আবহাওয়া অধিদপ্তরে আছে আধুনিক প্রযুক্তি, নেই চালানোর লোকবল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঝড় আসছে কি না, কখন বৃষ্টি নামবে, কোথায় তাপমাত্রা বাড়ছে কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ কোন দিকে— এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দিন-রাত কাজ করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর সংগ্রহ করা হয় তাপমাত্রা, বায়ুচাপ, আর্দ্রতা, বাতাসের গতি ও দিক এবং বৃষ্টিপাতের তথ্য। নেওয়া হয় ঊর্ধ্বাকাশের তথ্যও। এরপর সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই, বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে তৈরি হয় পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা।
কিন্তু যে সংস্থার ওপর নির্ভর করে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা, সেই আবহাওয়া অধিদপ্তরই এখন ভুগছে তীব্র জনবল সংকটে। ১ হাজার ৩৩৮টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে পুরো দেশে কর্মরত মাত্র ৫৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম জনবল দিয়ে চলছে দেশের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম।
আবহাওয়াবিদদের মতে, একটি আবহাওয়া স্টেশন ২৪ ঘণ্টা সচল রাখতে ন্যূনতম ১০ থেকে ১২ জন জনবল প্রয়োজন। অথচ দেশের কোনো কোনো স্টেশনে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মাত্র দুজন থেকে তিনজন। ফলে একজন কর্মী অসুস্থ হলে বা ছুটিতে গেলে অন্যদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়ে। বিশেষ পরিস্থিতিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা টানা কাজ করতে হয়।
নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীতে অবস্থিত প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার। এখান থেকে নিয়মিত তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুচাপ, আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন আবহাওয়া-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে কেন্দ্রটির স্বাভাবিক কার্যক্রম।
কেন্দ্রটিতে ১০টি পদ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত মাত্র চারজন কর্মকর্তা। জেলার দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের অবস্থাও প্রায় একই। মাত্র তিনজন কর্মকর্তা দিয়ে চলছে গুরুত্বপূর্ণ এই কেন্দ্রটির কার্যক্রম।
ভোলায়ও জনবল সংকট প্রকট। জেলার আবহাওয়া অধিদপ্তরের স্টেশনটিতে রয়েছেন মাত্র দুজন— একজন ইনচার্জ ও একজন অবজারভার। অথচ একটি স্টেশনের নিয়মিত কার্যক্রম চালাতে এর চেয়ে অনেক বেশি জনবল প্রয়োজন। শুধু মাঠপর্যায়ের স্টেশন নয়, কেন্দ্রীয় পূর্বাভাস ব্যবস্থায়ও রয়েছে জনবল সংকট। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে ন্যূনতম ২০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন ১৫ থেকে ১৬ জন।
আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের পুরো প্রক্রিয়াটিই ২৪ ঘণ্টার। দেশের বিভিন্ন স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট সময় পরপর তথ্য সংগ্রহ করে তা দ্রুত কেন্দ্রে পাঠাতে হয়। এরপর তথ্য যাচাই, প্লটিং, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের কাজ চলে। সবশেষে তৈরি হয় পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কোনো একটি ধাপেও জনবলের ঘাটতি থাকলে পুরো ব্যবস্থার ওপরই চাপ তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট আবহাওয়াবিদরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করতে শুধু অনুমোদিত সংখ্যক জনবল নিয়োগ করলেই হবে না; প্রয়োজন বিকল্প বা রিজার্ভ জনবলও। কারণ ২৪ ঘণ্টার এই বিশেষায়িত কাজে একজন কর্মী অনুপস্থিত থাকলে তার দায়িত্ব অন্য কারও ওপর গিয়ে পড়ে। এর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বদলে যাচ্ছে দেশের আবহাওয়ার ধরনও। ঝড়-বৃষ্টি, বন্যা কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের আচরণে দেখা যাচ্ছে পরিবর্তন। কখনো কখনো কোনো কোনো আবহাওয়ার ঘটনা পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
তবে গত কয়েক বছরে আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থায় এসেছে বড় পরিবর্তন। সংখ্যাতাত্ত্বিক আবহাওয়া মডেল বা নিউমেরিক্যাল ওয়েদার মডেলের ব্যবহার বেড়েছে। রাডার ও স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্যও আগের তুলনায় আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় পূর্বাভাসের সক্ষমতাও উন্নত হয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি জনবল। ফলে আধুনিক প্রযুক্তি হাতে থাকার পরও পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে অনেক সময় চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে আবহাওয়াবিদদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক আবহাওয়াবিদ বললেন, বর্তমান জনবল দিয়ে অনেক স্টেশন নিয়মিতভাবে চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন নিয়োগ না থাকায় সংকট দিন দিন আরও বাড়ছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। কোনো কর্মকর্তা অসুস্থ হলে বা ছুটিতে গেলে তাকে সামলানোর মতো আলাদা ব্যাকআপ টিমও অনেক ক্ষেত্রে নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেছেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের স্টেশনগুলো আরও আধুনিকায়ন করতে হবে। অনেক স্টেশন নষ্ট হয়ে গেছে। একই সঙ্গে এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জনবলও বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ। তাই আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতো সংস্থার সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে। শুধু লোক নিয়োগ করলেই হবে না, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তুলতে হবে।
অধ্যাপক জিল্লুর রহমান আরও বলেছেন, আবহাওয়া পূর্বাভাস একটি বিশেষায়িত ও বিজ্ঞাননির্ভর কাজ। এখানে মেধাবী ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন। আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া সহজ কোনো বিষয় নয়। সঠিকভাবে কাজ করতে হলে দক্ষতা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করা জরুরি।
জনবল সংকটের পেছনে দীর্ঘদিনের নিয়োগ জটিলতাকেও দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১ হাজার ৩৩৮টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ৫৮০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের নিয়োগ বিধি অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে অধিদপ্তরের জনবল কাঠামো পরিচালিত হয়ে আসছিল। পরবর্তী সময়ে আগের বিধিমালা ও আদেশ বাতিল হওয়ায় নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। ২০১৭ সাল থেকে নতুন নিয়োগ কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে বলে জানান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রশাসনিক বিভাগের অ্যাডমিন আবহাওয়াবিদ মো. মনোয়ার হোসেন বললেন, প্রায় ১০ বছর ধরে তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। অর্গানোগ্রাম অনুমোদিত হলেও নিয়োগ বিধি বা সার্ভিস রুল (এসআরও) এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ কারণে নতুন নিয়োগে যাওয়া যাচ্ছে না। আগের নিয়োগ বিধি বাতিল হওয়ায় সেটিও বর্তমানে কার্যকর নেই। একই কারণে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন অর্গানোগ্রাম অনুমোদিত হয়েছে এবং নিয়োগ বিধির প্রক্রিয়াও প্রায় শেষ পর্যায়ে। আশা করা হচ্ছে, শিগগির এটি চূড়ান্ত হবে। এ ছাড়া নিয়োগ-সংক্রান্ত একটি রিট মামলাও রয়েছে, যা ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি করা হয়েছে। এসব বিষয়ে সমাধান হলে পদোন্নতি ও নতুন নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে যখন আবহাওয়ার আচরণই দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তখন পূর্বাভাস ব্যবস্থার সামনে চ্যালেঞ্জও বাড়ছে। আধুনিক প্রযুক্তি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও দক্ষ জনবল।



