বিশ্বে কমছে কয়লার ব্যবহার, পিছিয়ে বাংলাদেশ

সংগৃহীত ছবি
বিশ্ব জুড়ে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ায় ২০২৫ সালে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে। তবে বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বাংলাদেশ। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রগতির বদলে এখনো বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর কয়লা ও এলএনজির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।
আজ বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
‘বুম অ্যান্ড বাস্ট কোল ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বে কয়লাভিত্তিক নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়লেও কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। মূলত সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণের কারণেই এ পরিবর্তন এসেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের বাইরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন অনেকটাই আমদানিনির্ভর। বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানি করছে। ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত জটিলতা ও জ্বালানি সরবরাহ সংকট তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটি এখনো উল্লেখযোগ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবেশী পাকিস্তান অস্থির জ্বালানি বাজারের ওপর নির্ভরতা কমাতে দ্রুত সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ এখনো আমদানি করা কয়লা ও এলএনজির ওপর নির্ভরশীল থাকায় প্রায়ই জ্বালানি সরবরাহে সমস্যার মুখে পড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বর্তমানে জ্বালানি ঘাটতি, বাড়তি আমদানি ব্যয় এবং ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সামাল দিচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও জানায়, নতুন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চললেও বাস্তবে কয়লার ব্যবহার কমছে। এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে চীন ও ভারতে। চীনে কয়লাভিত্তিক সক্ষমতা ৬ শতাংশ বাড়লেও উৎপাদন কমেছে ১ দশমিক ২। ভারতে সক্ষমতা বেড়েছে ৩ দশমিক ৮, কিন্তু উৎপাদন কমেছে ২ দশমিক ৯ শতাংশ। দুদেশেই নতুন বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করেছে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ।
গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের গ্লোবাল কোল প্ল্যান্ট ট্র্যাকার প্রকল্প ব্যবস্থাপক ক্রিস্টিন শিরার বলেছেন, বিশ্বে এখনো নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হলেও একই সময়ে সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের সম্প্রসারণ এত দ্রুত হচ্ছে যে তা কয়লার বিকল্প হিসেবে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে।
তার ভাষ্য, ২০২৬ সালের বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তির ঘাটতি নয়, বরং এমন নীতির স্থায়িত্ব, যেগুলো এখনো কয়লাকে অপরিহার্য ধরে রেখেছে, যদিও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে এর বাইরে চলে যাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৩২টি দেশ নতুন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বা প্রস্তাব দিয়েছে, যেখানে ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৫। বর্তমানে বৈশ্বিক কয়লা প্রকল্পের মাত্র ৫ শতাংশ চীন ও ভারতের বাইরে হচ্ছে।
একই সময়ে লাতিন আমেরিকা নতুন কয়লা প্রকল্প বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এবং দক্ষিণ কোরিয়া ধীরে ধীরে কয়লা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়ার নীতির দিকে এগোচ্ছে।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, পুরনো কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের গতি এখনো ধীর। ২০২৫ সালে বন্ধ হওয়ার কথা থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র এখনো চালু রয়েছে, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রে।
২০টির বেশি আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে। এতে বাংলাদেশ প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি) এবং ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশও অংশ নিয়েছে।
প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তর এখন আগের তুলনায় বেশি স্থিতিশীল হলেও অনেক দেশ এখনো সাশ্রয়ী নবায়নযোগ্য জ্বালানির বদলে কয়লাকেই অগ্রাধিকার দিয়ে যাচ্ছে।




