকবে। তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকা শ্রমিক ও পরিবারগুলোর সুরক্ষায় পরিকল্পনা ও বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দ্রুত দূর করতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
কর্মঘণ্টা হারাচ্ছে
গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তাপজনিত কারণে বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবস হারাতে পারেন। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকরা, যাদের অসুস্থতাজনিত ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা বা আয় সুরক্ষার সুযোগ নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বেন। বাংলাদেশের শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের আধিক্যের কারণে এই সংকট আরও গভীর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩৯ সাল পর্যন্ত বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকতে পারে। চরম তাপপ্রবাহের সময়ে কিছু খাতে উৎপাদনশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা জীবিকা ও অর্থনীতির ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া বিভাগের চেয়ারম্যান মো. রবিউল আউয়াল বলছেন, সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের তাপমাত্রা আরও বাড়বে এবং এ ধরনের সমস্যার বেশি সম্মুখীন হতে হবে। তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিকল্পিত নগরায়ণ খুব দরকার।
বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো ব্যক্তিগত ব্যয়ের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। ২০২৩ সালে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়েছে, যা গবেষণাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। একই সময়ে মাথাপিছু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় ২০০০ সালের তুলনায় ৮৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপজনিত অসুস্থতা বাড়লে এই আর্থিক চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি খাতে কর্মরত প্রায় সব নারীই অনানুষ্ঠানিকভাবে নিয়োজিত এবং নির্মাণসহ অন্যান্য তাপঝুঁকিপূর্ণ খাতেও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার অত্যন্ত বেশি। ফলে অসুস্থতার কারণে কর্মঘণ্টা কমে গেলে তাদের আয়ও সরাসরি কমে যায়। আবার চিকিৎসার খরচও বাড়ে।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরী বলছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে অনেক রোগবালাই বাড়বে। তাপজনিত কারণে কৃষি খাত এবং নির্মাণ খাতে যুক্ত শ্রমিকের স্বাস্থ্যঝুঁকি অন্যদের তুলনায় বেশি। সরকারের উচিত এই শ্রমিকদের পৃথক স্বাস্থ্যসুরক্ষা নেটওয়ার্কে যুক্ত করে বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা। এতে তারা একদিকে যেমন কর্মক্ষম থাকবে, অন্যদিকে তাদের স্বাস্থ্য ব্যয় কমবে।




