রূপপুরে আগুন নিরাপত্তায় দুর্বলতা!

সংগৃহীত ছবি
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল নকশায় ‘ভীষণ’ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল অগ্নিনির্বাপণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থাকে। গুরুত্ব এতটাই ছিল যে, মূল নকশায় বলা হয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েক কিলোমিটার দূরে লালনশাহ সেতু এলাকায়ও যেন অগ্নিকাণ্ড না ঘটে। আর ঘটলেও যেন নেওয়া হয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, সে কথা। অথচ সেই স্পর্শকাতর কেন্দ্রটি চালুর আগেই গত সোমবার ভোরে আগুন লেগেছে বিদ্যুৎ প্রকল্পের ভেতরে। এমনকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার বাইরেও আগুন লাগার ঘটনা আগে ঘটেছে।
গত বছর দেশের প্রথম ও স্পর্শকাতর প্রকল্পটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কেন্দ্র পরিচালনার কার্যক্রম তদারকিসহ কিছু বিষয়ে উন্নয়নের পরামর্শ দেয় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। তারপরও এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরমাণু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার এমন দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য আরও সতর্ক হতে হবে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের।
প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডের আগে নিরাপত্তা যাচাইয়ের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে গত বছরের ১০-২৭ আগস্ট রূপপুর প্রকল্প পরিদর্শন করে আইএইএর একটি বিশেষজ্ঞ দল। আইএইএ তখন জানিয়েছিল, প্রকল্প পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা উন্নয়নে সদিচ্ছা দেখিয়েছে, তবে পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করে সুপারিশও দিয়েছিল। যেখানে তিনটি মূল ক্ষেত্রের একটি ছিল অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও উন্নত করা; বাকি দুটি ছিল পরিচালনা কার্যক্রমের তদারকির মান বৃদ্ধি এবং যন্ত্রপাতি সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন।
আইএইএর এই সুপারিশের প্রভাব সরাসরি দেখা গিয়েছিল চলতি বছরের এপ্রিলে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ৭ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরুর কথা ছিল।
কিন্তু অগ্নিনিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্তগুলো পূরণ না হওয়ায় বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কমিশনিং লাইসেন্স ইস্যু না হওয়ায় নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী তা সম্ভব হয়নি।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কেন্দ্রের একটি সূত্র জানিয়েছে, অগ্নিনিরাপত্তার বাকি কাজগুলো পরে করা হবে এই শর্তে ফুয়েল লোডিংয়ের জন্য নানান চেষ্টা চলে। কিন্তু দেশের স্বার্থে পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে।
পরবর্তী সময়ে ২৮ এপ্রিল প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। এরপর জুলাই মাসে প্রকল্পে পূর্ণাঙ্গ জরুরি ও অগ্নিনির্বাপণ মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়।
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ অবশ্য বারবার আশ্বস্ত করে আসছে যে, নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কেন্দ্রটি উৎপাদনে যাবে না এবং নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ফুয়েল লোডিংয়ের আগেই প্রয়োজনীয় সব পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পরও কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। জ্বালানি লোডিংয়ের সময় বলা হয়েছিল, সেপ্টেম্বর থেকে জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুল্লির একটি স্পর্শকাতর সেফটি ভালভ পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হওয়ায় সে লক্ষ্যও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আর এই কারিগরি জটিলতার মধ্যেই সোমবার ঘটল আগুনের ঘটনা।
এর আগে গত বছরের ৬ নভেম্বর রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সীমানার বাইরে পদ্মা ও ইছামতী নদীর প্রবাহ সচল রাখার জন্য তৈরিকৃত কৃত্রিম চ্যানেলের পাশে ডাম্পিং কাঠের বর্জ্য অপসারণের সময় একটি ছোট অগ্নিকাণ্ড ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ওই সময় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সীমানার বাইরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
একজন বিশেষজ্ঞ আগামীর সময়কে বলছিলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ‘সেফটি কালচার’ বা নিরাপত্তা সংস্কৃতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বারবার এমন অগ্নিকাণ্ডে প্রমাণ হয়েছে, এখানে সেফটি কালচারের ঘাটতি রয়েছে। ছোট-বড় যাহোক, বারবার এমন দুর্ঘটনায় অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই।
‘এই প্রকল্পের মূল নকশায় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্কতার কথা বলা হয়েছে, সেটা হতে পারে মানবসৃষ্ট কিংবা প্রাকৃতিক যেকোনো দুর্ঘটনা। সেখানে মূল স্থাপনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিশাল এলাকা জুড়ে যে সীমানা রয়েছে, তার বাইরেও নানান পদক্ষেপ নেওয়ার কথা উল্লেখ আছে’— যোগ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ টানলেন তিনি। বললেন, লালন শাহ সেতু এলাকায়ও যদি এটি পেট্রলবাহী গাড়িতে কিংবা অন্য কোনোভাবে কোথাও যাতে অগ্নিকাণ্ড না ঘটে, সেই সতর্কতা নেওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটলেও তাৎক্ষণিক কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা উল্লেখ আছে নকশায়। আর সেখানে প্রকল্পের মূল এলাকায় এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড মানেই ‘প্রটেকশন সিস্টেমের ভায়োলেশন’ হওয়া।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবশেষ যেখানে আগুন লেগেছে, সেটি একটি অস্থায়ী স্থাপনা। এই বিশেষজ্ঞ বলছিলেন, ‘প্রকল্পের কাজে সাময়িক সময়ের জন্য নির্মিত এই স্থাপনারও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। সেই মেয়াদ কি উত্তীর্ণ হয়েছে? যদি হয়, তাহলে কেন সেটি ব্যবহার হচ্ছে? আর না হলে কেন সেখানে অগ্নিঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনা করা হয়নি— এ বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার।’
তার মতে, পারমাণবিক জ্বালানি লোডিংয়ের আগেই সেফটি কালচারের উন্নতি হওয়া বাধ্যতামূলক। রূপপুরে জ্বালানি লোডিংয়ের পর বারবার এমন দুর্ঘটনার কোনো সুযোগ নেই। এখান থেকে দ্রুত শিক্ষা ও প্রস্তুতি নিতে হবে ভবিষ্যতের জন্য।
আন্তর্জাতিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মানদণ্ড অনুযায়ী অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর একটি ফায়ার স্টেশন থাকা বাধ্যতামূলক। যেখানে অন্তত ২০০ জনের বেশি দক্ষ জনবল থাকতে হবে। কিন্তু রূপপুর প্রকল্পে এখনো তেমন কোনো ফায়ার স্টেশন হয়নি। বর্তমানে ৪৯ জন কর্মী নিয়ে একটি সাধারণ মানের ফায়ার স্টেশন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
হঠাৎ গভীর রাতে আগুন: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পাইওনিয়ার বেজে সোমবার ভোরের দিকে আগুন লাগে। তবে বিষয়টি জানা যায় মঙ্গলবার বিকালে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানিয়েছেন, আগুনে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের একটি সার্ভার রুমসহ আশপাশের কয়েকটি কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুড়ে যায় সেখানকার কম্পিউটার, এসি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ইন্টারনেট সার্ভারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কিছু নথি। গতকাল বুধবার সকাল থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে দুটি কক্ষের মেরামতের কাজ শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ।
ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি গঠন হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তদন্ত শেষে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, পাইওনিয়ার বেজে অগ্নিকাণ্ডের পর মুহূর্তের মধ্যে আগুন ও ধোঁয়া আশপাশের কয়েকটি কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ঈশ্বরদী ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট দীর্ঘ সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিকাণ্ডের পর পাইওনিয়ার বেজসহ আশপাশের দুটি ভবনে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন হয় ইন্টারনেট সংযোগ। কাস্টমস বিল্ডিং ও ক্যানটিনেও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় ।
কর্মকর্তরা বলছেন, পাইওনিয়ার বেজ রূপপুর প্রকল্পের মূল কার্যক্রমের অংশ নয়; এটি প্রকল্পের একটি অক্সিলিয়ারি (সহায়ক) অংশ। অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রকল্পের মূল কার্যক্রমে কোনো ধরনের প্রভাব পড়েনি এবং প্রকল্পের সার্বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। মূল প্রকল্পে বিদ্যুৎ, পানি ও ইন্টারনেট সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হয়নি এবং ক্ষতিগ্রস্ত নথিপত্রের ডিজিটাল ব্যাকআপ সংরক্ষিত থাকায় সেটি বড় সমস্যা তৈরি করবে না। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, একটি পারমাণবিক স্থাপনায় যত ছোট আগুনই হোক না কেন, তা বাড়তি সতর্কতার দাবি রাখে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি





